শিশু মেলা

ওয়াটার বোম্ব

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০১-২০১৮ ইং ০০:০৮:০১ | সংবাদটি ১৯ বার পঠিত

বিজ্ঞানী জামসেদ আরাম কেদারায় শুয়ে শুয়ে ভাবছেন, পৃথিবীতে যেভাবে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে; খুব শীঘ্রই হয়ত পৃথিবী নামক গ্রহটি ধ্বংস হয়ে যাবে। পৃথিবীকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর উপায় কী? বর্তমান সভ্যতার একজন নামি বিজ্ঞানী তিনি। সভ্যতাকে বাঁচানোর দায়ভার স্বাভাবিকভাবেই তার ওপর বর্তায়। পরমাণু অস্ত্রের বিপরীতে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কী গড়ে তোলা যায় না? প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে আধুনিক সভ্যতা কিছুটা হলেও রক্ষা পেত। কিন্তু কীভাবে সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়?
বিজ্ঞানী জামসেদ যখন বিষয়টি নিয়ে খুব ভাবনাবিভোর, তখন তার একমাত্র পুত্র সাফওয়ান এসে বলল, বাবা! আমি পানি ব্যবহার করে একটি বাজি তৈরি করেছি। বাজিটা আমি এখন ফুটাব। বাজি ফুটানোর সময় দর্শক থাকা দরকার। আম্মুকে বলেছি। তিনি থাকবেন বলেছেন। আম্মুর সাথে তুমিও থাকবে, এস বাবা।
ছেলের কথা শুনে বিজ্ঞানী জামসেদ অবাক হয়ে বললেন, সে কী কথা! পানি দিয়েও আবার বাজি হয় নাকি? আমি তো জানি বাজি তৈরি করতে বারুদ লাগে। এসব বলছ কী তুমি?
সাফওয়ান মৃদু হেসে বলল, আমি ঠিকই বলছি বাবা। ঠিক যে বলছি তা দেখার জন্যই তো তোমাকে আসতে বলছি।
বিজ্ঞানী জামসেদ পুত্র সাফওয়ানের কথা ফেলতে পারলেন না। ছেলের কা-কীর্তি দেখার জন্য কৌতূহলী হয়ে তিনি ছুটে এলেন। এসে দেখলেন, সাফওয়ান পাঁচটি জলের বল তৈরি করেছে। বলগুলো ছোট্ট একটি টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বলগুলো দেখতে অনেকটা ক্রিকেট বলের মতোই। কী করে যে ছোট্ট সাফওয়ান এগুলো তৈরি করল, কে জানে। ভাবেন বিজ্ঞানী জামসেদ।
মা-বাবার উপস্থিতিতে সাফওয়ান বলল, মা তুমি এই চারটি বল একটু হাতে রাখ। আমি প্রথমে একটি বল ফুটাব। তারপর একে একে বাকিগুলো ফুটাব। বলে সে তার হাতের বলটি দূরে ছুড়ে দিল। আমনি বলটি মাটিতে পড়া মাত্র ছোটখাটো একটি কু-লি পাকিয়ে বিস্ফোরিত হল। আশ্চর্য পানির বিস্ফোরণ! বিস্ফোরণের সাথে সাথে কতকটা জায়গা জলে জলাকীর্ণ হয়ে গেল। দেখে মনে হল, কিছু সময় আগে বুঝি এখানে ভারি বৃষ্টিপাত হয়ে গেছে।
সাফওয়ানের কা- দেখে তো বাবা ভারি অবাক। তার আম্মুও অবাক হলেন। অবাক হয়ে বাবা বললেন, কী করে এটি গড়েছ বাবা?
বাবার প্রশ্নের জবাবে সাফওয়ান বলল, সেটা না হয় পড়ে জেনো বাবা। এখন তো তোমরা দর্শক। তোমাদের কাজ হল জলবাজির খেলা দেখা। আপাতত তোমরা জলবাজির ফুটানি দেখ।
বলে সাফওয়ান পরপর বাকি বলগুলোও ফুটাল। কিছু সময় পর দেখা গেল, যে জায়গাটিতে সে বাজিগুলো ফুটিয়েছিল সেখানে ছোটখাটো একটি ডোবা তৈরি হয়ে গেছে। ছেলের কাজ দেখে বাবা মনে মনে ভাবলেন, দারুণ জিনিস তো! এটাই তো আমি খুঁজছি। উপায় তাহলে একটা পেয়ে গেছি। সাফওয়ানের জলবাজিগুলোর অনুকরণেই তো আমি বড়সড় কোনো প্রজেক্ট হাতে নিতে পারি। তার তৈরি বলগুলোর মতো করে আমিও পরমাণু অস্ত্র প্রতিরোধী কোনো বল তৈরি করতে পারি। যার নাম হবে ‘ওয়াটার বোম্ব’।
মা-বাবা ছেলের নৈপুণ্য দেখে রীতিমতো মুগ্ধ হলেন। মা আদর করে সাফওয়ানের কপালে চুমুরেখা এঁকে দিলেন। আর বাবা আদর করে তাকে কোলেই তুলে নিলেন। বাবা বললেন, এত চমৎকার জিনিস তৈরি করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে আমি ওয়াটার বোম্ব প্রজেক্টের কাজ করবো ভাবছি।
বাবার কথা শুনে মা বললেন, তোমার প্রজেক্টে অবশ্যই আমার ছেলের নাম থাকতে হবে। কারণ তুমি ওর চিন্তা ধার করেছ।
মায়ের কথা শুনে বাবা হেসে বলেন, তা তো বটেই।
বাবা পরে সাফওয়ানের জলবাজি তৈরির কৌশলটা জেনে নিলেন। তার পরের সপ্তাহেই বাবা ওয়াটার বোম্ব তৈরির প্রজেক্টে হাত দিলেন। প্রথমে তিনি সাফওয়ানের মতোই জলবাজি তৈরি করলেন। ভাবলেন, জলবাজি থেকেই ওয়াটার বোম্ব তৈরির পথে যাত্রা করবেন। সে উদ্দেশে বাবা পানি বিষয়ক বিজ্ঞানের অনেক বই সংগ্রহ করলেন। বইপত্র ঘেঁটে তিনি পানির প্রয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে নিলেন।
ওয়াটার বোম্ব তৈরি করতে বিজ্ঞানী জামসেদের মোটামুটি বছরখানেক সময় লেগে গেল। সময় তো লাগবেই। সভ্যতার কল্যাণে অসাধ্য সাধন করা চাট্টিখানি কথা নয়। বিজ্ঞানী জামসেদ অত্যন্ত মেধাবী বলেই কাজটি করতে পেরেছেন।   হোক দেরি। তবু তিনি সন্তুষ্ট। কারণ দেরিতে হলেও কাজটি তিনি যথাযথ করতে পেরেছেন।
বিজ্ঞানী জামসেদের ওয়াটার বোম্বের কার্যকারিতা অনেকটা এমনÑপারমাণবিক বোমা কোথাও পড়ার আগে সেখানে ওয়াটার বোম্ব নিক্ষেপ করতে হবে। ওয়াটার বোম্ব যেখানে নিক্ষিপ্ত হবে, বোম্ব ফেটে সেখানে একটি বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়ে যাবে। আর প্লাবিত অঞ্চলে পারমাণবিক বোম্ব পড়া মাত্র বোমাটি বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই পানির অনুগুলো তা শোষণ করে নেবে। শোষণ করে একেবারে পাতালে নিয়ে যাবে। ফলে পারমাণবিক বোমা তার ধ্বংসাতœক কার্যকারিতা পুরোপুরি হারাবে।
ওয়াটার বোম্বের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য বিজ্ঞানী জামসেদ তার বাসার পিছনে টিলাময় জনবিরল একটি খোলা জায়গা বেছে নিলেন। তারপর এক চাঁদনি রাতে তিনি তাদের বাসায় কয়েকজন বিজ্ঞানী বন্ধুকে দাওয়াত করলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর তিনি বিজ্ঞানী বন্ধুদের নিয়ে খোলা জায়গায় গিয়ে হাজির হলেন। তিনি আগেই বিজ্ঞানী বন্ধুদের বিষয়টি অবগত করে রেখেছিলেন। বিজ্ঞানী বন্ধুদের কাজ হল, তারা নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে ছোটখাটো একটি পারমাণবিক বোম্ব নিক্ষেপ করবেন। আর তিনি নিজে নিক্ষেপ করবেন তার সাধের ওয়াটার বোম্ব। কথামতো বিজ্ঞানী জামসেদ প্রথমে তার ওয়াটার বোম্বটি ছুড়লেন। তারপর নির্দেশমতো বিজ্ঞানী বন্ধুরা ছুড়লেন ছোট পারমাণবিক বোম্বটি। বোম্ব দুটো ছুড়ে তারা নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে ব্যাপার কী ঘটে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।
পরীক্ষায় অত্যন্ত চমৎকার ফলাফল পাওয়া গেল। বিজ্ঞানী জামসেদের বন্ধুদের ছোড়া পারমাণবিক বোম্বটি খোলা জায়গায় এসে পড়ার আগেই তার ওয়াটার বোম্বটি উক্ত জায়গা দখল করে প্লাবিত হয়ে গেল। প্লাবিত জায়গাটি পারমাণবিক বোমাকে গ্রহণের জন্য তৈরি হয়ে রইল। পরে পারমাণবিক বোমাটি প্লাবিত অঞ্চলে পড়া মাত্র নিমেষেই তা চুপসে গেল। দেখে মনে হল, ওয়াটার বোম্ব যেন পারমাণবিক বোম্বকে গিলে ফেলল। ওয়াটার বোম্বটি পারমাণবিক বোমার সকল কার্যকারিতা শুষে নিল। বোম্বটি যেখানে এসে পড়েছিল সেখানকার ভূমির ঘাসগুলোরও কোনো পরিবর্তন হল না। আশপাশের গাছপালার কোনো প্রকার ক্ষতি সাধিত হল না। তার মানে পারমাণবিক বোম্বটি পরিবেশের কোনো ক্ষতিই করতে পারল না।
ওয়াটার বোম্বের চমৎকার কার্যকারিতা দেখে বিজ্ঞানী জামসেদ এবং বিজ্ঞানী বন্ধুরা আনন্দে একে অন্যের সাথে কোলাকুলি করলেন। তারা বুঝতে পারলেন বিজ্ঞানী জামসেদ সভ্যতা রক্ষায় এক অসাধ্য কর্মই সাধন করেছেন। বন্ধুদের একজন উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন, আমাদের খুলে বল তো কী করে এটি সম্ভব হল?
জবাবে বিজ্ঞানী জামসেদ মুখে একরাশ হাসি ছড়িয়ে বললেন, এর জন্য আমার পুত্রধন সাফওয়ান প্রশংসার দাবিদার। সে জলবাজি তৈরি করে আমাকে ওয়াটার বোম্ব তৈরিতে প্রেরণা যুগিয়েছিল।
বন্ধু বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে বললেন, তাই নাকি? সাফওয়ান তো দেখি খুবই মেধাবী।
ঠিক সে সময় সাফওয়ান এসে তাদের মাঝে হাজির হল। বাবা এবং তার বন্ধু বিজ্ঞানীদের সব কথাবার্তা আড়াল থেকে সে শুনেছিল। শুনে সাফওয়ান বিনীতভাবে বলল, আমি আর এমন কী করতে পেরেছি। সবই তো করলেন আমার বাবা। তাই বাবা-ই আসলে প্রশংসার দাবি রাখেন।
সাফওয়ানের বিনয়ী কথা শুনে বন্ধু বিজ্ঞানীগণ রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT