সম্পাদকীয়

ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হয় নি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০১-২০১৮ ইং ০১:১৭:৫৩ | সংবাদটি ১৪৯ বার পঠিত

বন্ধ হয়নি ভিক্ষাবৃত্তি। এর সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ মানুষ। এটাকে ‘সামাজিক অপরাধ’ হিসেবেও অনেকে চিহ্নিত করেছেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ভিক্ষাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূলের তাগিদ দিয়েছেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি ভিক্ষার হাতকে কর্মের হাতিয়ারে পরিণত করার কথা বলেছেন। অন্যান্য ধর্মেও ভিক্ষাবৃত্তিকে সমর্থন করা হয়নি। এজন্য ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এখনই। এটা ঠিক যে, দারিদ্র্যই ভিক্ষাবৃত্তির মূল কারণ। তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই এই প্রবণতা বেশি। আবার অনেকক্ষেত্রে দারিদ্র্য নয়, ¯্রফে ব্যবসা হিসেবে ভিক্ষাকে বেছে নিয়েছে অনেকে। তবে আমাদের সংবিধান অবশ্য এই ভিক্ষাবৃত্তিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেনি। সংবিধান অনুযায়ী ভিক্ষুকরা ভিক্ষা করাকে তাদের ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবেও দাবি করতে পারে। ভিক্ষার জন্য যাতে কাউকে বিরক্ত করা না হয়, সেজন্য কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে সংবিধানে।
দেশের শহরাঞ্চলে ভিক্ষুকদের ঘিরে গড়ে ওঠেছে শক্ত নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে গডফাদার। এরা পেশাদার ভিক্ষুক। শহরাঞ্চল ছাড়াও রয়েছে গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য ভিক্ষুক। জরিপের তথ্য হচ্ছে, দেশের শহরাঞ্চলে কমপক্ষে ছয় লাখ ভিক্ষুক রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিক্ষুক রাজধানীতে কমপক্ষে ২০ হাজার। সিলেট নগরীতে ৪/৫ হাজার ভিক্ষুক রয়েছে। প্রতি বছর এই ভিক্ষুকরা আয় করছে কোটি কোটি টাকা। বিভিন্ন সময় অনেক ‘অভিজাত’ ভিক্ষুকের খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়; যাদের গ্রামে রয়েছে আলিশান বাড়ি, জমিজমা, সম্পত্তি। এরা কেউ কেউ একাধিক মাইক্রোবাস ও বেবিটেক্সীর মালিক। কারও মাসিক আয় ৫০/৬০ হাজার টাকা। নদী ভাঙন- বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূলে সর্বপ্রথম দরকার সচেতনতা। একজন সক্ষম ব্যক্তি যে দৈহিক শ্রম দিয়ে রোজগার করতে পারে, তাকে ভিক্ষা দেয়া মানে ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত করা। এভাবে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছে জনগোষ্ঠীর একটা অংশ। ভিক্ষাবৃত্তির ব্যাপারে সরকারের আইনও রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে ভিক্ষার জন্য বিরক্তিকর কাকুতি-মিনতি করা বা শরীরের কোন বিকৃত অঙ্গ বা নোংরা ক্ষত প্রদর্শনের জন্য একজন ভিক্ষুককে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং তার পুনরাবৃত্তি ঘটলে অতিরিক্ত জরিমানা করা যাবে। অনেক সময় নিষ্পাপ শিশুদের হাত পা কেটে অঙ্গহানী করে এই কাজে নামানো হয়। এ ব্যাপারে আইনে বলা হয়- যদি কোনো ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তি বা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রির উদ্দেশ্যে কোনো শিশুর হাত, পা, চক্ষু বা অন্য কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিনষ্ট করে তবে এই ব্যক্তি মৃত্যুদ-ে দ-নীয় হবে। এছাড়া, কোন শিশুকে ভিক্ষার কাজে নিয়োগ করা হলে, যে এই কাজটি করবে তার এক বছর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদ-ের বিধান রয়েছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমাদের দেশে আইন হয়, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। তাছাড়া, বছর কয়েক আগে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের লক্ষে ভিক্ষুক জরিপসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু তার সফল বাস্তবায়ন নেই। ভিক্ষাবৃত্তি রোধে সরকারসহ জনগণকেও সচেতন হতে হবে। এর পাশাপাশি ভিক্ষাবৃত্তির প্রধান কারণ দারিদ্য দূরীকরণেও যথাযথ পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। দারিদ্র্য নিরসনে দীর্ঘ দিন ধরে চলছে নানা উদ্যোগ-আয়োজন। এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে প্রতি বছর। কিন্তু সফলতা আসছে না কাক্সিক্ষতভাবে। সরকারি পরিসংখ্যানে অবশ্য দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়ার তথ্যও দেয়া হচ্ছে। দেশের বিদ্যমান সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এ সমস্যা মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরেও সরকার দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ-এ পরিণত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে তার সফলতার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT