মহিলা সমাজ

নতুন বছরে প্রত্যাশা

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০১-২০১৮ ইং ০২:১৫:৫৫ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত


চলে গেল আমাদের জীবন থেকে আরও একটি বছর -২০১৭সাল। জাতীয় ও ব্যাক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে গত বছরটির আশা-নিরাশা ও প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব নিকাশ। দেশের অর্থনীতির জন্য গেল বছরটা ছিল উত্তম ও সাফল্যের, কেননা যা চলে যায় তা ভালই ছিল বলে মানুষ মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং আগামী বছরটি কেমন যাবে তার চিন্তা ফিকির করতে থাকে। দেশের উৎপাদন, ব্যবসা-বানিজ্য, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তিসহ কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে যথেষ্ট গতির সৃষ্টি হলেও মাঝপথে বন্যায় বোরো ধানের ক্ষয়-ক্ষতি ও রুহিঙ্গা শরনার্থী সমস্যার কারণে অর্থনীতিতে কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হলেও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশে দরিদ্র মানুষের হার ও মৃত্যুর হার কমে গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জাতির জন্য আনন্দ ও গর্র্ভের বিষয় এবং দেশকে নিঃসন্দেহে মাথা উচু করে দাড়াঁনোর সক্ষমতাকে আরও বেশি শক্তি যোগাচ্ছে।
গত ২০০৮ সাল থেকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুগের চাহিদা পূরণের নিমিত্বে যে সকল দিক নির্দেশনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, সে সকল স্বপ্ন এখন ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে যাচ্ছেন, যার ইতিবাচক ফলাফল এখন অ¯ী^কার করার উপায় নেই। বিশেষ করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ ,রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসহ যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন প্রনিধানযোগ্য, ফলে বাংলাদেশ এখন দেশের কলঙ্ক তিলক মুছে ফেলে মধ্যম আয়ের প্রাথমিক স্তরে বা তার কাছাকাছি স্তরে প্রবেশ করার বাস্তবতা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে। বিগত দিনগুলোতে দেশের উন্নয়ন কৌশল নিয়ে বৃটেন, আমেরিকাসহ দেশ বিদেশের অর্থনীতিবিদগণ মৌলিক আলোচনা ও গবেষণা করে মন্তব্য করছেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুণগত মানসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া দেশের বাস্তব উন্নয়ন সম্ভব নয়। এমন একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ কত জটিল ও কঠিন তা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিল্প উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী সাধারণ জনগণই উপলব্ধি করতে সক্ষম। তাইতো আজ বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্থনীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গণে আস্থাশীল, সম্মানজনক ও দৃঢ়তর হয়ে গড়ে উঠছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে আজ বাংলাদেশের যে প্রসংশনীয় অবস্থান ও ভূমিকা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে হ্যাঁ দেশের অর্থনীতিকে যদি আরও শক্তিশালী করতঃ বেকারমুক্ত, দরিদ্রমুক্ত ও ক্ষুধামুক্ত দেশ হিসাবে উন্নত দেশের শক্তিশালী অর্থনীতির ¯্রােতধারায় অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে সক্ষম হন, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে তা হবে সর্বশ্রেষ্ঠ অবিসরনীয় ঘটনা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইতিহাসে জাতির পিতার ন্যায় তিনিও হয়ে থাকবেন চির-স্বরণীয়।
আমাদের অবশ্য স্মরণে আছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে কটুক্তি ও বিদ্রুপ মেশানো বাক্যে ‘তলাবিহীন ঝুরি’ বলেছিলেন বলে আমরা ক্ষোভমেশানো অভিমানে বাক্যটি হজম করে নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে আমরা অবশ্য কর্মের মাধ্যমে তার সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছি, যা আজ বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে। যার জলজান্ত প্রমাণ হচ্ছে আমরা নিজস্ব অর্থায়নে বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরি করছি। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার মাধ্যমে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছি পোশাকশিল্প, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ফলে বাংলাদেশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন ৩৩তম অবস্থানে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছি। যা আজ বিশ্ববাসী প্রশংসার সাথে প্রত্যক্ষ করছে।
একটা দেশ ও জাতিগোষ্ঠিকে ধ্বংস করতে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে  ধংস করা সম্ভব হলেই যথেষ্ট। তার বড় প্রমাণ মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রুহিঙ্গা জনগেষ্ঠী। তাদেরকে বৃটিশ আমল থেকেই শিক্ষা-দিক্ষায় অশিক্ষিত করে রাখার কারণে তারা আজ মায়ানমার থেকে ঘৃণিত জাতি হিসাবে বিতাড়িত হচ্ছে এবং বাংলাদেশের বুঝা হয়ে শরনার্থী হিসাবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পশ্চাৎমুখী,নকলমুখী ও পরিকল্পনাহীন হওয়ার কারণে দেশের রাজনীতিতেও ক্রমান্বয়ে নীতিহীন অমানবিক ভাবাধারা জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে ফলে সমাজের ভিতওে বাইরে আদর্শ ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের অনুকুল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠছেনা। শিক্ষাক্ষেত্রে বই-পুস্তক সজ্জিত আধুনিক দালান-কোঠা গড়ে উঠলেও আধুনিক ধ্যান-ধারণা সম্পন্ন, বিজ্ঞানমনষ্ক ও আলোকিত মানুষ গড়ার জ্ঞান ও দর্শন না থাকলে বিজ্ঞানমনষ্ক, সুস্থ ও মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন আদর্শ মানুষ গড়া সম্ভব নয়। ফলে আদর্শ রাষ্ট্রগঠন হয় অসম্ভব।
শক্তিশালী অর্থনীতি থাকলেই একটি দেশের আন্তর্জাতিক সম্মান ও অবস্থান যে শক্তিশালী হবে তা কিন্তু নয়। বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশেরই অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভাল হলেও রাজনৈতিক ভূমিকার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক অনেক ভাল ও সম্মানজনক। সেক্ষেত্রে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা যত শক্তিশালী হবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতক অঙ্গণে আমাদের অবস্থান হবে ততবেশি দৃঢ় ও সম্মানজনক।বর্তমানে আমাদের লক্ষ্য শুধু মধ্যম আয়ের দেশে উন্নয়ন নয়, আমাদেরকে দাঁড়াতে হবে উন্নত দেশগুলোর সমান কাতারে। তার জন্য আমাদের অর্জন করতে হবে সঠিক জ্ঞান ও ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা তো দুরের কথা, প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর কেন পালন করা হয় এই কথাটিও জানেনা অনেক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের টিভি প্রতিবেদনে এমনি একটি প্রতিবেদন গত বিজয় দিবসে উঠে এসেছে।
 বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে এমন সুখবরটি বাংলার ক’জন সাধারণ মানুষ জানে বা বুঝতে চেষ্টা করে? দেশের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কোনো দলে কি এমন আদর্শবান নেতা-নেত্রীর অস্থিত্ব বিদ্যমান আছে? দেশের বৃহত্তর সমাজ তো বটেই দলীয় নেতা নেতৃদের মধ্য কি তা পেিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের উন্নয়নে নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও কিন্তু তা অনুপস্থিত। আর আমাদের  শিক্ষা ব্যবস্থা সে ব্যাপারে একেবারেই অপঠিত ও পশ্চাদপদ। ফলে সঠিক রাজনীতি ও প্রচার মাধ্যমগুলোও ঠিকমত অগ্রসর হতে পারছেনা। ফলে সুযোগ নিচ্ছে পূরাতন ধ্যাণ-ধারণা ও আদর্শের ধারক, বাহক, দেশী-বিদেশী কিছু সুযোগ সন্ধানী অপশক্তি। শুধু সরকার বা শেখ হাসিনার একার পক্ষে এমন অপশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে আমাদের অগ্রসরমান অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী বা সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড় করানো ছাড়া অন্য চিন্তা করা অবান্তর।
স্বাধীনতা ও বিজয়ের প্রায় অর্ধশত বছর হওয়ার পথে থাকলেও দেশের রাজনীতিতে পরমত সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সকল দলে নেতাদের মুখে বা বক্তৃতায় গণতন্ত্রের কথা বললেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের তীব্র অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ সাধারণ জনগণ সহণশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শান্তির প্রত্যাশা করছে। দলগুলোর মধ্যে যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহণশীলতা ও আস্থাবোধ না থাকে তবে রাজনৈতিক সুষ্ঠ পরিবেশ তো বটেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে দেশের স্বাভাবিক পরিবেশ ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা। কেননা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিকাশ ও সুষ্ঠু পরিবেশ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এক সাথে আস্থার সাথে কাজ করতে হবে। বিষয়টি রাজনৈতিক তাই ক্ষমতাসীন দলসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদেরকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে কাজ করা বাঞ্চনীয়। কেননা মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি শৃঙ্খলা থাকা অপরিহার্য। দেশের সমৃদ্ধি ও সুষম উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যাতে ২০১৮ইং সালটিতে কোন অনিশ্চয়তা না থাকে বা বিষয়টি নিয়ে কোন প্রকার অনাস্থার সৃষ্টি না হয় এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে বেশি। নতুন বছরটি ঝামেলাহীন গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকার প্রত্যাশা করছে দেশবাসী।
লেখক : সাবেক হিসাব কর্মকর্তা সিলেট পাল্প এন্ড পেপার মিলস্্ লি:।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT