ইতিহাস ও ঐতিহ্য

রেলওয়ে কি হারানো শ্রী ফিরে পাবে যোগাযোগমাধ্যম

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০১-২০১৮ ইং ০১:২৫:০৬ | সংবাদটি ২২৬ বার পঠিত

অতীতের গৌরবময় বাংলাদেশ রেলওয়ে ধীরে ধীরে দেশবাসীর কাছে যেন স্মৃতি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষ্যবহ যে, ব্রিটিশ ভারতের বর্তমান ভূখন্ডে যখন রেলওয়ের সূচনা হয়েছিল, ঠিক এর কাছাকাছি সময়ই বাংলাদেশের এ ভূখন্ডে রেল তার যাত্রা শুরু করেছিল। ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে কালক্রমে ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ে এবং অবশেষে বাংলাদেশ রেলওয়েতে পরিণত হয়। এ সময়ে ভারতীয় রেল যোগাযোগ বিস্তৃত হয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রেলওয়েতে পরিণত হয়েছে। আর বাংলাদেশে তা ক্রমে সংকুচিত হয়েছে। ভারতের প্রতিটি অঞ্চলেই রেল হচ্ছে প্রধান ও জনপ্রিয় বাহন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে মানুষ রেলের যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত।
ভ্রমণ বা যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে রেলপথ অনেকটাই নিরাপদ ও আরামদায়ক হিসেবে বিবেচিত। জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিয়ম আর অদূরদর্শিতায় রেলওয়ের বিবর্ণ চিত্র প্রকট হয়ে ওঠে। সিডিউল মেনে না চলা, যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে যথাযথ দৃষ্টি না দেওয়া, কোচ অর্থাৎ বগিগুলোর দুরবস্থা, সিংহভাগ ইঞ্জিনের আয়ু ক্ষয়ে যাওয়া, সংশ্লিষ্ট একটি দুষ্টচক্রের দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতা ইত্যাদি কারণে রেলের অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হয়ে পড়ে। এসব বিষয় আমলে নিয়েই যাত্রীদের আরামদায়ক ও নিরাপদ রেলভ্রমণ নিশ্চিত করতে কোরিয়া থেকে ২০টি ইঞ্জিন ও ১৫০টি যাত্রীবাহী কোচ কিনছে সরকার। এর আগে আরেক দফায় আরও কিছু কোচ ও ইঞ্জিন বিদেশ থেকে কিনেছিল। ২৭ ডিসেম্বর সমকালে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ওই সংবাদ সূত্রে প্রকাশ, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ১৮৬টি মিটারগেজ ও ৯৬টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন রয়েছে। মেকানিক্যাল কোড ও ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী এগুলোর মেয়াদ ২০ বছর। এর মধ্যে ১৬৮টির বয়স ৩০ বছর অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া রেলওয়েতে এক হাজার ১৬৫টি যাত্রীবাহী মিটারগেজ কোচ রয়েছে। এসব কোচের মেয়াদ ৩৫ বছর। যার মধ্যে ৪৫৬টি যাত্রীবাহী কোচের বয়স ৩৫ অতিক্রম করেছে এবং ১৩৫টির মেয়াদ ৩১ থেকে ৩৪ বছর। যাত্রী চাহিদার কারণে মেরামতের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ যাত্রীবাহী কোচগুলো ব্যবহার করা হলেও এগুলো মোটেই সুবিধাসম্পন্ন ও নিরাপদ নয়। বছরের পর বছর অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আর সময়ের চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়নের উদ্যোগ না নেওয়ায় রেল চলছিল ধুঁকে ধুঁকে। বর্তমান সরকার টানা দুই মেয়াদে এ খাতের সংস্কারে কিছু পদক্ষেপ নেয় বটে; আরও সংস্কার প্রয়োজন। সরকার রেল খাত বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয়ও গঠন করে; কিন্তু কাক্সিক্ষত মাত্রায় এর সুফল মেলেনি। সম্প্রতি রেলওয়ে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত ১৮টি রেল কোচ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা সাশ্রয় করেছে।
ইতিমধ্যে বহু রেলস্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে একদিকে জনভোগান্তি বেড়েছে, অন্যদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকেই রেলের প্রতি উদাসীনতা বাড়তে থাকে। ১৯৯১ সালের পর রেলওয়ের ওপর খক্ষ নেমে আসে। দাতাদের পরামর্শে অলাভজনক আখ্যা দিয়ে অনেক শাখা লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন সারাদেশে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রেলপথ বন্ধ হয়ে যায়। লাভজনক নয়, এমন যুক্তিতে রেলপথ বন্ধ করা হলেও লাভজনক নতুন কোনো রেলপথও সরকার তখন সম্প্রসারণ করেনি। সরকারের দৃষ্টিতে সড়কপথ যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, রেলপথ ততটাই উপেক্ষিত থেকেছে। রেলের আয়ের একটা বড় অংশ আসে মালপত্র পরিবহন খাত থেকে। কিন্তু অভিযোগ আছে যে, পরিকল্পনা ও যথাযথ পরিচালনাগত ত্রুটির কারণে মালপত্র পরিবহনে রেলওয়ে ক্রমেই গৌণ হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, বিপুল অর্থ ব্যয় করে চীন থেকে ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা ডেমু ট্রেন আমদানি করা হয়েছিল আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতা কিংবা প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করেই। মাত্র সাড়ে চার বছরেই আমদানিকৃত এসব ডেমুর অর্ধেকই অচল হয়ে পড়েছে, যার মধ্যে পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে ছয়টি। এসব মেরামতের দক্ষতা কিংবা কারখানা আমাদের নেই। অথচ এগুলো আমদানি করা হয়েছিল এসব বিবেচনা না করেই।
এক সময় দেশের মানুষের যাতায়াত ও মালপত্র পরিবহনের জন্য রেলপথের ওপর যে নির্ভরশীলতা ছিল, তা আজ আর সে রকম অক্ষুণ্ণ নেই। মানুষের এ আস্থা হারানোর নানাবিধ কারণ রয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের শাসনামলে যে আন্তঃনগর ট্রেন করে রেলওয়ের আয় বৃদ্ধি ও উন্নত যাত্রীসেবার চেষ্টা হয়েছিল, সেই আন্তঃনগর ট্রেনও এক সময় শ্রী হারিয়ে ফেলল। বর্তমান সরকারের আমলে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর শ্রী কিছুটা ফিরে আসছে। গত ৪০ বছরে জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হলেও রেলে যাত্রী ও মালপত্র পরিবহন সেই অনুপাতে কমেছে- পরিসংখ্যান তাই বলে। সিডিউল মেনে যদি ট্রেনগুলো চলাচল করে, পুরনো স্টেশন ও রেলপথ চালু করা হয়, অনিয়ম, দুর্নীতি যদি বন্ধ করা যায় এবং সর্বোপরি সেবার মান উন্নতকরণের ওপরই নির্ভর করছে রেলের শ্রী ফিরে আসার বিষয়টি।
রেলওয়ে প্রকৃতই যাত্রীসাধারণের উন্নত সেবার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়াক- এটিই রেলমুখীদের প্রত্যাশা। বাংলাদেশ রেলওয়ের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে ও এটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আরও কিছু কাজ করতে হবে। অগ্রাধিকার দিতে হবে বাজেটে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করতে হবে খাতটিকে। দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, অব্যবস্থাপনার ছায়া সরাতে অবশ্যই জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিকল্পিত উপায়ে সংস্থাটি চালালে লাভের অঙ্ক যেমন স্ম্ফীত করা সম্ভব, তেমনি যাত্রীসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন নয়। ইতিমধ্যে রেলের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী যাত্রীসেবার মান এখনও নিশ্চিত হয়েছে কি? রেলের যাত্রীসেবার উন্নতি ঘটানো ও যাত্রীসেবা নিরাপদ করা গেলে এবং রেলকে ঘিরে যে দুর্নীতি রয়েছে তা প্রতিহত করতে পারলে ভাড়া না বাড়িয়েও রেলের পক্ষে লাভের মুখ দেখা সম্ভব। সম্ভব বিস্তৃতকরণও। বাংলাদেশ রেলওয়ের যে সম্পদ কিংবা সম্পত্তি রয়েছে শুধু এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও আয় দিয়েই রেলের চাকচিক্য অনেকখানি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু এ সম্পদ-সম্পত্তি ক্রমেই বেহাত হচ্ছে। লাভবান হচ্ছে ব্যক্তি বা মহলবিশেষ। রেলওয়ের ভেতর ও বাইরের বিষপিঁপড়ার কামড়ে রেলের গায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। দরকার রেলওয়েকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট সবার জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন বৈশিষ্ট্য অনুসারে রেলওয়ে হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত পরিবহন। রাষ্ট্রীয় এ খাতটির অনুজ্জ্বল চিত্রের দায় বিগত থেকে বর্তমান পর্যন্ত কোনো সরকারই এড়াতে পারে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণপরিবহন হিসেবে রেলওয়ে এখনও তালিকার শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এর চিত্র বিপরীত। এর সুযোগ নিয়েছে বেসরকারি পরিবহন খাত। সড়কপথে বাধ্য হয়ে বাসের ওপর যাত্রীদের নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে যেমন বাড়ছে জীবন-ঝুঁকি, তেমনি আর্থিক এবং শারীরিক ক্ষতিও হচ্ছে। এখনও প্রতি বছর লাখ লাখ যাত্রী সরকারি এ খাতটির ওপর (রেলওয়ে) আস্থা রেখে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন, পণ্য পরিবহন করেন। তাদের রক্ষা করার ও ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব যাদের ওপর অর্পিত, সেই রেলওয়ে পুলিশের সিংহভাগের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
যে দুষ্টচক্র রেলের ওপর চেপে বসে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল ক্ষতি ও যাত্রীদের রেলবিমুখ করেছে, তাদের মূলোৎপাটনে দৃঢ় ও নির্মোহ অবস্থান নিতে হবে। এখন যেহেতু রেলওয়ে একটি পৃথক মন্ত্রণালয়ের অধীন, সেহেতু রেলওয়ের উন্নয়নসহ সার্বিক চিত্র উজ্জ্বল করতে ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া দুরূহ কোনো বিষয় নয়। রেলওয়ের গা থেকে বিদ্যমান সমস্যা ঝেরে ফেলতে পারলে পরিবহন খাতে একটি বিপ্লব আসতে পারে। আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যাত্রীবান্ধব সংস্থা হিসেবে রেলকে গড়ে তুলতে পারলে অবশ্যই যাত্রীরা আবার রেলমুখী হবেন, মানুষের সাশ্রয় হবে ও অনেকটাই নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের আয়ের দিকটাও স্ম্ফীত হবে। এ ব্যাপারে সরকার ও সংশ্নিষ্ট মহলকে সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে সবার আগে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT