সম্পাদকীয় সেই দানই সর্বশ্রেষ্ঠ, যা ডান হাত দিয়ে প্রদান করলে বাম হাত জানতে পারে না। -আল হাদিস

চিকিৎসায় নি:স্ব মানুষ

প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১২-২০১৭ ইং ০০:৩৯:৪৪ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে মানু। দেশের ১৭ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে আকস্মিক বিপর্যয়ে পড়ছেন। দেশে শতভাগ হেলথ কভারেজ থাকলেও ৫০ শতাংশের ওপরে মানুষ ফার্মেসি বা হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে থাকে। যারা স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন তাদের কোনো মেডিকেল শিক্ষা নেই। সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এতে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্যের জন্য ৬৭ শতাংশ ব্যয় ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে করে থাকে। মূলত রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়েই বেশির ভাগ ব্যয় হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, স্বাস্থ্যসেবার জন্য মাথাপিছু কমপক্ষে ৮৬ মার্কিন ডলার ব্যয় করা দরকার। অথচ আমাদের দেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় বছরে ৩৭ ডলার। আর এই স্বাস্থ্যখাতের ব্যয় প্রতি বছরে বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না এ দেশের অসংখ্য মানুষ। সরকার নানা ধরনের কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করতে। কিন্তু বাস্তবে এর সুফল পাচ্ছে না বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। ফলে ব্যয় বহুল চিকিৎসা করাতে ব্যর্থ অনেকের জীবন হচ্ছে বিপন্ন। আবার অনেকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে নি:স্ব হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন বেড়ে চলেছে চিকিৎসা ব্যয়। বাড়ছে ডাক্তারের ফি, পরীক্ষা নিরীক্ষার ফি, ওষুধের দাম। যে কারণে গরিব নি:স্ব পরিবারগুলোতে অবশ্যই, মধ্যবিত্ত কিংবা সচ্ছল পরিবারের পক্ষেও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রাইভেট চেম্বার অথবা বেসরকারি হাসপাতালেই শুধু নয়, সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। সেই সঙ্গে আছে দুর্নীতি, অনিয়ম অপচিকিৎসা। মানুষ চিকিৎসা করাতে রীতিমতো জমিজমা ভিটেমাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
জানা গেছে, দেশে প্রতিনিয়ত নি:স্ব ও গরিব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশই চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে নি:স্ব হচ্ছে। জনগোষ্ঠীর প্রায় চার শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নীচে নেমে যাচ্ছে শুধুমাত্র চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে। অন্যদিকে ধনী গরিব নির্বিশেষে ৬৪ শতাংশ মানুষকে পকেটের টাকা ব্যয় করে চিকিৎসা সেবা নিতে হচ্ছে। চিকিৎসার পেছনে মানুষের নির্ধারিত আয়ের বড় অংশ ব্যয় হওয়া ছাড়াও ভিটেমাটি, ফসলি জমি, গৃহপালিত পশু ও জরুরি ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র বিক্রি, ঋণ করা, মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার মতো উপায় বেছে নিতে হচ্ছে। এই ব্যাপারে সরকার পরিচালিত জরিপেই বলা হয়, প্রতিটি গরিব পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ আসে আয় থেকে আর ২১ শতাংশ আসে জমানো টাকা থেকে।    
আসল কথা হলো, চিকিৎসার মতো মানবিক স্পর্শকাতর ব্যাপারটিও এখন রীতিমতো ব্যবসায় পরিণত হয়ে গেছে। অনেকের মতে, আমাদের একেকটি বেসরকারি হাসপাতালে এখন ফাইভস্টার হোটেলের মতো ফাইভস্টার হাসপাতাল হয়ে গেছে। যেখানে গরিব মানুষের কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। আর সরকারি হাসপাতালেও এখন আর বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ নেই। সব জায়গায় এখন টাকা দিয়ে চিকিৎসা কিনতে’ হয়। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে। সুতরাং আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ও নির্বিঘেœ চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি খাতের হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোতে গলাকাটা ফি আদায়ের মহোৎসব বন্ধ করতে হবে। প্রাইভেট চেম্বার ও প্যাথলজিতেও ফি নেয়ার হার নির্ধারণ করে দিতে হবে। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT