মহিলা সমাজ

ডিবির প্রেমে বিবি

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০১-২০১৮ ইং ০২:১৪:৫৯ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

হাওরের দেশ সিলেট। যেমন পাহাড়, টিলার সমারোহ, তেমনি হাজারও ছোট বড় হাওর, যা বর্ষায় কিংবা আষাঢ়ে মেঘের গর্জনে কাছে ডাকে, তেমনি এই হাওর শীতের কুয়াশার সাথে মায়াবি ঘ্রাণ ছড়ায়। সেই ঘ্রাণে ভেসে আসে শাপলা শালুকের মায়া, আবার সেই ঘ্রাণে ভেসে বেড়ায় নিঝুম দ্বীপের ছায়া, মানুষ প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতির উর্ধে কোন সত্তা নেই এবং মানুষ প্রকৃতি থেকেই উদ্বুদ্ধ। তাই তো বুদ্ধদেব গুগ বলেছেন “প্রকৃতিই আমার একমাত্র প্রেমিকা যে আমাকে শুধু আনন্দই দিয়েছে, দুঃখ দেয়নি কোন রকম। তাই তো মাঝে মাঝে প্রকৃতির ছায়ায় এসে নিজের মনের যত রক্তাক্ত ক্ষত আছে সেগুলোকে সারিয়ে তুলি। তেমনি হাওর, টিলা আমায় কাছে ডাকে, ব্যস্ততার ভিড়ে চার দেয়ালের কাজগুলো বড় একগেয়ে লাগে। হারিয়ে যেতে মন চায় তাহাদের নীড়ে। মন যখন এমন আনচান করছে, তখন আবার দেখি প্রযুক্তির চোখে, লাল শাপলার ভালবাসায় সিক্ত হয়ে, ডিবির হাওরের লালটুক টুক লজ্জাবতী গাঁয়ের বধূর সাজ। এমন রূপ আমায় এতটাই ক্ষুদার্থ করে দিল, সবকাজ ফেলে চলে যেতে ইচ্ছে করছে ডিবির হাওরে। অবশেষ গতকাল ফজরের নামাজ পড়ে সিলেট থেকে প্রিয় মনাই আর সাকেরাকে নিয়ে রওয়ানা দিলাম ডিবির হাওরের উদ্দেশ্যে। মনাই যদিও প্রস্তুত, কিন্তু ভুলো মন সাকেরাকে মর্নিং ওয়াকের সাইকেলি থেকে গাড়িতে তুললাম। ডিবির হাওর সম্পর্কে যা জানি তা হচ্ছে, জৈন্তার পূর্বে এর অবস্থান। পৌষ মাসের প্রথম সকাল কুয়াশার সাথে কানামাছি খেলে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে জৈন্তিয়ার দিকে। সিলেট শহরকে পিছনে ফেলে তিন ঘন্টা পর পৌঁছালাম জৈন্তা বাজারে। এত সকাল সবদিকে নিরবতা বিরাজ করছে। জৈন্তা বাজার থেকে এগিয়ে গেলাম আরও কিছুদূর, দু-একজন ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম ডিবির হাওর কোন দিকে সবাই বলে আরও সামনে! এভাবে সামনে যেতে যেতে প্রায় জাফলং এর কাছাকাছি এসে বুঝতে পারলাম অনেক দূর চলে এসেছি। আমার শান্তশিষ্ট মনাই গাড়ী ঘুরিয়ে পিছন দিকে চললো, এবার এক ভদ্রলোককে পেয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি রাজি হলেন রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। ঘিলাতৈল গ্রামের রাস্তায় এসে গাড়ী ছুটে চললো, সরু রাস্তা ধরে। কিছুদূর গিয়ে, গাড়ি থেমে গেল, এবার পায়ে হাঁটা পথ। অতিপ্রাকৃতিক সেই গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটছি, ততোক্ষণে সূর্যের আলোয় আলোকিত চারপাশ, কিছুদূর যেতেই ছোট ছোট জলাশয়ে দেখা মিলল, আমার রূপের রাণি লাল শাপলার। এ যে রথ দেখতে গিয়ে কলা বেচার মতো অবস্থা, হেটে যাচ্ছি আঁকাবাকা মেঠো পথে একপাশে ছবির মতো সাজানো গ্রাম। অন্যপাশে সারি নদী, কি অপরূপ প্রকৃতির মাঝে পাখিদের গান নির্জনতাকে আরও সুন্দর করে তুলছে। ঘিলাতৈল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনা দিয়ে হেঁটে চলছি, পাশ দিয়ে বেহেশতি হাসি হেসে স্কুলে যাচ্ছে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। এই পৌষ মাসের শীতের সাথে হয়তো বেমানান তাদের পরনের পোশাক কিন্তু খুশিমাখা সুখের দৃষ্টির মাঝে হার মানবে, লৌকিক জীবনের সুখ।
এভাবে ঘন্টাখানেক উঁচুনিচু মেঠোপথে হাঁটার পরে চোখের সামনে স্পষ্ট হতে লাগলো শিলা পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে ডিবির হাওর। লাল শাপলার ছাপার শাড়ি যেন শরীরে জড়িয়ে আছে নববধূ। উদাসি বাতাসের দুষ্টামি খেলায় বার বার নষ্ট হচ্ছে মাথার ঘোমটা, আর সবুজ পাহাড় বুকে টেনে নিচ্ছে, লাল শাপলার ফোটা ডিবির হাওরকে। ডান, বাম, উর্দ্ধে, অঃধঃ যেদিকে তাােই একপলক দৃষ্টি থমকে দাঁড়ায়। আমাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
অজয় বিশ্বাসের, যে একজন বিজ্ঞ গাইডের মতো বর্ণনা দিয়ে চলেছে, উদ্দেশ্য তার নৌকায় আমাদেরকে হাওর ঘুরে দেখাবে। হাওরের দিকে তাকিয়ে মন বলে যায় কাব্য নয়, চিত্র নয়, প্রতিমূতি নয়, ধরনি চাহিতেছে শুধু হৃদয়। নৌকায় উঠে মনে হল, আমি যেন কতদিন পর মায়ের কোলে শুয়ে পড়েছি, রোদ্র এস দোল দিয়ে যাচ্ছে, স্বচ্ছ জলে আকাশের ছায়া পাহাড়ের ছায়া, অতিথি পাখির সাথে আকাশজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, দেশি, সাদা বক, বালি হাঁস, পানকৌড়ি, নাম না জানা আরও কত পাখি। মজার ব্যাপার হল, পাখিরা তাদের দলীয় গোত্রের বাইরে নেই। এ যেন প্রাকৃতিক সৌন্দের্যের এক প্রতিযোগিতা, তাদের প্রশ্ন করি, কেন পৃথিবীতে এসেছো? উত্তর দিল আমাদের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য এসেছি। নৌকা এক সময় ডিবির হাওরের হৃদয়ের ভিতরে এসে পৌঁছালো। যেদিকে তাকাই শুধু লাল শাপলার হাতছানি। ছোট বড় ভাসা লাল শাপলার হাতছানি। ছোট বড় ভাসা সবুজ পাতাগুলো লাল আভায় আবৃত। হাওরের মাঝে মাঝে, গাছঘেরা জনমানব হীন সবুজ সবুজ, ডিবি (ছোট দ্বীপের মত)। এমনকি এক দ্বীপে নামার লোভ সামলাতে পারলাম না নেমে পড়লাম। বিশ পঁচিশটা পাতিহাস, রোদের উষ্ণতায় আমাকে কাছে পেয়ে গোল্লাছোট খেলা শুরু করলো। মনে পড়লো রবীন্দ্রনাথের কথা, একটা মন আর একটা মনকে খুঁজিতেছে নিজের ভাবনার ভার নামাইয়া দিবার জন্য, নিজের মনের ভাবকে অনেকের মনে ভাবিত করিবার জন্য।
হাওরের বুকে জাগা ডিবিগুলো কোথাও টিলার মতো, উঁচু, আবার কোথাও সমতল। বেশিরভাগ টিলার পাদদেশ ছোট বড়, কালো সাদা পাথর ঘেরা, নৌকাই বোধ হয় এই জনপদের মূল বাহন। ছোট একটা মেয়েকে দেখলাম। বড় বড় ছেলেদের নৌকাকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বর্গলতা নামের এই কিশোরিকে দেখে মনে হল ও আসলেই একটা স্বর্ণ তাদের মতো স্বর্ণদের নিয়ে বাংলাদেশের গর্ব করার স্বপ্ন দেখে। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের মানুষগুলো, জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে, প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে এতোটাই সম্পৃক্ত যে, তাদের উৎপাদিত বেশিরভাগ পণ্য বিক্রি এবং বাজারজাত করা হয়, প্রতিবেশি রাষ্ট্রে। গ্রাম দেখার সাথে, কিছু কথা হয় ডিবির হাওর বাসির সাথে। একপার্যায়ে জানতে ইচ্ছা করে, বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কেন, প্রতিবেশি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল, সবার একই জবাব, যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য।
অবাক করা শাপলা রাজ্য থেকে যখন ফিরছি, কালো পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার পথে বার বার থামছে মন, থামছে দৃষ্টি বাঁশ ঝাড় আর বোনফুলের ঝোপে পাখিদের এক স্বর্গ রাজ্যে। নাম জানা, আর অজানা পাখিরা গান গাইছে। আর পাখিদের সুরে তাল মিলিয়ে নেছে যাচ্ছে রঙ্গিন প্রজাপতির দলা। এমন স্বর্গ  থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না সহজে। তবুও ফিরতে হয়। আঁকা বাকা মেঠো পথে আমি, মনাই আর সাকেরা মনের গভিরে রচিত হতে থাকে। বিভাগি প্রেম, লাল শাপলা আদরের আহ্লাদ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT