ধর্ম ও জীবন

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও তাঁর ফিকাহ

প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-১২-২০১৭ ইং ২২:৩১:৪০ | সংবাদটি ২৪৫ বার পঠিত


(পূর্ব প্রকাশের পর)
ফিকাহ শাস্ত্রের জনক
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) যদিও ইলমে কালাম ইলমে হাদীস ও ইলমে ফিকাহ সব কিছুতেই পারদর্শী ছিলেন তবুও তিনি সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে ছিলেন ইলমে ফিকাহর খেদমতে। ইজতেহাদের ক্ষেত্রে তাঁর মূলনীতি ছিল এই যে, তিনি নিজেই বলেছেন “আমি ইজতেহাদের ক্ষেত্রে প্রথমে কিতাবুল্লাহর হুকুম গ্রহণ করি। কিতাবুল্লাহতে কোন হুকুম না পেলে আমি হাদীসকে গ্রহণ করি। আবার হাদীসে সে হুকুম না পেলে আমি সাহাবায়ে কেরামের ইজমা গ্রহণ করি আবার এ ব্যাপারে কোন ইজমা না পেলে সেই ব্যাপারে আমি ইজতেহাদ করি-আর এটাই আমার মাজহাব।” তখনও কোন আইন গ্রন্থ রচিত হয়নি; তাই তিনি মুসলিম মিল্লাতের স্বার্থে একাজ সম্পন্ন করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর হাজার হাজার ছাত্র ছিলেন। এর মধ্যে বিশিষ্টতা লাভ করেন ৪০ জন। এ ৪০ জন বিশিষ্ট ছাত্র নিয়ে তিনি একটি বোর্ড গঠন করেন-এ বোর্ডের প্রধান ছিলেন তিনি। যে কোন মাসআলা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতেন বোর্ডের ৪০ জন সদস্য। এই তর্ক-বিতর্ক চলতো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। অতঃপর সকলে ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারলে সেটিই লিপিবদ্ধ করা হতো। উল্লেখ্য যে, ইমাম আবু হানিফা (রঃ) প্রতিষ্ঠিত এ ফিকহী বোর্ড ১২ লক্ষ ৯০ হাজার মাসআলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন ইমাম আবু হানিফা (রঃ) শরীয়তের মাসআলা গুলোর যে রূপে সঠিক ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এরূপ সঠিক ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত আর কেউ দিতে পারেননি, পারবেনা এ জন্য সারা বিশ্বের ওলামায়ে কেরামগণ ইমাম আবু হানিফা (রঃ) কে ‘ফিকাহ শাস্ত্রের জনক’ বলে অভিহিত করেছেন।
কয়েকজন বিশিষ্ট ছাত্র
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর হাজার হাজার ছাত্র ছিলেন। এরা সবাই ছিলেন খ্যাতিমান। এদের বিশিষ্ট কয়েকজনের নাম নি¤েœ দেয়া হলো (১) কাজী আবু ইউসুফ (রঃ), (২) আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রঃ), (৩) আবু ইসহাক ফাজারী (রঃ), (৪) মক্কী ইবনে ইব্রাহীম (রঃ), (৫) ইব্রাহীম ইবনে তাহমান (রঃ), (৬) ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামান (রঃ), (৭) ইউনুস ইবনে আবু ইসহাক (রঃ), (৮) আবু আবু বকর ইবনে আয়াশ (রঃ), (৯) আবু আসিম নাবিল (রঃ), (১০) জারির ইবনে আব্দুল হামিদ (রঃ), (১১) ওয়াকী ইবনে জাররাহ (রঃ), (১২) ইয়াজীদ ইবনে হারুন (রঃ), (১৩) আব্দুর রহমান মক্কী (রঃ), (১৪) হামজা ইবনে হাবীব আজ-জায়াত (রঃ), (১৫) হাফ ইবনে গিয়াস (রঃ), (১৬) হাসান ইবনে সালেহ (রঃ), (১৭) ঈসা ইবনে ইউনুস (রঃ), (১৮) আলী ইবনে মুসহির (রঃ), (১৯) ইমাম মুহাম্মদ (রঃ)।
মনীষীদের দৃষ্টিতে আবু হানিফা (রঃ)
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) তাঁর সময়ের সেরা মুহাদ্দীস ও ফকীহ ছিলেন। তাঁর জন্ম না হলে গোটা মুসলিম উম্মাহ কোরআন-হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা থেকে বঞ্চিত হয়ে যেত। ইমাম বুখারী (রঃ)-এর উস্তাদ মক্কী ইবনে ইব্রাহীম (রঃ) ইমাম আবু হানিফা (রঃ) সম্পর্কে বলেন, “তিনি তাঁর যুগের সর্বাধিক বড় আলেম ছিলেন” (তাহজীবুত তাহযীর)। প্রখ্যাত হাফিজে হাদীস ইয়াজিদ ইবনে হারুন (রঃ) বলেন “আমি এক হাজার মাশাইখে হাদীসকে পেয়েছি এবং তাঁদের অধিকাংশ থেকেই আমি হাদীস লিপিবদ্ধ করেছি। তন্মধ্যে পাঁচ জনকে ফকীহ, আলেম ও মুত্তাকী হিসেবে পেয়েছি-তাদের মধ্যে প্রধান ও সেরা ছিলেন ইমাম আবু হানিফা (রঃ)”। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, “যে কেউ ফিকাহ জানতে ইচ্ছে করে সে আবু হানিফার মুখাপেক্ষী”  (বেদায়া ওয়ান নেহায়া)। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) আরো বলেন, “ইলমে ফিকহে সকলেই ইমাম আবু হানিফার পরিবারভুক্ত (মুকাদ্দামায়ে ইলাউস সুনান)। শাকীক বলখী (রঃ) বলেন-ইমাম আবু হানিফা (রঃ) তৎকালীন যুগের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরহেজগার, সবচেয়ে বড় আলেম ও সর্বাধিক বড় ইবাদত গুজার ছিলেন”। সুফিয়ান মওরী (রঃ) বলেন, “ইমাম আবু হানিফা (রঃ) পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ ছিলেন।” আব্দুল্লাহ ইবনুল মোবারক (রঃ) বলেন, “ইমাম আবু হানিফা (রঃ) সমকালীন লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ ছিলেন ইলমে ফিকাহর ক্ষেত্রে আমি তাঁর সমকক্ষ আর কাউকে দেখিনি।” ইমাম আবু হানিফা (রঃ) সে সময়কার যাবতীয় জ্ঞান আহরণ করেছিলেন। তাঁর উস্তাদগণের মধ্যে সকলেই ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠ আলেম। তাদের সাহচর্যে থেকেই তিনি সীমাহীন মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলেন।
ইমাম আবু হানিফার রচনাবলী
ইমাম আবু হানিফা (রঃ)-এর রচিত গ্রন্থাবলী অনেক। তাঁর রচিত অধিকাংশ গ্রন্থ আকাইদ বিষয়ক। তাঁর রচিত কয়েক খানা গ্রন্থ হচ্ছে- (১) আল ফিকহুল আকবর, (২) আল ফিকহুল আবসাত, (৩) মুসনাদে আবু হানিফা, (৪) অসিয়া ইলা ইবনিহি হাম্মাদ, (৫) অসিয়া ইলা তিলমিজিহি ইউসুফ ইবনে খালিদ, (৬) অসিয়া ইলা তিলমিজিহি আল কাজী আবু ইউসুফ, (৭) মারিফাতুল মাজাহিব, (৮) আজ জাওয়াবিত আস সালাসা, (৯) রিসালা ফিল ফারায়েজ, (১০) দু’আউ আবি হানিফা, (১১) কিতাব আল আলিম ওয়াল মুতাআল্লিল, (১২) রিসালা ইলা উসমান আল বাত্তি, (১৩) মুখাতাবাতু আবি হানিফা মাআ জাফর ইবনে মুহাম্মদ, (১৪) কিতাবুল মাকসুদ ফিস সারফ, (১৫) বাআজ ফতোয়া আবু হানিফা, (১৬) কিতাবুল মাখারিজ ফিল হিয়াল, (১৭) আল-অসিয়া, (১৮) মুজাদালা লি আহাদিদ দাহরিন, (১৯) আর-রিসালা, (২০) আল-কাছিদা আল কাফিয়া-আন নোমানিয়া।
ইমামুল মুসলিমিন উপাধি-
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ছিলেন এক প্রকৃত আশিকে রাসূল। রাসূল (সাঃ) এর প্রতি সর্বোচ্চ মহব্বত তাঁকে এত উচ্চ আসনে সমাসীন করেছে। তিনি নবী (সাঃ)-এর পবিত্র রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে এশক ও মুহব্বতের সাথে যখন বললেন “আস সালাতু ওয়াস সালামু আলাইকা ইয়া সাইদিয়্যদাল মুরসালিন।” তখন রওজা মোবারক থেকে আওয়াজ আসল “ওয়া আলাইকাস সালাম ইয়া ইমামাল মুসলিমিন।” ইমাম আবু হানিফাকে নিয়ে রচিত গ্রন্থাবলী-
ইমাম আবু হানিফাকে নিয়ে রচিত হয়েছে অগণিত গ্রন্থাবলী। নি¤েœ কয়েকখানা গ্রন্থের নাম দেয়া হলো ঃ (১) নবজাতুন মিন মানাকিব আবি হানিফা-আবুল হুসাইন আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-কুদুরী, (২) মানাকিব আল-ইমাম আজম-আবু বকর আহমদ ইবনে আলী ইবনে সাবিত আল খতিব আল বাগদাদী, (৩) ফাজাইলে আবু হানিফা-আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আম-মাদী-দামিস্ক, কায়রো, (৪) হায়াত আল ইমাম আবু হানিফা-সাইয়্যেদ আফিকী, (৫) ইখতিলাক আবি হানিফা ওয়া আবি লায়লা-আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইব্রাহীম-মৃত ঃ ১৮২ হিজরী। (৬) মানাকিবে আবি হানিফা ওয়া আখবার আসহবিহি-আবুল হাসান দিনওয়ারী, (৭) মানাকিবে আবি হানিফা আবু আব্দুল্লাহ হুসাইন ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মদ-মৃত ৪৩৬ হিজরী, (৮) রযুদ আলা আবি হানিফা-আবু বকর ইবনে আবি শায়বা-মৃত ঃ ২৩৫ হিজরী, (৯) মানাকিব আবু হানিফা-মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ নকীব-মৃতঃ ৭৪৫ হিজরী। (১০) মুখতালাক বাইনা আবু হানিফা ওয়াশন শাফিয়ী-আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইবনে হুমাইদ নাসেহী মৃত ঃ ৪৪৭ হিজরী। এছাড়া আরো অনেক গ্রন্থ।
ইন্তেকাল-
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ১৫০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। বিষপানে তাঁকে কারাগারে হত্যা করা হয়। হাজার হাজার লোকের উপস্থিতিতে ছয় বার তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বাগদাদের খাইজরান নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT