ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০১-২০১৮ ইং ০১:২৩:৩৮ | সংবাদটি ২৫ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
৮। আরেক রাহাজানি ব্যবস্থা সামনে অগ্রসরমান। সে হলো উপজাতি, আদিবাসী ও পাহাড়ীর নামে অগ্রাধিকার ও সংরক্ষণবাদ। বাঙালিদের বঞ্চিত করে সব পাওয়ার পায়তারা। আইন হয়েগেছে। এখন বাস্তবায়ন চলছে। পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদ, টাস্কফোর্স, উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ, পার্বত্য বাঙালিদের জন্য নিষিদ্ধ। এর কোন মিয়াদকাল নেই। এটি কায়েমী ব্যবস্থা। পরিষদ সমূহে নির্বাহী কর্মকর্তাদের পদ ও অন্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিযুক্তিতেও অবাঙালিদের অগ্রাধিকার। অন্য স্থানীয় কর্মসংস্থান, ব্যবসা বাণিজ্য, জমি বন্দোবস্ত, লাইসেন্স, পারমিট ইত্যাদিতেও বাঙালিদের উচ্ছিষ্টের ভাগীদার। দেশ ভিত্তিক উচ্চ শিক্ষা, কারিগরী প্রশিক্ষণ, বৃত্তি ও নিযুক্তির ক্ষেত্রেও উপজাতীয় বৃহৎ কোটা ও অগ্রাধিকার নির্ধারিত। পার্বত্য বাঙালিরা এসব বৈষম্যের শিকার। অথচ দেশের সর্বাধিক অনুন্নত ও পশ্চাদপদ সমাজ হলো এই পার্বত্য বাঙালিরা। বৃহৎ তিন উপজাতি সম্প্রদায়, অবশিষ্ট ক্ষুদ্র উপজাতিদের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধাকেও শোষণ ও ছিনতাই করে ভোগ করছে। সম্প্রদায় ভিত্তিক ভোগ ও ভাগের সুনির্দিষ্ট সময় পরিমাণ ও পরিমাণের উল্লেখ না থাকায়, সুযোগ সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও তারতম্য ঘটছে। এ ক্ষেত্রে সময়সীমা, মাপকাঠি ও হ্রাস বৃদ্ধি ধরণের বিধি ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিলো।
পরিশেষে স্মর্তব্য যে, বিপুল সুযোগ সুবিধা দান সত্ত্বেও তা উপজাতীয় সন্তুষ্টি বিধানে ব্যর্থ হয়েছে।
এসবই বর্ধিত ক্ষমতা ও স্বাধিকার লাভের অগ্রাভিযানে শক্তি বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।
(তাং-শনিবার ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪০৬ বাংলা ৫ জুন ১৯৯৯ খ্রি. দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙ্গামাটি)
৯। কারিগরী ও উচ্চ শিক্ষার সংরক্ষিত আসন বা কোটার সুযোগে প্রতি বছর ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ প্রফেসর, ডাক্তার, উচ্চ প্রযুক্তিবিদ, বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি পর্যায়ে শতাধিক যোগ্য ব্যক্তি দেশি বিদেশি বিশ্ব বিদ্যালয় ও বিশেষায়িত শিক্ষায়তন থেকে উত্তীর্ণ হয়ে, উপজাতি সমাজের যোগ্যতা বৃদ্ধি ও মুখ উজ্জ্বল করছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই, উপজাতি সমাজ বাংলাদেশের শিরোমনি হয়ে দাঁড়াবেন। লেখা পড়ার শীর্ষ যোগ্যতা, তাদের হাতে এনে দিবে, সম্পদ সম্পত্তি, শীর্ষ পদ ও ক্ষমতা। এখনই সারা দেশের অফিস আদালত, ব্যাংক বীমা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে কর্মকর্তা কর্মচারী ও শিক্ষক রূপে উপজাতিরা আনুপাতিক হারের চেয়ে অধিক সংখ্যায় গিজ গিজ করছেন। এখন তারা পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী নন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামও পিছিয়ে পড়া এলাকা নয়। গোটা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর চেয়ে বহুগুণ অধিক অভাগা বাঙালি বাংলাদেশের যে কোন বড় শহরের বস্তিতেই মানবেতর জীবন যাপন করে। এই গরিব দেশের এটা স্বাভাবিক চিত্র। তবু উপজাতীয় ভাগ্যোন্নয়নে বাংলাদেশ সচেষ্ট। এ কারণে এতদাঞ্চলে এখন ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের আদিম জীবন মান ও পশ্চাদপদতা কেটে ওঠেছে। এ জন্য বাংলাদেশ প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা লাভের যোগ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলোঃ উপকৃতরা মোটেও কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট নন। তাদের খাই ও দাবী অত্যধিক। এখনো ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের দায়ভার বাংলাদেশের উপর আরোপিত হয়। উপকার ও  উন্নয়নের বিপরীতে উপজাতিদের কিছুই যেন করার নেই। এতদাঞ্চলের বাংলাদেশ হয়ে থাকা যেন অন্যায় ও অপরাধ অথবা উপজাতিদের বাংলাদেশী হয়ে থাকা যেন এক মস্ত অবদান। এর প্রতিদান হিসাবে তাদের অলস ভোক্তা হয়ে থাকা, নিরেট মেহেরবানী। পদ, সম্পদ, ক্ষমতা, অনুদান লাভ, সে তো তাদের প্রাপ্য।
১০। উপজাতীয় ক্ষমতায়ন ও আনুকূল্যের বিপরীতে জাতি বৈষম্যের শিকার এবং রাষ্ট্রীয় এক কেন্দ্রিকতা বিপন্ন। গণতান্ত্রিক আর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রীয় নীতি এখন আর অক্ষুণœ নেই।
বিশেষ আইন ও ক্ষমতার ধারায়, পর্বতাঞ্চলের আঞ্চলিক পরিষদের জন্ম যা স্থানীয় শাসন জাত, না রাজনৈতিক রূপান্তর, এই প্রশ্নটি ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্র ফেডারেল নয়, এক কেন্দ্রিক। এই চরিত্রকে বজায় রেখে, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণের উপায় হলো, প্রশাসনিক ইউনিটগুলোতে, অভিন্ন আইনের আওতায় স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে তা-ই ব্যক্ত আছে। কিন্তু কর্তৃত্বের ধারা প্রায় পরিষ্কার নয় যে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ অনুরূপ স্থানীয় শাসন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিনা। ফেকড়া হলোঃ পার্বত্য পরিষদ আইন, সারা দেশের উপযোগী অভিন্ন স্থানীয় শাসন বিধি নয়। ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় আইন প্রবর্তিত হয়ে, বিধিগত বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে, যার পরিণামে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা বিরোধী উদাহরণ সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব নয়। এই বিপদকে টেনে আনা যুক্তিসঙ্গত বলা যায় না।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে এ বলা সঙ্গত যে, বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন পার্বত্য জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদ হলো বাংলাদেশের পক্ষে বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক বিষফোড়া বিশেষ।
১১। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী, তথা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জনগণের পক্ষে জনগণ কর্তৃক জন সমর্থনের ভিত্তিতে এর শাসন প্রশাসন আইন ও নীতি নির্ধারণ সম্পন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন প্রশাসন আইন ও নীতি নির্দেশে এই মৌলিকতা পালিত হচ্ছে না। সরকার ৫০% এর বেশি জন সমর্থনের দ্বারা গঠিত নয়। এই ত্রুটির ক্ষতি পূরণ রূপে তার উচিত ঃ নীতি নির্দেশের পক্ষে জনমত ও সমর্থন নিশ্চিত করা। এই আনুষ্ঠানিকতার প্রথম ধাপ হলো, জাতীয় সংসদের সমর্থন গ্রহণ, ও তৎপর গণভোটের ব্যবস্থা করা। প্রত্যেক জাতীয় সংকট ও সমস্যার নিরসনে সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে এরূপ জনসমর্থন গ্রহণ করা হলেই দেশ হবে সত্যিকার গণপ্রজাতন্ত্রী। পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নে সরকার এক নায়ক সুলভ ব্যবস্থা নিয়ে অগ্রসরমান। জাতি এই প্রশ্নে দ্বিধা বিভক্ত ও সন্দিহান। এখানে এক নায়ক সুলভ পদক্ষেপ গ্রহণ যথার্থ নয়। গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি ও আদর্শের গুরুতর ব্যত্যয় এই ক্ষেত্রে স্পষ্ট।
রাষ্ট্রীয় মৌলিক আইন সংবিধানে, বিশেষ কোন অঞ্চল গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের জন্য কোন বিশেষ অধিকার সংরক্ষিত করা অনুমোদিত নয়। অনুচ্ছেদ ১৯, ২৭ ও ২৯ মানুষে মানুষে আর অঞ্চলে অঞ্চলে বৈষম্য অনুমোদন করে না এবং সবার জন্য ন্যায় বিচার ও সমতারই নির্দেশ প্রদান করে। কিন্তু পার্বত্য আইনে, স্থানীয় বাঙালিদের জন্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে চেয়ারম্যান পদ লাভ নিষিদ্ধ। তারা স্থানীয় জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হলেও, ঐ পরিষদ সমূহের ১/৩ সদস্য পদের অধিকারী। কর্মসংস্থান, নিযুক্তি ও আর্থিক সুবিধাদির ক্ষেত্রে, পরিষদ আইনে উপজাতি অবাঙালিদেরই অগ্রাধিকার প্রাপ্য। পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদ, দুই পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড ও টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদ উপজাতি কোটা ভূক্ত সংরক্ষিত। ভোটার হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতা ও বাঙালিদের জন্য শর্ত সাপেক্ষে। স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সার্টিফিকেটটি ও তাদেরকে উপজাতীয় চীফদের নিকট থেকে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। অথচ এ বাঙালিরাই  বাংলাদেশ ভূখন্ডের আদি বাসিন্দা, স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠাতা। উপজাতিরা বহিরাগত অভিবাসী অথবা তাদের বংশধর। ভাগ্যের পরিহাস এটাই যে, যারা এ দেশের আদিবাসিন্দা নয়, তাদেরই দাবি অনুযায়ী সরকার ও ভাবেনঃ স্থানীয় বাঙালিদের অধিকাংশ বহিরাগত আর উপজাতিরাই স্থানীয় আদি অধিবাসী। তাতে ভাবার অবকাশ থাকে যে বাঙালিরা জাতীয় প্রধান জনগোষ্ঠী রূপে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার হকদার। এ নিয়ে বিতর্ক অনাকাক্সিক্ষত। এর প্রতিকারে স্থানীয় অস্থানীয়, আদি ও বসতি স্থাপনকারী পরাগত বহিরাগত ইত্যাদি ভাবার সব সূত্র সম্বন্ধ পরিহার করা দরকার। এর পক্ষে সংশোধনী হবেঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও বসতি সমৃদ্ধ উপজাতি ও বাঙালি অধ্যুষিত মিশ্র অঞ্চল। স্থানীয় বাসিন্দা ও সম্প্রদায় পরিচিতির সনদ দিবেন স্থানীয় জেলা প্রশাসক। জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা লাভের সূত্র হবে গণতান্ত্রিক অবাধ নির্বাচন। সাংবিধানিক ভোটাধিকারই প্রযোজ্য হবে। সামন্তবাদ, মনোনয়ন ও ঔপনিবেসিক আইনঃ হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েলের স্থান গ্রহণ করবে, দেশে প্রচলিত অভিন্ন বিধি ব্যবস্থা ও সংবিধান। ভূমি প্রশাসনের দায়িত্ব রাজস্ব বিভাগ ও তহসীলের উপর ন্যস্ত হবে। প্রথাগত নিযুক্তি, শাসন প্রশাসন ক্ষমতা, ও ভোগ দখলের বিধি ব্যবস্থা রহিত হবে। এক সাথে উপজাতীয় সার্কেল ও নির্বাচিত সংস্থা পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচিত আর মনোনীত রাজা, চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দের অবস্থান মাথাভারি ব্যবস্থা। এতে ছাটাই বাছাই হওয়া দরকার। তন্মধ্যে প্রথাগতভাবে নিযুক্ত চীফ, হেডম্যান ও কারবারীদের পদ ও দায়িত্ব সর্বাগ্রে বিলোপযোগ্য। হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েলটিও এখন আমল যোগ্য নয়। সর্বোপরি পার্বত্য মন্ত্রণালয় উপজাতীয় মন্ত্রী পদ ও চেয়ারম্যান পদ সমূহ বাড়তি তোষণ ও পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা। এসব পরিত্যাজ্য।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • শিতালং শাহ’র গানের ঐতিহ্য
  • দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • সিলেট অঞ্চলের জলসা : একাল-সেকাল
  • সিলেটের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  • ঐতিহ্যের মনিপুরী তাঁত
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সিলেটি বীর সেনানী
  • রেলওয়ে কি হারানো শ্রী ফিরে পাবে যোগাযোগমাধ্যম
  • সিলেটের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অপরূপা এ নদীর নাম সুরমা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিশ্ব দরবারে সিলেটি শীতলপাটি
  • চুঙ্গা পিঠা : বাঁশ দিয়ে প্রাতঃরাশ
  • কবিতা
  • মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল ওসমানী
  • সিলেটি ভাষা ও নাগরী সাহিত্য ধারা
  • লোক সাহিত্যের সমৃদ্ধ জনপদ সুনামগঞ্জ
  • সিলেটের শীতল পাটি
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযুদ্ধে বরাক উপত্যকার কবিগান
  • Developed by: Sparkle IT