পাঁচ মিশালী

ছোট পরিবার সুখি পরিবার

নওরোজ জাহান মারুফ প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১২-২০১৭ ইং ০২:২৩:৫১ | সংবাদটি ৯৬৫ বার পঠিত

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের সময় এদেশের লোকসংখ্যা ছিল প্রায় সাত কোটি। সময় গড়াতে গড়াতে আজ সে সংখ্যাও অনেক বেশি। সরকারী হিসেবে বলা হয় এ সংখ্যা ষোল কোটি। ষোল কোটি বলা হলেও সঠিকভাবে পরিসংখ্যান করলে এ সংখ্যা বেড়ে অনেক বেশিই হবে। দেশের রাস্তাঘাটে বেরুলে যে চিত্র চোখে পড়ে তাতে মনে হয় বর্তমান জনসংখ্যা আঠারো কোটিতে পৌঁছে গেছে।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে নূজ্য প্রায় এ ধরায় মানুষের চাহিদার শেষ নেই। চাওয়া-পাওয়ার হিসেব কষলে দেখা যায় প্রতিনিয়ত যেভাবে দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে ঠিক তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের চাহিদাও। সমাজে বাস করতে হলে মানুষের কিছু মৌলিক চাহিদারও প্রয়োজন হয় বৈকি। তবে হ্যাঁ, সব চাওয়া-পাওয়ার হিসেব মিলাবার আগে হিসেব মিলাতে হবে জনসংখ্যার। জনসংখ্যার উপর একটা দেশের আয় উন্নতি নির্ভর করে। ক্রমাগত জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে দেশ এগুতে পারবেনা সামনের দিকে- ভারসাম্যও ঠিক থাকবে না।
গতবছর সরকারের এক স্বাস্থ্য জরিপ থেকে জানা গেছে-দেশের প্রজনন হার আশানুরূপভাবে কমেনি। এ সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য অপর দিকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার বেড়েছে মাত্র এক শতাংশ। এটা খুবই নাজুক পরিস্থিতি এ দেশের জন্য। এটার জরুরিভাবে পরিবর্তন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম দিনে দিনে ঝিমিয়ে পড়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এ কার্যক্রম খুবই জোরালো ছিল। প্রচার-প্রচারণাও ছিল অনেক বেশি। রেডিও, টিভিতে অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে চলতো বিজ্ঞাপন তার প্রায় বেশি সময়ই জুড়ে থাকতো পরিবার পরিকল্পনার গান, জিবন্তিকা, নাটক সমেত কমার্শিয়াল। অন্যদিকে পরিবার পরিকল্পনার কর্মীরা বাড়ি গিয়ে গিয়ে এ সম্পর্কে নানা তথ্য দিতেন বুঝাতেন কিভাবে পরিবার ছোট রাখা যায়। ছোট পরিবারের সুবিধা অসুবিধাগুলো তারা বণর্না করতেন। এ সময় তারা পরিবার পরিকল্পনার নানা সামগ্রীও বিনা মূল্যে বিতরণ করতেন। মাঠ পর্যায়ে মহিলা কর্মীরা মূলত বাসাবাড়ি গিয়ে বিবাহিত মহিলাদের এসব তথ্য দিতেন এবং বুঝাতেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিবারের নানা দিক ও কুফল সম্বন্ধে। এখন আর এ দিন নাই, সব ডিজিটাল হয়ে গেছে। এটা এখন আর চোখে পড়ে না। রেডিও, টিভিতেও আজকাল পরিবার পরিকল্পনার বিজ্ঞাপন প্রায় নাই-ই। একটা দেশ বা রাষ্ট্রের জন্য পরিবার পরিকল্পনা বা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি যে কতটা বড় প্রয়োজনীয় বিষয় তা বোধ করি আর না বিশ্লেষণ করলেও চলবে।
আমরা ছোট বেলায় দেখেছি পথে-ঘাটে অনেক স্থানেই পরিবার ছোট রাখতে নানা প্রচার কার্যক্রম করা হত। প্রজেকটারের মাধ্যমে গাড়িতে করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণমূলক নাটিকা বা প্রামান্যচিত্র দেখানো হত অধিকাংশ জনবহুল এলাকায়। আমি এতোই ছোট ছিলাম যে এসব দেখতাম কিন্তু বিষয়বস্তু কি তা বুঝতে পারতাম না। এখন বুঝি এইসব কার্যক্রম একটা দেশের জন্য খুবই জরুরি। দেশ যত ধনী বা গরীবই হোক এটা কোন ব্যাপার নয়, পরিবার ছোট রাখতে হবেই। দেশের জন্য পরিবার পরিকল্পনার প্রচারণা অবশ্যই প্রয়োজন। এইসব প্রচার প্রচারণা সাধারণত নব-দম্পতির জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। এইসব প্রচারণা নব-দম্পতিদের সজাগ করতে, নিজেদের মধ্যে একটু বোঝাপড়া করতে এবং পরিবার গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বর্তমান সময়ে এসব কার্যক্রম বা তৎপরতা কেন যে ঝিমিয়ে পড়লো বুঝি না। আগের জমানায় মানুষ অনেক কনজারবেটিব ছিল তা স্বত্বেও এসব দিক ভালোভাবেই বিবেচনায় নিতেন তারা।
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় দেশ এ কথাটি বহু উচ্চারিত। এক সময়ে বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দিত। এখন সেসব দেশের প্রধানরা বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী। বাংলাদেশের উন্নয়নে তারা এখন আশার বাণী উচ্চারণ করেন। বিশ্ব নেতারা বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রতিনিয়ত প্রশংসা করে চলেছেন। কিন্তু এসব অর্জন একেবারে থেমে যাবে যদি বর্তমান গতিতে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের উপর গুরুত্বারোপ না করলে জনসংখ্যার চাপে ভারসাম্যহীন হয়ে হিতে বিপরীত হবার চান্সই বেশি। দেশ স্বাধীনের দীর্ঘদিন পরে হলেও দেশের অর্থনীতির চাকা যে সচল আছে তা অস্বীকার করার কোন কারণ নেই। কিন্তু উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রশংসার যে জোয়ার বইছে বিশ্বব্যাপি, তা ধরে রাখাকে অচিরেই জোর দিতে হবে দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের দিকে। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। জন্মনিয়ন্ত্রনের পদ্ধতিগুলো যেমন স্থায়ী এবং অস্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। দুটি সন্তানই যথেষ্ট, একটি হলে আরো ভাল। ‘ছোট পরিবার, সুখী পরিবার’ এইসব স্লোগানগুলিকে আবার সামনে নিয়ে এসে কাজে লাগাতে হবে। দীর্ঘদিন থেকে কিন্তু কিছুটা লেখালেখি হচ্ছে, টিভির টক-শোতেও আলাপ আলোচনা হয় কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গতি আসছে না। গত শতকের শেষের দিকে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম যে গতিতে এগিয়েছিল তা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক মহিলারা আছেন তারা পরিবার পরিকল্পার বিষয়ে একেবারে অজ্ঞ। গত দুই দশকেরও বেশি সময় গেছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কিছু শুনেছে, জেনেছে এমন নারীর সংখ্যা অপ্রতুল। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে জনসংখ্যা বাড়ছে ৪ জন করে। সংবাদপত্র সূত্রে জানা গেছে-পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি জনগণ বাস করে এশিয়া মহাদেশে। স্বাধীনতার বেশ আগে থেকে এ দেশে পরিবার পরিকল্পনা তথা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হয়। বেসরকারীভাবে এই কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তীতে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয় এটাকে। তখন পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয়ভাবে সফলতা আসে বেশ। কিন্তু আজকের বাস্তব অবস্থায় দেখা যায় সরকারিভাবে এ কার্যক্রম চলছে অত্যন্ত ঢিমে তালে। মাঠ পর্যায়ে গরীব ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠির মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া সবশ্রেণির জনগণের মাঝে তো ধর্মীয় গোঁড়ামি রয়েছেই। ইদানিং একটু খেয়াল করলে দেখা যায় শিক্ষিত ধনী এবং সচেতন দম্পতিও আজকাল অধিক সন্তান গ্রহণ করছেন। আর অনাকাঙ্খিত সন্তানের জন্মের হারও নেহায়েত কম নয় এখন।
গত বছরের সরকারী পরিসংখ্যান থেকে জানা গিয়েছিল (স্থানীয় সংবাদপত্রের সূত্রে) যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ১৯৯৩-৯৪ সালে ৪৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে এসে এ হার হয়েছে ৬২ শতাংশ। সরকার ২০১১ সালে জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তাছাড়া সাম্প্রতিকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত জরিপে আশাব্যঞ্জক তথ্য বেরিয়ে এসেছে-তাতে বলা হয়েছে, দেশের মানুষের প্রজনন হার কমেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে জনসংখ্যা হ্রাস পাবে। ফলে কলকারখানা, অফিস আদালতে কর্মীর সংখ্যা কমে যাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্রের সাথে এই তথ্যের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। জনসংখ্যা বর্তমানে যা রয়েছে তা আয়তনের তুলনায় অনেক বেশি। এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে টেকসই অবস্থানে নিয়ে আসতে না পারলে আমাদের রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে বর্ধিত জনসংখ্যা ভবিষ্যতে নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি করবে। তাই একে নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। অবশ্য দুর্বল হয়ে পড়া পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে, সাথে সাথে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। জোর দিতে হবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর। যেখানে প্রতি মিনিটে জনসংখ্যা বাড়ছে ৪ জন করে এ সংখ্যা অব্যাহত থাকলে অচিরেই বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও আশাবাদী। কিন্তু জনসংখ্যার উর্ধ্বগতি ও অন্যান্য নানাবিধ কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেখা গেছে সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও তা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। চলতি অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাষ দিয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যেই থাকবে প্রবৃদ্ধি। কারণ হিসেবে সংস্থাটি বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থবিরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে প্রবৃদ্ধির লক্ষমাত্রা অর্জন করতে হলে জিডিপির ২৮ শতাংশ বিনিয়োগকে ৩৪-৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও উল্লেখিত বিষয়গুলিকে বাংলাদেশ সরকারকে গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে বলে অনেকেই মনে করেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT