ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কোরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-১২-২০১৭ ইং ২২:৩৫:১৯ | সংবাদটি ৩১২ বার পঠিত


সুরা বাকারা
আয়াত ১৮৯-২০৩, রুকু-২৫, মদিনায় অবতীর্ণ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
অবিরাম যুদ্ধ
অতপর ১৯৩ নং আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে, ‘তাদের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও, যখন আর কোনো বাধা বিপত্তি অবশিষ্ট থাকবে না এবং আনুগত্য কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যেই নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। তবে তারা যদি নিরস্ত্র হয়, তবে তাদের সাথে আর কোনো শত্রুতা থাকবে না, অবশ্য যালেমদের কথা ভিন্ন।’ এ আয়াত নাযিল হওয়ার সময় আরব উপদ্বীপে একমাত্র মোশরেকরাই ছিলো সেই শক্তি, যা মানুষকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দিচ্ছিলো, ইসলাম গ্রহণকারীদেরকে নির্যাতনের মাধ্যমে ইসলাম ত্যাগের প্ররোচনা দিচ্ছিলো এবং আল্লাহর দ্বীপের নিরংকুশ আধিপত্য ও বিজয়ের পথ রোধ করছিলো।
কিন্তু স্থান ও কালের বিচারে এ আয়াতের বক্তব্য আরব উপদ্বীপের তৎকালীন মোশরেকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সকল জায়গার ও সর্ব যুগের এরূপ প্রতিবন্ধক শক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জেহাদ কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কেননা এমন যালেম শক্তির উদ্ভব প্রতিদিনই হচ্ছে, যা মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, আল্লাহর পথের আহবানে সাড়া দিতে আগ্রহী হলে তা গ্রহণে তাদেরকে বাধা দিচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তা মেনে চলতে দিচ্ছে না। মুসলিম জাতির ওপর এ দায়িত্ব চিরদিনই ন্যস্ত রয়েছে যে,এ ধরনের যালেম শক্তিকে যেন তারা ধ্বংস করে দেয়, তাদের গোলামী থেকে যেন জনগণকে মুক্ত করে এবং আল্লাহর দাওয়াত তারা যেন শুনতে ও স্বাধীনভাবে গ্রহণ করতে পারে।
ফেতনা তথা ইসলামের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর যে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চেষ্টা তথা চক্রান্ত, সন্ত্রাস, গোলযোগকে হত্যার চেয়েও গুরুতর আখ্যা দেয়ার পর তার উচ্ছেদ সাধন ও প্রতিহত করনের এই পুনরুল্লেখ ও পুনরুক্তি থেকে বুঝা যায় ইসলাম এ বিষয়টিকে কত গুরুত্ব দেয়। সে এই মর্মে একটি মহান মতবাদ তুলে ধরে যে, ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে আসলে মানুষের পুনর্জন্ম সংঘটিত হয়। এই পুনর্জন্ম বা নবজন্মের মধ্য দিয়ে মানুষের মূল্য তার আকীদা ও বিশ্বাসের মূল্য অনুসারে নির্ধারিত হয়ে থাকে। এক পাল্লায় তার জীবন ও অপর পাল্লায় তার আকীদা বিশ্বাসকে রাখা হলে আকীদার পাল্লাই ভারী হয়। এই মতবাদে ‘মানুষের’ শত্রু কারা তাও নির্ণিত হয়ে যায়।
মানুষের প্রকৃত শত্রু হচ্ছে তারা যারা কোনো মোমেনকে তার ধর্ম থেকে ফেরানোর অপচেষ্টা চালায় এবং কোনো মুসলমানকে নিছক ইসলাম গ্রহণ বা পালনের দায়ে নির্যাতন করে। তারাই মানব জাতিকে তার কল্যাণ ও সমৃদ্ধির শ্রেষ্ঠতম উপকরণ থেকে বঞ্চিত করে এবং তার আল্লাহর দ্বীন গ্রহণের পথ অবরোধ করে। মানবতার এই দুশমনদেরকে প্রতিহত করা ও হত্যা করা মুসলিম জাতির কর্তব্য যাতে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ী হওয়ার পথে আর কোনো বাধা বিপত্তি অবশিষ্ট না থাকে।
বস্তুত কোরআন অবতরণের সূচনাকাল থেকেই যুদ্ধ সম্পর্কে ইসলামের এই নীতি চালু রয়েছে এবং তা কার্যকর রয়েছে। ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে আক্রমণ ও নির্যাতন পরিচালনাকারীদের আচরণ নানারকমের হয়ে থাকে। আর মোমেনরা এই নির্যাতন ও যুলুম কখনো ভোগ করে ব্যক্তিগতভাবে, কখনো দলগতভাবে আবার কখনো জাতিগতভাবে, তবে যে যেভাবেই নির্যাতনের সম্মুখীন হোক না কেন, নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করা ও তাকে খতম করা তার কর্তব্য। এভাবেই ইসলামের এই সুমহান নীতিকে সে বাস্তবায়িত করবে। আর এটা হচ্ছে মানুষের নতুন জন্মের শামিল।
কিন্তু যখনই যালেমরা যুলুম ও নির্যাতন থেকে বিরত হবে এবং মানুষকে আল্লাহর দ্বীন গ্রহণের পথে বাধা দেয়া বন্ধ করবে, তখন আর তাদের সাথে শত্রুতা থাকবে না। কেননা যুলুম ও যালেমকে প্রতিহত করাই জেহাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। এটাই ১৯৩নং আয়াতের মর্ম। এখানে যালেমকে প্রতিহত করার সংগ্রামকে ‘উদওয়ান’ তথা শত্রুতা ও আক্রমণ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে নিছক শাব্দিক সাদৃশ্যের কারণে। নচেৎ এটা আসলে সুবিচার ও মযলুমদের ওপর যুলুমের প্রতিকার।
পবিত্র মাসে যুদ্ধের বিধান
ইতিপূর্বে যেমন মাসজিদুল হারামের কাছে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনি ১৯৪নং আয়াতে জানানো হচ্ছে নিষিদ্ধ মাসগুলোতে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার বিধান, ‘পবিত্র মাস পবিত্র মাসের বিনিময়ে। সমস্ত পবিত্র জিনিস আর অবমাননা নিষিদ্ধ, তার অবমাননায় সমান প্রতিশোধ। সুতরাং যে কেউ তোমাদের ওপর আক্রমণ চালাবে, তোমরাও তার ওপর অনুরূপ আক্রমণ চালাও। তবে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ সংযমী লোকদের সাথে থাকেন। (অসমাপ্ত)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT