মহিলা সমাজ

এক টুকরো কাগজ অতপর...

তাসলিমা খানম বীথি প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-১২-২০১৭ ইং ০০:১৮:২০ | সংবাদটি ২৪৪ বার পঠিত


সন্ধ্যার আগেই হাতের কাজ শেষ করে পাঠাগারের পথে পা বাড়ালাম। আজ শনিবার। প্রতি শনিবার শহরের মোবাইল পাঠাগারে আমাকে একটি সাহিত্য আসর উপস্থাপন করতে হয়। সন্ধ্যায় পাঠাগারে বসে নোট করছিলাম। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। চার্জার লাইট নিয়ে আসার জন্য কেয়ার টেকার হাবীবকে ডাক দেই। কোন সাড়া শব্দ নেই। চারদিকে থমথমে পরিবেশ। বাইরে প্রচন্ড দমকা বাতাস। বাতাসের ঝাপটায় জানালার কপাট বারবার ধাক্কা খেয়ে ঠাস ঠাস শব্দ করছে। হলরুমে আমি একা। অন্ধকারেই কারো ডাক শুনি। ভয়ে গলা শুকিয়ে যায়।
কে?
দিদি আমি।
আমি কে?
আমি তনু।
ও তনু। আমার মোবাইলে টর্চ জ্বলছে না। দেখো তো তোমারটা জ্বলে কিনা।    
সরি দিদি।
আমার মোবাইলে চার্জ নেই।
এখন কী করি! হাবীব ভাইও আসছে না, ফোনও রিসিভ করছে না। বাইরে ঝড় তুফান থাকায় লেখকরাও কেউ আসছেন না। এখন অন্ধকারে শুধু আমি আর তনু। তনু প্রতি শনিবারই সবার আগে চলে আসে। যায়ও সবার শেষে। সাহিত্য আসর শেষ হলে তনু আরো কিছুক্ষণ বসে। আমার সাথে আড্ডা দেয়। তার পুরো নাম অরূপ সূত্রধর তনু। তবে তনু নামেই সবার কাছে পরিচিত। তনুর গায়ের রং শ্যামলা হলেও চেহারাটা মায়াবি। মাথা ভর্তি কুকড়ানো চুল। শান্ত স্বভাবের হলেও বন্ধুদের কাছে সে আড্ডাবাজ, চঞ্চল। তনু শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম বিভাগের ছাত্র। ক্যাম্পাসে বেশ জনপ্রিয়। এবার ¯œাতক শেষবর্ষে পড়ছে। ভালো আর্ট করে। গানের গলাও তার চমৎকার। তার ইচ্ছে পড়াশোনা শেষ করেই একটি আর্ট স্কুল খুলবে। মাঝে মাঝে ফোন করে আমাকে গান শুনায়, কবিতা শুনায়। তনু যেমন ভালো গান গাইতে পারে, তেমনি ভালো আকঁতেও পারে। চিত্রশিল্পী হিসেবে ইতিমধ্যে বেশ খ্যাতি পেয়েছে।
বাইরে ঝড় আর বাতাসের ঝাপটা ক্রমেই বাড়ছে। আজ আসরে লেখক-সাহিত্যিকরা আসবে বলে মনে হচ্ছেনা। অন্ধকারে আর কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে। আমি ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও তনুকে বুঝতে দেই না। তনুর গানের গলাটা চৎমকার। ভয় কাটানোর জন্য আমি তনুকে বলি, একটি গান শুনাও। তনু গান গাইতে শুরু করে। তনু গান গাইছে। কবিতা আবৃত্তি করছে। এভাবে চলছে। গানের পর কবিতা, কবিতার পর গান। এভাবে ঘুটঘুটে অন্ধকারেই দুজনের আড্ডায় কখন যে রাত ন’টা বেজে গেছে টেরই পাইনি। তনুকে বললাম খাতায় স্বাক্ষর দাও। বাসায় চলে যাবো।
বাইরে বেরিয়ে দেখি বৃষ্টি থামার কোন নাম নেই। বৃষ্টির ফলে রাস্তাঘাটে পানি জমে গেছে। রিকশা-টিকশা কিছুই নেই। এমন কি মানুষজনও নেই। পুরো রাস্তা ফাঁকা। আজ আর গাড়ী পাওয়া যাবে না মনে হচ্ছে।
তনু বললো, দিদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর। দেখি কোন গাড়ী পাওয়া যায় কিনা।  
না, শুধু শুধু দাড়িয়ে থাকলে আরো দেরি হবে। তার চেয়ে বরং হেঁটে সামনে যাই। দেখি গাড়ী পাই কিনা।
পাঠাগারের সামনেই বিদ্যুৎ অফিস। সেখানে একজনকে জিজ্ঞাসা করি বিদ্যুৎ আসতে কতক্ষণ লাগবে। লোকটা জবাব দেয়, পুরো শহরে বিদ্যুৎ নেই। আজ আর আসবে না। বিদ্যুৎতের লাইনে সমস্যা হয়েছে।
এখন অন্ধকারে বাসায় যাবো কিভাবে। তনু বলে, দিদি তোমাকে বাসায় এগিয়ে দেই। তারপর অন্ধকারের মধ্যেই তনু আর আমি হেঁটে চলি। বৃষ্টির ফোটা আমাদের গায়ে এসে পড়ছে। আমি আর তনু পাশাপাশি হাঁটছি আর কথা বলছি। হঠাৎ দমকা বাতাস শুরু হয়। মনে হচ্ছে আমাদের উড়িয়ে নেবে। দু’জন হেঁটে চলে আসি শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে। পাশেই কবরস্থান। হঠাৎ অদ্ভুত এক শব্দ চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ভয়ে গা শিউরে ওঠে। কবরস্থানের পাশেই একটি বাঁশঝাড়। বাঁশের শাখাগুলো বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে হেলছে-দুলছে। আরেকটু সামনে আসতেই বন বিভাগের বাংলো। উঁচু টিলার উপরে বাংলোটি। ভেতরে সারি সারি গাছগুলোর ছায়ায় কেউ যেন হাতছানি দিচ্ছে। রাত আর কত হবে। তবু বিদ্যুৎ না থাকায় শহরটিকে ভয়ানক অন্ধকারে অচেনা লাগছে। মনে হচ্ছে শ্মশানের নিরিবিলি রাস্তায় গভীর রাতে দু’জন হেঁটে যাচ্ছি। এ সময় তনুকে বলি, আমার খুব ভয় করছে।
ভয় পেয়ো না দিদি, আমি আছি। এই বলে তনু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে। হাঁটতে হাঁটতে বাসার কাছে চলে এসে যখন তনুর কাছ থেকে বিদায় নেবো, দেখি এ কী, পাশে তনু নেই। তনু, এই তনু! কোনো সাড়া নেই। কীভাবে যে ছেলেটা কিছু না বলে হাওয়া হয়ে গেলো!
কয়েক বার ডাকার পর তাকে না পেয়ে ভাবলাম হয়তো ক্যাম্পাসে ফিরে গেছে। আমি বাসায় চলে আসি। মধ্যরাতে হঠাৎ মোবাইলের রিংটোনে শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। হ্যালো... হ্যালো...। অপাশ থেকে কোন কথা আসছে না দেখে লাইনটা কেটে দিয়ে সাইলেন্ট করে ঘুমিয়ে পড়ি।
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি কারো হাতের পাঁচ আঙ্ুলের ছাপ লেগে আছে আমার হাতে। মনে করতে পারছি না, হাতটি লাল কেন। অফিসের জন্য তৈরি হয়ে ব্যাগে টিফিন ঢুকাতে একটি কাগজ পাই। খুলে দেখি ছোট্ট একটি কবিতা। আর কবিতার নিচেই আমার ছবি আঁকা। তখন মনে পড়ল তনুর কথা। কাল রাত পাঠাগারে তনু কবিতা পড়েছিল। কবিতা পড়ে কাগজটি আমাকে দিয়েছিল। তনুর হাতে আঁকা ছবি খুবই চমৎকার। একদিন তাকে বলেছিলাম আমার একটি ছবি এঁকে দিতে।
অফিসে এসেই দেখি তনুর অনেকগুলো মিসকল। সাথে সাথে তনুকে ফোন করি। দুঃখিত এই মুহুর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাকে না পেয়ে বসুকে ফোন করি। বসু ফোন রিসিভ করেই বলে, স্যরি আপা কাল বৃষ্টির কারণে আসরে আসতে পারিনি।
কী খবর তোমার?
জি, ভালো।
আচ্ছা, তনুর ফোন অফ কেন বলতে পারো? কাল রাতে আমাকে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে হঠাৎ গায়েব হয়ে গেলো।
বসু বিস্মিত গলায় বলে, কী বলছো আপু, গত সপ্তাহে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তনু মারা গেছে। তুমি জানো না?
বল কী!
আমি বিস্মিত হই। তাহলে গতরাতে কে আমাকে কবিতা ও গান শুনালো? কে আমার ছবি এঁকে দিলো? কে আমাকে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিলো? কে তাহলে কাল পাঠাগারে এসেছিলো? কার আঙুলের স্পষ্ট ছাপ আমার হাতে লেগে আছে?
আমি তনুর হাতে লেখা কবিতা কাগজটি হাতে নিতেই কয়েক মুহুর্তের জন্য নিজেকে কোথায় হারিয়ে ফেলি। আমি অদ্ভুত এক অস্থিরতা অনুভব করি। সমস্ত শরীর হিম হয়ে আসে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT