ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল ওসমানী

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-১২-২০১৭ ইং ০০:১৬:০০ | সংবাদটি ১৭৯ বার পঠিত

বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের মহাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী। তাঁর অকৃত্রিম চেষ্টা ও চরম ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। তিনি আমাদের সিলেটের সন্তান। আমাদের গৌরব। ১৯১৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে ওসমানী জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেটের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতার নাম খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ও মাতার নাম জোবেদা খাতুন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস সিলেটের বালাগঞ্জ থানার দয়ামীর গ্রামে। ওসমানীর পিতা ছিলেন সুনামগঞ্জের এসডিও। তিনি পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। তাঁর বড় ভাই পাকিস্তান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তাঁর বড় বোন অল্পবয়সে মারা যান। হযরত শাহজালালের সফরসঙ্গী ৩৬০ জন আউলিয়ার অন্যতম হযরত নিজামুদ্দীন ওসমানী (রহ.) এর মাজার দয়ামীরে অবস্থিত। আতাউল গণি শাহ নিজামুদ্দীন ওসমানীর অধঃস্তন বংশধর।
১৯২৯ সালে আসামের কটনস্কুলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯৩৪ সালে সিলেট পাইলট হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পাশ করেন। তারপর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি সেখান থেকে আইএ এবং বিএ পাশ করেন এমএ প্রথম পর্ব শেষ করেন। এরই মধ্যে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু এমএ ফাইনাল পরীক্ষার পূর্বেই সৈনিক জীবন তাকে হাতছানি দেয়।
সে যুগে বাঙালি মুসলমানের পক্ষে আর্মিতে যোগ দেয়া ছিল রীতিমতো দুঃসাহসের কাজ, বিশেষ করে খান বাহাদুর মফিজুর রহমানের ছেলের পক্ষে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল ওসমানী হবেন আইসিএস অফিসার। কিন্তু ওসমানী যোগ দিলেন সামরিক বিভাগে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এটিই তাঁর জীবনের প্রথম বিদ্রোহ।
১৯৩৯ সালের জুলাই মাসে ওসমানী ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪০ সালের ৫ অক্টোবর তিনি ইন্ডিয়ান মিলিটারী একাডেমি থেকে সামরিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কশিমনপ্রাপ্ত হন। এরপর দ্রুত পদোন্নতি লাভ করে ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যাপ্টেন এবং ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের সর্বকনিষ্ট মেজর হন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে একটি ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক হয়ে তিনি সামরিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। সেনাবাহিনীতে ওসমানী ১৯৪৭ সালের প্রথম দিকেই লে. কর্নেল পদের জন্য মনোনীত হন এবং ব্রিটিশ ভারতের সিমলাস্থ জেনারেল হেড কোয়াটার্স এ সেকেন্ড গ্রেড স্টাফ অফিসার নিযুক্ত হন।
১৯৫১ সালে ওসমানীকে তাঁর চাকুরি জীবনে প্রথমবার তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলী করা হয়। এমএজি ওসমানী চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯৫১-১৯৫৫ সালের মধ্যে তিনি খুলনা, যশোর, ঢাকা ও চট্টগ্রামের স্টেশন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালের মে মাসে মিলিটারী অপারেশনের ডেপুটি ডাইরেক্টর পদে এবং ১৯৫৭ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হন। ওসমানী ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসেবে বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করেন। ১৯৬৭ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৭০ সালের জুলাই মাসে ওসমানী রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং ঐ বছরের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জেনারেল ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী ও একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন। জাতির প্রতি তাঁর চরম ত্যাগ ও মহান সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার কর্নেল এমএজি ওসমানীকে ১৯৭২ সালে জেনারেল পদে উন্নিত করেন। ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল হতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ বিলুপ্ত হওয়ায় তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৭৩ সালে ওসমানী জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে একটি রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় জনতাপার্টি’ গঠন করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একবার জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে এবং আরেকবার বিচারপতি আবদুস সাত্তারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরাজিত হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন। ওসমানী ছিলেন নিরহঙ্কার, অপরের দুঃখ মোচনে সদা তৎপর। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের খোঁজ খবর নিতেন তিনি সর্বদাই। তিনি সেনা কর্মকর্তা হলেও উদার এবং শিশুর মতো সরল মনের অধিকারী ছিলেন।
তিনি কুকুর পালতেন, তাঁর কুকুর প্রীতি ছিল প্রায় বাতিকের মতো। বেশভূষায় সব সময় টিপটপ থাকতেন। সময়ানুবর্তিতা ছিল তাঁর চরিত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ওসমানী অত্যন্ত মাতৃভক্ত ছিলেন। সব সময় মায়ের কথা স্মরণ করতেন। এমনকি তাঁর ইচ্ছা ছিল মায়ের কবরের পাশে সমাহিত হওয়ার। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর সমুদয় সম্পত্তি তার নিজের ও মায়ের (ওসমানী-জোবেদা ট্রাস্ট) যুক্তনামে ওয়াক্ফ করে যান। এই ট্রাস্টের আয় দিয়ে ছাত্রদের পড়ার খরচ ও জনহিতকর কার্যে ব্যয় করা হয়। ১৯৮৩ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান এবং সেখানেই ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৫৬ বছর বয়সে জেনারেল ওসমানী ইন্তেকাল করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী হযরত শাহজালাল (রহ.) এর দরগায় তাঁর মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় জেনারেল এমএজি ওসমানীর অবদান অনস্বীকার্য। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সাহসী বীর, আমাদের সিলেটের কৃতী সন্তান জেনারেল ওসমানীর প্রতি রইল আমার বিন¤্র শ্রদ্ধা।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT