ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বিশ্ব দরবারে সিলেটি শীতলপাটি

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০১-২০১৮ ইং ০১:২২:০১ | সংবাদটি ২০ বার পঠিত

গরমে পরম শীতল পরশ পেতে বাঙালি শরীর যে পাটিতে গড়াগড়ি যায় তা আমাদের শত শত বছরের ঐতিহ্য সিলেটের শীতলপাটি। শীতলপাটি নামের বস্তুটি আমাদের বর্তমান তরুণ-তরুণী ও ছেলেমেয়ে প্রায় ভুলতেই বসেছে। আবার এই প্রজন্মই হঠাৎ পুলকিত হয়ে উঠলো যখন বিজ্ঞানের আবিস্কৃত প্রযুক্তির কল্যাণে জানতে পারলো, এই বাংলার ঐতিহ্য সৃজনশীল বাঙালি নারী ও পুরুষের দক্ষ হাতের বুননে বানানো পাটি আজ বিশ্বের ঐতিহ্যের তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমাদের বাংলাদেশকে বিশ্বে এক অহংকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে। এ অহংকার যুগ যুগের সৃষ্টিশীল বাঙালির সৌন্দর্যের অহংকার। এ অহংকারে আমরা আন্দোলিত হয়েছি। আজ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই আমাদের শীতলপাটি। এমন ঘোষণা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শিকড় যে অনেক গভীরে প্রোথিত সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে চলুন শীতলপাটি প্রসঙ্গে বাংলার মাটির মায়ার দান নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশক কিছু কথা বলি।
শীতলপাটি বানানোর প্রধান উপকরণ এক ধরনের উদ্ভিদ। গুল্মজাতীয় এ উদ্ভিদ অন্যান্য উদ্ভিদের মতোই মাটি ভেদ করে বের হয় আর আমাদের আলো বাতাসে বেড়ে উঠে। বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের শহরের স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যারা গ্রামীণ জীবনকে একেবারেই উপলব্ধি করেনি তারা এ জাতীয় গাছ কোথাও দেখে থাকলেও গাছের নাম জানতে পেরেছে কি না জানিনা। গাছের নাম মুর্তাগাছ বা মুত্রাগাছ। এ গাছ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মালেও সিলেট অঞ্চল এই মুর্তাগাছের জন্যে প্রসিদ্ধ। সুরমা নদী বেষ্টিত সুরমা মালায় গাঁথা সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এখনও অল্প কিছু মুর্তাগাছ দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের ছোটোবেলায় বিংশ শতাব্দীর আশির দশকেও আমার গ্রাম সুনামগঞ্জ জেলার হরিনাপাটি ঘুরে দেখেছি এমন কোনো বাড়ি ছিলোনা যাদের মুর্তাগাছ নাই। তখন আমরা ছোটোরা মুর্তাপাতা দিয়ে চোঙ্গের মতো করে বাঁশি বানিয়ে ফু দিয়ে সুর তুলতে চেষ্টা করতাম। কেউ কেউ খুব ভালো সুর তুলতো যা শুনতে মধুর লাগতো। ঘন মুর্তার ঝোপের ভিতর পাতায় ছোট্ট টুনটুনির বাসাও আমি দেখেছি। সে যাই হোক। এ মুর্তাগাছকে একেক এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। খালপাড়, পুকুরপাড় এবং জলাভূমিতে মূর্তাগাছ হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে এ গাছকে পাটি পাতা গাছ বলা হয়। সিলেটের বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথসহ সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জে মুর্তাগাছ প্রচুর পরিমাণে হয়। আমাদের গ্রামাঞ্চলে আমরা এ ধরনের পাটিকে আদি, ছাটি বা ফাটি বলে ডাকি। মাদুর বললে যেমন সহজে বুঝি মেঝেতে বিছানো হয়, শুদ্ধ সুন্দর নামের শীতল স্পর্শানুভবের শীতলপাটি এমনি এক ধরনের পাটি যা মেঝেতে বিছিয়ে খাওয়া হয়, শোওয়া হয় আবার নামাজ পড়ার জায়নামাজ হিসেবেও এপাটি সমাদৃত। এখন প্রশ্ন হলো মুর্তাগাছ দিয়ে কিভাবে এ পাটি তৈরি হয়।
পাটি তৈরির প্রস্তুতি হিসাবে প্রথমে পরিপক্ক মুর্তাগাছ ঝোপ থেকে বেছে বেছে কেটে আনা হয়। পরে প্রতিটি মুর্তাকে চার-পাঁচ ফালি করে দক্ষ হাতে সযতেœ চেঁছে বেত করা হয়। তারপর ধারাবাহিক কাজ হলো, রোদে শুকানো, পরে পানিতে ভিজিয়ে রাখা, আবার রোদ লাগানো এবং আবার পরিষ্কার পানিতে ঘণ্টাখানেক ভিজিয়ে বেতগুলোকে উঠিয়ে ঝরঝরে করে ফেলা। সৌখিন কারিগররা বেতকে নানান রঙের রঙ মিশিয়ে পাটি তৈরির জন্যে প্রস্তুত করেন। একজন দক্ষ কারিগর তার নিপুন হাতে একটি একটি বেত দিয়ে কিভাবে দুই থেকে তিন মাস সময় নিয়ে একটি চমৎকার শীতলপাটি বুনেন তা স্বচক্ষে না দেখলে লিখিত বর্ণনা দিয়ে বুঝানো কোনোভাবেই সম্ভবপর নয়। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় যা ছাটি তাই হলো ৫ ফুট প্রস্থ ও ৭ ফুট দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট শীতলপাটি। এই শীতলপাটি যে শুধু মেঝেতে বিছানো হয় তা নয়। গরমের দিনে আরাম পেতে তা বিছানার উপর বিছিয়ে এক ধরনের সুখ নিদ্রা উপভোগ করতে এর জুড়ি নাই। আবার ছোটো আকারের পাটিও হয় যা আমাদের আঞ্চলিক শব্দে আদি নামে খুব পরিচিত। তাতে মসজিদ, কাবাঘর অথবা লতাপাতার নক্সা এঁকে জায়নামাজ হিসাবে এক সময় বহুল ব্যবহার ছিলো। এখনও সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশেই খুব সামান্য এসবের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। আর সিলেটের শীতলপাটি এখনও সিলেট ও ঢাকা থেকে উড়োজাহাজে চড়ে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছে সিলেটি ঐতিহ্যের মায়ার টানে। তবে এই শীতলপাটি অতীতে রাজা বাদশাহদের কাছেও সমাদর পেয়েছে। এক কথায় শীতলপাটি বাংলাদেশের এক অনিন্দ্য সুন্দর হস্তশিল্প।
শুরুতেই বলেছি বর্তমান প্রজন্ম এই শীতলপাটিকে ভুলতে বসেছে। অনেক অনেক পুরনো দিনের হলেও কোনো কিছুতে সুন্দরেরও সত্যের আর সৃজনশীল মানুষের চিন্তা ও কর্মের সযতন ছাপ থাকলে তা জাতির জন্যে হয় ঐতিহ্য, আর গৌরবের প্রতীক হয়ে ধরা দেয় তা হাজার বছর পরেও। সিলেটের শীতলপাটি এখন শুধু বাংলাদেশের নয় বরং তা এই সময়ে বিশ্ব ঐতিহ্যের এক গৌরবময় অংশীদার। শুরু করেছিলাম ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রাপ্তির খবরে আমরা আনন্দিত আন্দোলিত হয়েছি। যেভাবে সম্ভব হয়ে উঠলো আসুন তা বলতে বলতে আর জানতে জানতে আনন্দকে বুকের গভীরে ঠাঁই দিই। ইউনেস্কোর একটি কমিটি আছে নাম ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ সংক্ষেপে (আইসিএইচ)। এই আন্তর্জাতিক কমিটির ১২তম অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেয়া হয়। এই স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় কয়েক বছর আগে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে শীতলপাটির উপর সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন জায়গায় প্রামাণ্যচিত্র ধারণ এবং পরবর্তীতে ইউনেস্কোর যাচাই বাছাই শেষে ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি আমরা পাই। মূলত এই গৌরবময় বিজয়ের দাবিদার আমাদের আজীবন বাঙালি সুনিপুন বুনন শিল্পী পাটিকর। যাদের সযতন হাতের ছোঁয়ায় তৈরি শীতলপাটি আমাদেরকে বিশ্বে গৌরবান্বিত করেছে, তাদেরকে শ্রদ্ধাপূর্ণ অভিবাদন জানাই।
এখন আমরা প্লাস্টিকের মাদুরে আকৃষ্ট হয়েছি যা অল্পদিনেই সৌন্দর্য হারায় এবং তা মোটেই পরিবেশ বান্ধব নয়। অথচ সিলেটি শীতলপাটি যতেœ রাখলে দশ বারো বছর টিকে এবং পরবর্তীতে তা ফেলে দিলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না বরং মাটিতে মিশে মাটির পুষ্টি বাড়ায়। সৌন্দর্য পিপাসী মানুষ কতোকিছু কিনে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায়। এক্ষেত্রে নিজস্ব ঐতিহ্য ধারণ করে আছে যে শীতলপাটি সেদিকে মনোনিবেশ ঘটালে আমাদের প্রায় বিলুপ্ত এই কুটির শিল্পটি টিকে থাকবে আর আমাদের কুটিরশিল্পী নারী-পুরুষের কর্ম ব্যস্ততায় আবার আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সৃষ্টি হবে। আমরা ছোটো বেলায় মসজিদের বারান্দায় আদি/ছাটিতে বসে কায়দা, ছিপারা ও কুরআন শিক্ষাগ্রহণ করতাম। অনেক গ্রামের মসজিদের মাটির মেঝেতে এধরনের পাটি বিছিয়ে নামাজ পড়তে দেখেছি। এখন আমাদের গরমকালে মসজিদগুলোতে জায়নামাজ হিসাবে এই পাটির ব্যবহার বৃদ্ধি করলে মসজিদের ভিতরে শীতলতা থাকবে এবং মুসল্লিদের ইবাদতকালীন শান্তি হবে মনে করি। বিদেশী অতিথিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান দিতে মুর্তাবেতের তৈরি গালিচা সংবর্ধনা দেয়ার প্রচলন করা যেতে পারে। এতে বিদেশীদের মনোযোগ আকৃষ্ট হবে। এভাবে চিন্তা করে এই শিল্পটির প্রতি দরদি হলে শুধু গ্রামীণ নয় বরং মনকাড়া নক্সার দ্বারা শীতলপাটি বুনন করলে ও বিদেশে রপ্তানি করলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • শিতালং শাহ’র গানের ঐতিহ্য
  • দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • সিলেট অঞ্চলের জলসা : একাল-সেকাল
  • সিলেটের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  • ঐতিহ্যের মনিপুরী তাঁত
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সিলেটি বীর সেনানী
  • রেলওয়ে কি হারানো শ্রী ফিরে পাবে যোগাযোগমাধ্যম
  • সিলেটের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অপরূপা এ নদীর নাম সুরমা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিশ্ব দরবারে সিলেটি শীতলপাটি
  • চুঙ্গা পিঠা : বাঁশ দিয়ে প্রাতঃরাশ
  • কবিতা
  • মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল ওসমানী
  • সিলেটি ভাষা ও নাগরী সাহিত্য ধারা
  • লোক সাহিত্যের সমৃদ্ধ জনপদ সুনামগঞ্জ
  • সিলেটের শীতল পাটি
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযুদ্ধে বরাক উপত্যকার কবিগান
  • Developed by: Sparkle IT