সাহিত্য

ইতিহাসের রোহিঙ্গা জাতি ও শতাব্দীর সঙ্কট

আছাদ পারভেজ প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-১২-২০১৭ ইং ০১:৫৬:২০ | সংবাদটি ১২৪ বার পঠিত

মহারাজোয়াংয়ে ঐতিহ্যগত আরাকানি ক্রনিকল রাজাদের এবং রাজবংশের তথা ডাইনেস্টিগুলোর তালিকা অনুযায়ী সুপ্রাচীনকাল থেকে আরাকানের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসের গর্বিত রচনাকাল ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সাক্ষ্য বহন করে। মারুবংশীয় রাজা মারাও কিংবা কানরাজগ্রি বংশের ৬২ জন রাজার রাজত্ব পরবর্তী চন্দ্র সূর্য বংশ (১৪৬-৭৮৮খ্রি:), মহত ইঙ্গ চন্দ্র (৭৮৮-১০১৮ খ্রি:), পিনসা রাজবংশ (১০১৮-১০৫৪ খ্রি:), প্যাগান রাজবংশের করদরাজ্য হিসেবে (পিনসা রাজবংশ ১০৫৪-১১০৩ খ্রি:, পেরিন রাজবংশ ১১০৩-১১৬৭ খ্রি:, কিরিত রাজবংশ ১১৬৭-১১৮০ খ্রি:, পিনসা রাজবংশ ১১৮০-১২৩৭ খ্রি:, লংগিয়েত ১২৩৭-১২৭৯ খ্রি:), অতঃপর লংগিয়েত বংশের স্বাধীন রাজত্বকাল ১২৭৯-১৪০৬ খ্রি: পর্যন্ত আরাকানকে সমৃদ্ধ করেছে।
নবী মুহাম্মদ সা:-এর জীবদ্দশায় এই আরাকানে ব্যবসায়িক ও ধর্ম প্রচারে এসেছিলেন মুসলিম নাবিকেরা। সমৃদ্ধ সব ইতিহাসকে পেছনে রেখে সিংহাসনচ্যুত (১৪০৬-১৪৩০ খ্রি:) রাজা নরমিখলা ২৪ বছরের আশ্রিত জীবন সাথে নিয়ে ১৪৩০ সালে গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহের সহযোগিতা নিয়ে যখন আরাকান সিংহাসন উদ্ধার করেন, তখনই নতুন ইতিহাস রচিত হয় আরাকানের। ইতিহাস বলে, কৃতজ্ঞতাবশত কিংবা ইসলামের ন্যায়নীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে নরমিখলা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন ম্রাউক-উ রাজবংশ।
১৪৩০-১৫৩১ খ্রি: পর্যন্ত একনাগাড়ে বাংলার করদরাজ্য হিসেবে আরাকান পরিচালিত হয়ে একটি সার্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য মুসলিম চরিত্র ফুটে ওঠে আরাকানে। স্বাধীন রাজ্য হিসেবে এই ম্রাউক-উ রাজবংশের রাজারা সরাসরি মুসলিম নাম ধারণ করেন ১৬৩৮ সাল পর্যন্ত এবং মুসলিম কিংবা অন্য ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান শাসন করেন।
বিশৃঙ্খল শাসনামলে ১৬৬১ সালের ৭ ফেরুয়ারি অনভিপ্রেত ঘটনার মধ্য দিয়ে এরা আশ্রিত শাহ মুহাম্মদ সুজাকে সপরিবারে হত্যা করেন। ক্রমাগত বিশৃঙ্খলার কারণে ১৭৮৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর, স্বাধীন আরাকান বর্মিরাজা বোধাপায়ার কাছে স্বাধীনতা হারিয়ে পরাজিত জীবনের গ্লানি নিয়ে পথচলা শুরু করেন। এর পর থেকেই আরাকানের ভূমিপুত্রদের ওপর চলতে থাকে অমানবিক অত্যাচার। ১৮২৪-২৬ সালের ইঙ্গ-বার্মিজ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে প্রথমে আরাকান বেদখল হয় বার্মিজদের। এরপর ১৮৫২ সালে বার্মার নি¤œাঞ্চল এবং ১৮৮৫ সালের যুদ্ধে বর্মিরা পরাজিত হলে সমগ্র বার্মা দখল করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এবং ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ ভারত থেকে ব্রিটিশ বার্মাকে আলাদা করার পর ব্রিটিশ প্রশাসন দ্বারা ‘হোম রোল-১৯৩৭’ দিয়ে বার্মা শাসন করে। এরপর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ইউনিয়ন অব বার্মা নামে দেশটি স্বাধীন হয়।
দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৬২ সালের নেউইনের অত্যাচার ও ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া, ১৯৭৮ সালের দাঙ্গায় (উৎধমড়হ ঙঢ়বৎধঃরড়হ খবধংঃ ৩০০০০০ জড়যরহমুধ ঃড় বহঃবৎ রহ ঃড় ইধহমষধফবংয) ৪০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী হওয়ার প্রাক্কালে যাত্রাপথে মৃত্যু, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের খড়গ, ১৯৯১-৯২ সালের অপারেশন পাইথায়ার মাধ্যমে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা এবং হাজার হাজার নারী-পুরুষকে হত্যা করা, ২০১২ ও ২০১৬ সালের নির্মম অত্যাচারে দুই হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা ও লক্ষাধিক লোকের বাস্তুচ্যুত জীবন আমাদেরকে অতীতের নির্মমতা স্মরণ করিয়ে দেয়। পরিশেষে আসে ২০১৭ সালের ঘটনা।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সরকার কফি আনান রিপোর্টকে বানচালের উদ্দেশ্যে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন নামে জান্তা সরকারের পথে হাঁটে সু চির সরকার। ২৫ আগস্টে আরাকান স্যালভেশন আর্মিকে (আরসা) অভিযুক্ত করে তারা যে অমানবিক নিপীড়ন-নির্যাতন, গণহারে ধর্ষণ এবং নারকীয় অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনার জন্ম দিচ্ছে; যা অতীতের সব নৃশংসতাকে পেছনে ফেলে নতুন নির্মমতার ইতিহাস রচনা করে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত (৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭) তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে ৪৭১টি রোহিঙ্গা গ্রামের মধ্যে ২১৪টি গ্রামই নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ১০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ছোট শিশুদের আগুনের কু-লিতে নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব হত্যাকা- পৃথিবীর নৃশংসতম হত্যাকা-গুলোর কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়।
তাদের নির্মম অত্যাচারের লোমহর্ষক দৃশ্য বিবিসি, আলজাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট, ইকোনমিস্ট ও টাইম ম্যাগাজিনসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরগুলোতে ফুটে উঠেছে। তাদের সহিংসতা ও জেনোসাইডের মতো কর্মকা- থেকে বাঁচতে ২৫ আগস্ট-২৭ নভেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে নতুন করে প্রবেশ করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরাকানে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও উগ্র মগ সম্প্রদায়ের বর্বর সহিংসতাকে এবারে জোরালোভাবেই জাতিগত নিধন ও গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সহিংসতার ব্যাপকতা পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, গণহত্যা বা জেনোসাইড সংঘটিত হলে যেসব আলামত পাওয়ার কথা; তার সবই পাওয়া গেছে ২৫ আগস্ট ২০১৭-পরবর্তী ঘটনায়।
স্বাধীন মিয়ানমারের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শাও সোয়ে আইক ১৯৪৭ সালে বলেছিলেনÑ ‘রোহিঙ্গারা যদি স্থানীয় আদিবাসী না হয়, তাহলে আমিও তা নই।’ এ ছাড়া সামরিক শাসক উ নু এবং জেনারেল নেউইনের সামরিক সরকারের প্রবর্তিত সংবিধানের আওতাধীন নীতির ভিত্তিতে অপরাপর সব জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছেÑ এ মর্মে, যারা প্রায় ২০০ বছরের বেশি বার্মার ভূখ-ে বসবাস করছে, একমাত্র তারাই নাগরিক।
হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আরাকানে বাস করেও রোহিঙ্গারা ১৯৮২ সালের আইনে বার্মার নাগরিকত্ব হারায়। সংবিধান মোতাবেক রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার না থাকায় এরা সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক হিসেবে পৃথিবীতে গৃহীত হচ্ছে।
মিয়ানমার রাষ্ট্রের উপদেষ্টা সু চির গণতান্ত্রিক পর্দার আড়ালে যে অন্য আরেকটি রূপ ছিল, তা বিশ্ববাসীর আগেই জানা উচিত ছিল। ২০১২ সালের নিপীড়নের সময় তিনি ক্ষমতায় না থাকলেও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে কোনো টুঁ-শব্দ করেননি, ২০১২ সালের ৩ নভেম্বর বিবিসির সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার মূলে কী রয়েছে তা দেখার আগে রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বলে তিনি তার নৈতিক অবস্থানের অমর্যাদা করতে পারেন না, ২০১৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের আগে আরাকানের সহিংসতার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান এবং কোনো মুসলিমকে দল থেকে নমিনেশন দেয়া থেকে বিরত থাকেন এবং ২০১৬ সালে মিয়ানমারে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তিনি বলেন, রাখাইনে যেন মুসলিমদের রোহিঙ্গা হিসেবে আমেরিকা অভিহিত না করে।
সু চি যে কী পরিমাণ মুসলিমবিদ্বেষী, এর প্রমাণ স্পষ্ট পাওয়া যায় বিবিসিতে তার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকার থেকে। বিবিসির সাক্ষাৎকারটি নিচ্ছিলেন মিশেল হোসেন, তিনি একজন মুসলিম। এ কথা জানতেন না সু চি। রোহিঙ্গা মুসলিম বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন সু চি। সাংবাদিকের মুসলিম পরিচয় পেয়ে তৎক্ষণাৎ তিনি মন্তব্য করেন, বিবিসির সাংবাদিক যে একজন মুসলিম ছিলেন এ কথা আমাকে আগে জানানো হয়নি। তিনি কতটা অসামাজিক ও মুসলিমবিদ্বেষী এ বক্তব্য থেকেই প্রমাণিত।
অতীতের সাড়ে চার লাখ এবং ২০১৭ সালের নবাগত সাত লাখ মিলে বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১১ লাখের বেশি। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে রক্ষণাবেক্ষণের গুরুদায়িত্ব বিশ্ববাসীর এবং যথাসময়ে তাদেরকে নিজ দেশে পুনর্বাসনের দায়িত্বও। আমাদের সরকারপ্রধান আন্তরিক। কিন্তু আবেগপ্রবণ হয়ে ১৬ কোটি মানুষের ভরণপোষণের সাথে শরণার্থীদের মিলিয়ে ফেললে তা হবে ভয়ানক এক পরিস্থিতি। কেননা, এতে করে মিয়ানমার সরকার অতি উৎসাহী হবে আরাকানকে রোহিঙ্গাশূন্য ভূমিতে পরিণত করার প্রয়াসে। তাহলে একটি প্রতিষ্ঠিত জাতি বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
রোহিঙ্গাদের বেলায় মিয়ানমার যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে আজ তা সভ্যতা, মানবতা ও আধুনিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাদের অগণতান্ত্রিক, অমানবিক আচরণ ও নির্মম নির্যাতন, গণহত্যা, ধর্ষণ এবং জাতিগত নিধনের মতো কর্মকা-ের কারণে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অচ্ছুত হয়ে বর্জিত ও নিন্দিত। এত কিছুর পরও রাষ্ট্রটিকে চীন, রাশিয়া ও নব্য শক্তিধর ভারতের সহযোগিতার ফলে বশে আনা যাচ্ছে না।
প্রায় সাড়ে ১১ লাখ শরণার্থীর বিপরীতে জাতিসঙ্ঘের ইউএনএইচসিআরের আওতাধীন বাংলাদেশের সরকার মাত্র কুতুপালং ও নয়াপাড়া দুই ক্যাম্পের মাধ্যমে ১৩ হাজার ৯৬০ ও ১৯ হাজার ১৭৯ মোট ৩৩ হাজার ১৩৯ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিবন্ধিত করে খাদ্য ও বাসস্থানের সহযোগিতা করে আসছে। বাকি রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন যাপন করছে।
আরাকানের রোহিঙ্গা মানুষদের বিশ্ববাসী আজ বলছে বিশ্বের সর্বাধিক হতভাগ্য জনগোষ্ঠী, কিন্তু তাদের দুঃখ লাঘবের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কর্মে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না বিশ্ববাসীর।
আমাদের মনে রাখা উচিত, বিশ্বের কোনো অত্যাচারিত শাসকের বিদায় সুন্দর ও মসৃণ হয়নি। নিকট অতীতে জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট মুগাবে অধিক শক্তিশালী ছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন আগে বিদায়বেলায় বলেছেন, মানুষ বহুরূপী এবং চোখের জল ফেলেছেন নীরবে ও অজ্ঞাতে, যা বিশ্ববাসীর চোখে ধরা পড়ে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান যেভাবে স্পষ্ট ভাষায় আরাকানের ঘটনাকে গণহত্যা বলেছেন, ঠিক একই কায়দায় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবসহ বিশ্বনেতারা যদি না বলেন তাহলে সেনাশাসিত ছায়া সরকারের বার্মিজ বাহিনী সম্পূর্ণরূপে আরাকানকে মুসলিম জাতিমুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ থাকবে। এতে করে বিশ্বের বুকে অধিকারবঞ্চিত মানুষদের আহাজারে স্বাধিকারমিশ্রিত বায়ু সচেতন মহলকে ঘুমাতে দেবে না। সেদিন কেউ তাদের বলতে পারবে না সন্ত্রাসী; তারা আসলে অধিকার উদ্ধারের জিহাদি।
ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সব চাপের পরিপ্রেক্ষিতে নির্যাতিত এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ফেরত নেয়ার প্রয়াসে, অবশেষে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। যাকে আমরা চুক্তি না বলে অ্যারেঞ্জমেন্ট বা ব্যবস্থাপত্র বলতে পারি। মূলত ১৯৭৮, ১৯৮২ বিশেষ করে ১৯৯২ সালের চুক্তির সমরূপ চুক্তি একটি। এই চুক্তির ফলে রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা না বলে রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে এবং নাগরিকত্বের যাবতীয় পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদের নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। তা ছাড়া কবে নাগাদ তাদের নেয়া হবে এবং নেয়ার পর বাড়িঘরে যাওয়ার কতটুকু নিশ্চয়তা তাও স্পষ্ট করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় এসব নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে যাদের যাওয়ার ভাগ্য হবে তারা সেই ১৯৯২-২০০৫ সালের ফেরত রোহিঙ্গাদের মতোই টাউনশিপের অবিকল বৃহৎ কারাগারে কিংবা ট্রানজিট ক্যাম্পে জীবনের বাকি সময়টুকু অতিবাহিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা নামক শব্দটি মুসলিম এ জাতির জাতিগত পরিচয়ে মূল চালিকাশক্তি। সমগ্র পৃথিবীতে আজ একটাই ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে, রোহিঙ্গা এ জনগোষ্ঠীকে রাখাইন রাজ্যে তথা মিয়ানমার যেন নাগরিকত্ব দিয়ে গ্রহণ করে। কফি আনান কমিশনের রিপোর্টেও জোরালোভাবে বলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যেন দেয়া হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে রোহিঙ্গা শব্দটিকে ব্যবস্থাপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের যেমন কূটনৈতিক পরাজয় তেমনি রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্য।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নিরাপত্তা পরিষদের বিদ্যমান ব্যবস্থায় চীন ও রাশিয়া সম্মত না হলে কখনো নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির পক্ষে বিবৃতি দিয়ে সহিংসতা বন্ধ করা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত ফিরিয়ে নেয়ার মতো আহ্বান জানানো সম্ভব নয়।
তা ছাড়া জাতিসঙ্ঘের থার্ড কমিটিতে মুসলিম বিশ্বের উত্থাপিত প্রস্তাবে ১০টি দেশের বিরোধিতা, ২৬টি দেশের ভোটদানে বিরত থাকা এবং ২২টি দেশের অধিবেশনে অনুপস্থিতির পরও উত্থাপিত প্রস্তাব গরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয় এবং থার্ড কমিটি অত্যন্ত জোরালোভাবে সহিংসতা বন্ধ ও রোহিঙ্গা শরণার্থী ফেরত নেয়াসহ তাদের সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে নাগরিকত্ব দিয়ে গ্রহণ করতে আহ্বান করে।
২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত পাঁচ দফা সর্বজনগৃহীত প্রস্তাবনা। এ প্রস্তাবনার একটি দফাও সমঝোতা স্মারকে মিয়ানমারের কূটনৈতিক চাপের কারণে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। এর পেছনে রয়েছে একমাত্র গণচীনের রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য, যা আমাদের পররাষ্ট্র নীতির চরম বিপর্যয় প্রমাণ করে।
’৯২ সালের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, শরণার্থী রোহিঙ্গাদের বিশাল একটি অংশ মিয়ানমার ফেরত নেয়নি। এবার ৯২ সালের অনুকরণীয় ব্যবস্থাপত্রের সাথে যুক্ত হয়েছে যে, ২০১৬ সালের অক্টোবরের পর থেকে আসা শরণার্থীদের শুধু ফেরত কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। এতে করে ২০১২ ও ২০১৬ অক্টোবরের আগে আসা রোহিঙ্গাসহ ২০১৭ সালের বহু রোহিঙ্গা এ দেশে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে বাধ্য হবে।
রোহিঙ্গা সঙ্কটের উৎস মিয়ানমার সরকার। অথচ দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে রাখাইনের মুসলমান ও অন্যরা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে গেছে সন্ত্রাসীদের কারণে, মিয়ানমার সরকার কিংবা নিরাপত্তাবাহিনীর কারণে নয়। এ বিষয়টি মিয়ানমার সরকারের জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তির এবং রোহিঙ্গাদের জন্য বেদনাদায়ক।
বাংলাদেশ যদি কোয়ার্সিভ ডিপ্লোম্যাসি প্রয়োগ করতে না পারে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের আবারো এ দেশে ফেরত আসতে হবে, যা বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বের জন্য এক অশুভ বার্তা বয়ে আনবে এবং ধিক্কার দেবে যে, তোমরা রোহিঙ্গা জাতিকে এই বিশ্বে বাঁচতে দিলে না। সব কিছুর সমাধান সম্ভব একটি মাত্র পথে, তা হলোÑ রোহিঙ্গা জাতিকে নাগরিকত্ব দেয়া ও নিজ দেশে নিরাপদে থাকতে দেয়া।
লেখক : গবেষক ও গ্রন্থকার।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT