ইতিহাস ও ঐতিহ্য

চুঙ্গা পিঠা : বাঁশ দিয়ে প্রাতঃরাশ

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০১-২০১৮ ইং ০১:২১:৩৪ | সংবাদটি ২০২ বার পঠিত

আনন্দ ছাড়া জীবন নয়। বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। অল্পে তুষ্ট তারা সব কিছুতেই আনন্দ খুঁজতে চায়। কথায় আছে, বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই পালা পার্বণের মধ্যে নবান্নের ধান তোলাকে কেন্দ্র করে রয়েছে পিঠা পুলির আয়োজন। ঐতিহ্যের ধারক এই সংস্কৃতির মধ্যে অঞ্চলভেদে আছে ভিন্ন স্বাদের বিভিন্ন রকমের পিঠা।
সিলেট অঞ্চলে রয়েছে হরেক রকম ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সৃষ্টি পিঠা। যেমন এখানে পাহাড় টিলার সমারোহ বেশি পাহাড়ি বা উঁচু ভূমিতে সবচেয়ে ভালো উৎপাদিত হয় বাঁশ বা বাঁশ জাতীয় উদ্ভিদ। তাই বাঁশের নানাবিদ ব্যবহারের পাশাপাশি খাবারের তালিকায়। এই অঞ্চলে বাঁশের গুরুত্ব আছে যেমন বাঁশে খরিল (বাঁশের অঙ্কুর) আবার বাঁশের ভিতর রান্না হয় মাংসের বাশাই, কিংবা মাছ, শুটকির বাঁশ ভর্তা। তবে বাঁশের ভিতরে রান্না করা চুঙ্গাপিঠা সবচেয়ে বেশি মুখরোচক খাবার।
সিলেট অঞ্চলে, ধানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধান হচ্ছে, আউশ, আমন, বোরো, ইরি, বিরন, কালোজিরা, সোনালি জিরা ইত্যাদি। আতপ চাল, এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য। শীতকালে নতুন ধান ঘরে তোলার পর পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়। বিরন চালের ভাত অনেকটা আঠালো। (স্টিকি রাইচ)। এই সুগন্ধি বিরন চাল রান্না করে মাছ ভাজা, মাংসের কাবাব, মাংস ভাজা অথবা ক্ষিরশাহ রসমালাই খেজুরে গুড় ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া হয়।
এবার আসি চুঙ্গাপিঠা বানানোর প্রস্তুতিতে চুঙ্গাপিঠা বানাতে ডুলো বাঁশ নামের এক বিশেষ প্রজাতির বাঁশ ব্যবহৃত হয়। এই বাঁশের মাঝখানের প্রায় দেড় দুই ফুট ব্যবধানে জোড়া আছে, এই জয়েন্টে কেটে বাঁশকে টুকরো করে কাটা হয়। এরপর বিরন চাল পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়; আধা ঘণ্টার মতো। প্রতিটা বাঁশের চুঙ্গায় পরিমাণমতো পানি এবং চাল দিয়ে, বাঁশের চুঙ্গার মুখ কলাপাতা, খড়ের সাহায্যে ভালোভাবে বন্ধ করে রান্নার জন্য প্রস্তুত করতে হয়। এরপর মাটিতে এক ফুট গর্ত করে চুলা প্রস্তুত করা। গর্তের গভীরে কয়লা বা পাতার খড়কুটো দিয়ে আগুণ দিয়ে উপরে বাঁশের চুঙ্গাকে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের পরে প্রস্তুত হয়ে যায় চুঙ্গাপিঠা। নতুন চালের সাথে, ডলো বাঁশের ঘ্রাণ মিশে অদ্ভুত মজার এক ঘ্রাণ হয় এই পিঠার। প্রস্তুত এ পিঠা মাংস ভাজা, মাছ ভাজা দুধের সরের তৈরি ক্ষির, খেজুরের গুড়, কিংবা শুধু চা দিয়ে খেতে দারুন মজা লাগে। আধুনিক যুগে ধার করা সংস্কৃতির অংশ যে, বারবিকিউ, পাটি, তার চেয়ে মজাদার এই চুঙ্গাপিঠা যে কোনো ব্যক্তিকে আকৃষ্ট করে কুয়াশা ভিজা ভোরবেলা, যদি হয় বাঁশ দিয়ে প্রাতঃরাশ তবে আমার আমাদের সংস্কৃতি সার্থক। অতঃপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায় বলতে হয়। আমরা শক্তির দ্বারা প্রয়োজন সাধন করতে পারি, মুক্তির দ্বারা জ্ঞান লাভ করতে পারি; কিন্তু আনন্দের সম্বন্ধে শক্তি এবং মুক্তি কেবল দ্বার পর্যন্ত এসে ঠেকে যায়। তাদের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই আনন্দের সঙ্গে একেবারে অন্তপুরের সম্বন্ধ হচ্ছে ইচ্ছার।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • গ্রামের নাম পুরন্দরপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • জামালপুর একটি সমৃদ্ধ জনপদ
  • জীবন নিয়ে খেলছেন এডলিন মালাকারা
  • সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মৃৎশিল্পের চিরকালীন মহিমা
  • পাক মিলিটারির ৭ ঘণ্টা ইন্টারগেশন
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ঐতিহ্যবাহী গাজীর মোকাম
  • ইসলাম ও ইতিহাসে মুদ্রা ব্যবস্থা
  • Developed by: Sparkle IT