মহিলা সমাজ

স্বপ্ন দেখেই মানুষ বড় হয়

আনোয়ারা সুজিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০১-২০১৮ ইং ০২:১৫:৩২ | সংবাদটি ১৫৭ বার পঠিত

 মানুষ তার আশার সমান সুন্দর ও বিশ্বাসের সমান বড় হতে পারে। প্রত্যেকের হৃদয়ে একজন মানুষ বসবাস করে। সে কথা বলে, আত্মনিমগ্ন হয়ে কান পাতলে তার কথা শোনা যায়। সে যা বলে ঠিক সে অনুযায়ী কাজ করলেই জীবনে সফল হওয়া যায়, বড় কিছু করা যায়। কারণ সেখানে আমি বা আপনি সম্পূর্ণ একা। আপনার বা আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই। একেবারে রাজার মত একা। রাজা নিঃসঙ্গ, কারণ একই সিংহাসনে একসাথে দুইজন বসতে পারেন না। দুই হাজার মাইল হিমালয় পর্বতমালায় হয়তো কোটি কোটি লোকের জায়গা হতে পারে। কিন্তু শৃঙ্গের সর্বোচ্চ শিখরে দুইজন লোক এক সাথে আরোহণ করতে পারে না। একজনকে আগে উঠতে হয়। এজন্য তেনজিং এবং হিলারি এক সাথে শিখরে আরোহণ করতে পারেননি। তেনজিং আগে উঠার কারণে সর্বপ্রথম এভারেষ্ট শৃঙ্গ আরোহণকারী হিসেবে একনাম্বারে তেনজিং এর নাম চলে এসেছে।
মানুষের জীবন একটা বিশাল ব্যাপার। কোন রকম যোগ্যতা ছাড়া, কষ্ট, পরীক্ষা ছাড়াই একটা আনন্দে ভরা, সৌন্দর্যে ভরা আলোয় ভরা জীবন পেয়ে গেলাম আমরা। আমরা মনে করি চাওয়া মানেই স্থূল, ভোগী হিসেবে নিজেকে মনে করি। অথচ এটা ভাবি না যে না পেলে আমি দিবো কি করে, পৃথিবীকে দিবো কি করে, সবকিছুকে সমৃদ্ধ করে তুলব কি করে। একজন ভিক্ষুক কি আরেকজন ভিক্ষুককে কিছু দিতে পারে? যার আছে সে-ই দিতে পারে। সুতরাং থাকার সাধনাই মানুষের সাধনা হওয়া উচিত। দেওয়ার মধ্য দিয়ে পেতে হবে, পাওয়ার মধ্য দিয়ে দিতে হবে। এ দু’টোই যদি না থাকে তাহলে জীবন পরিপূর্ণ হয় না।
কাজের নিজস্ব আনন্দ রয়েছে। কাজের মধ্যে ডুবে যেতে হলে স্বপ্নের প্রয়োজন। আমরা অনেকেই মনে করি স্বপ্ন মানেই একটি নিচক কল্পনামাত্র। তা নয়,স্বপ্ন মানেই বাস্তব,স্বপ্ন মানেই গন্তব্য।আমি কোথায় যেতে চাই তার নাম স্বপ্ন। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় হতে পারে । বাস্তব স্বপ্ন ও চেষ্টা কখনোই ব্যর্থ হয় না। যদি স্বপ্নকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারা যায় তাহলে তা অর্জনও করা যায়। বিশাল এই পৃথিবীতে দূর মহাকাশের নক্ষত্র থেকে আলো এসে পড়ে। আমরা সবাই এই পৃথিবীর প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছি মাত্র কিছু সময়ের জন্য যে সময়টা খুব বেশীও নয় আবার খুব কমও নয়। এই সময়কে নিজের ইচ্ছে মতো সাজিয়ে নিতে দরকার সুপরিকল্পীত স্বপ্নের। যা আপনাকে সফল হতে সাহায্য করবে। আমরা সবাই সাফল্য চাই । সকলে জীবনে সেরা জিনিস চাই। কেউই সাদামাটা জীবন চাই না, হামাগুড়ি দিয়ে চলতে চাই না। কেউই দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ হতে চায় না, জোড় করে তাকে ঐ শ্রেণীতে পাঠিয়ে দেওয়া হলে সে মোটেই খুশি হয় না। বাইবেলের উক্তিতে সফল হওয়ার কয়েকটি ব্যবহারিক দিক নিহিত রয়েছে, তাতে বলা হয়েছে যে বিশ্বাস পাহাড়কেও টলাতে পারে। বিশ্বাস এক অদ্ভুত, বিপুল শক্তি, এটা কোন ম্যাজিক বা অলৌকিক বিষয় নয়। বিশ্বাস এভাবে কাজ করে” আমি দৃঢ় নিশ্চিত-আমি পারবো” এই বিশ্বাস মনোবল বাড়ায়, কাজে দক্ষতা ও শক্তি পাওয়া যায়। পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কি হবে তা মাথায় আসবে। বাস্তব স্বপ্ন ও চেষ্টা কখনোই ব্যর্থ হয় না। রাইট ভাতৃদ্বয় স্বপ্ন দেখতেন এমন এক যন্ত্র বানাবেন যাতে করে আকাশে ওড়া সম্ভব। তারা তৈরী করলেন প্লেন। সভ্যতার চেহারাই পরিবর্তন হয়ে গেল তাদের এই আবিষ্কারের ফলে। মার্কনি স্বপ্ন দেখতেন, গ্রষ্টার শক্তিকে জয় করে কাজে লাগাবেন। তিনি যে ভুল স্বপ্ন দেখেননি তার প্রমাণ বেতার ও টেলিভিশন আবিস্কার। উল্লেখ্য যে মার্কনি যখন দাবি করলেন তিনি তারের সাহায্য ছাড়াই বাতাসের মধ্য দিয়ে সংবাদ প্রেরণের পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন, তখন তার বন্ধুরা তাকে মনস্তাত্ত্বিক হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন মাত্র তিন মাস স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। অতিমাত্রায় অপদার্থের অপবাদ নিয়ে স্কুল থেকে বহিস্কৃত হতে হয়েছিল। হেলেন কেলার মাত ১৯ মাস বয়সে শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি আর দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। বিশ্বাস আর স্বপ্নের সংমিশ্রণে হয়ে ওঠেন মহিয়সী এবং তার জীবন বিরাট এক সত্যের প্রমাণ। বাস্তবে পরাজয় স্বীকার না করলে কেউ পরাজিত হয় না। সংবাদ পাঠক পদের জন্য এক আবেদন প্রার্থীকে প্রত্যাাখ্যান করা হয়। কারণ তার কণ্ঠস্বর যথার্থ ছিল না। তিনিই আজকের অমিতাভ বচ্চন! একজন স্কুল শিক্ষক অংকে মনযোগী না হওয়ায় এবং ছোট্ট অংক করতে না পারায় এক ছাত্রকে বলেছিলেন : তুমি জীবনে কিছুই হতে পারবে না। সেই বালক বড় হয়ে হয়েছিলেন মস্তবড় বিজ্ঞানী। তার নাম আলবার্ট আইনস্টাইন।
উপরের উদাহরণগুলোর সারমর্ম হচ্ছে : যিনি কখনো পরাজিত হন, লক্ষ্যহীন হন না, তিনিই প্রকৃত বিজয়ী। মানুষের মস্তিষ্ক এক অসাধারণ বায়ো-কম্পিউটার। এই কম্পিউটারে যে মানুষ যে রকম প্রোগ্রাম করবেন, তিনি সেরকম ফল পাবেন। যিনি হতাশ হয়ে নিজেকে বলবেন, তার দ্বারা কিছুই হবে না, তিনি জীবনে ব্যর্থ হবেন। আর যিনি হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখবেন, তিনি ঠিকই তা করে ফেলবেন। বিশ্বাস বা প্রোগ্রামিং হয়ে গেলে বায়ো কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে বিজয়ের মালা পরিয়ে দিবে আপনাকে। সাফল্যের জন্য যা কিছু করতে হয়, মন শরীরকে দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে করিয়ে নেবে। বাস্তব কখন কখন কল্পনার চেয়েও অবিশ্বাস্য হয়। কেউ যদি বলে আমি পঁচিশ বছর বয়সে অর্ধ পৃথিবীর সম্রার্ট হবো-কথাটা গাঁজাখুরি বলে উরিয়ে দেবেন অনেকে, কিন্তু আলেকজান্ডার তা হয়েছিলেন।
মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড় হতে পারে। মানুষ যা আশা করে তা যদি সে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারে। তাহলে তা সত্যিই পেতে পারে-এটাই হচ্ছে জীবনের ধর্ম। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। মানুষ যে তার স্বপ্নের সমান বড় হয় তা আমাদের চারপাশের যে সফল মানুষ আছেন তাদের কাছে জানতে চাইলেই আপনি জানতে পারবেন।
জর্জ ফোরম্যান ১৯৯৪ সালে ২০ বছর পর মুষ্টিযুদ্ধের খেতাবী লড়াইয়ে জয়ী হয়ে প্রমাণ করেছিলেন স্বপ্নের নিকট আত্মসমর্পণের কোন বয়স সীমা নেই, যদি সমর্পণ করা যায় তা হলে জয় সুনিশ্চিত। ১৯৭৪ সালে মোহাম্মদ আলীর হাতে নক আউট হওয়ার ২০ বছর পর ১৯৯৪ সালে ৪৫ বছর বয়সে ২৬ বছরের মাইকেল মুরারকে পরাজিত করে বক্সিং এর খেতাবী লড়াই জেতার মত অসম্ভবকে তিনি সম্ভব করেছিলেন, তার স্বপ্নের জোড়েই। জেতার পর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন কিভাবে সম্ভব করলেন এই অসম্ভব কাজটি? সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিনে “স্বপ্ন দেখে, ২০ বছর ধরে বিজয়ের এই স্বপ্নই-তো আমি সব সময় দেখেছি। বয়স বাড়লেই মানুষ তার স্বপ্ন বিসর্জন দেয় না।” আপনি মনে প্রাণে যা চান তা পাবেনই।
আপনি যতই বড় হবেন নিজেকে আলাদা করে আবিষ্কার করবেন। আপনি যা চান, যা বিশ্বাস করেন, যে ভাবে ভাবতে ভালবাসেন, হয়তো কিছুই মিলবে না। একেবারে কাছের মানুষদের সাথে, কিন্তু নিজের স্বপ্নের সাথে আপোস করবেন না। নিজেকেও ভালবাসতে হয়। আগে নিজেকে ভালবাসুন, তারপর অন্যকে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। আপনার জীবনেও স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা-বিপত্তি আসতে পারে। বৃষ্টি হলে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে যেমন ছাতা বা বৃষ্টির পোশাক ব্যবহার করেন, নিজের স্বপ্নকেও সেভাবেই রক্ষা করতে হবে আপনাকে। আপনার মাঝেই আছে আলোর দ্যুতি। আপনিও হতে পারবেন আপনার স্বপ্নের সমান বড়।
কারণ আপনি জীবনের প্রথম সংগ্রামে জয়ী হয়েই পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না তাহলে চিন্তা করুন এমন একটি প্রতিযোগিতার কথা যেখানে ৫০ কোটি প্রতিযোগি আর মাত্র একজনেরই বেঁচে থাকার জায়গা আছে যে আগে পৌছাতে পারবে সেই বেঁচে থাকবে আর বাকী সবাই মারা যাবে। জন্মের বিস্ময়কর নিয়মে পিতার দেহ থেকে যে ৫০ কোটি শুক্রাণু প্রতিযোগিতায় নামে এর ১টি মাত্র প্রতিযোগি মাতৃগর্ভে প্রবেশ করে দীর্ঘ দশ মাস দশদিন মায়ের শরীরে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়; তারপর পূর্ণাঙ্গ মানব শিশু রূপে পৃথিবীতে আসে। আপনি সেই প্রতিযোগি যে ৫০ কোটি প্রতিযোগির সবাইকে হারিয়ে দিয়ে বিজয়ী হয়েছেন, তার গৌরব কত বড়! কত বড় সৌভাগ্য আর যোগ্যতার বিজয় এটা!
আপনি নিজেই এরকম একজন বিজয়ী বীর! আমরা যারা পৃথিবীর আলো দেখেছি, সবাই এমনই এক-একজন বিজয়ী বীর। অবিশ্বাস্য কঠিন প্রতিযোগিতায় অসাধারণ যোগত্যার বলে বিজয়ী আমরা প্রত্যেকে। তাই বলা যায় জীবনের প্রতিটি সংগ্রামে জয়ী হবেন, যদি প্রতিটি স্বপ্নকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারেন। স্মরণীয় বরণীয়রা বিশ্বাস নামক প্রোগ্রামিং দিয়েই মস্তিষ্করূপী মহা জৈব কম্পিউটারকে ব্যবহার করেছেন। স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস একবার গেঁতে গেলে জৈব কম্পিউটার স্বংক্রিয়ভাবে সাফল্যের পথে আপনার সমগ্র অস্তিত্বকে কাজে নিয়োজিত করবে। সহজ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অনিবার্য জয়ের লক্ষ্যে পরিচালিত হবে আপনার সকল কর্মকান্ড, যার ফলে বিজয় আপনার পদচুম্বন করবে। আর ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে আপনার নাম কালজয়ী এক সফল মানুষ হিসেবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT