শিশু মেলা

কাছের পাখি চড়–ই

মোয়াজ্জিম আল হাসান প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০১-২০১৮ ইং ০০:০৮:৩৩ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত

হরেক পাখির মিষ্টি গান আর কোলাহলে মুখরিত আমাদের এই বাংলাদেশ। সবুজ ও ¯িœগ্ধ আলোর এ নিকেতনে অপার ঐশ্বর্য্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সুপরিচিত এইসব পাখীরা। বনভূমি বা বনাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রাম নগরাঞ্চল শহর চর্তুদিকে রয়েছে এদের বিচরণ। অনুকূল-প্রতিকূল নানান ভালোমন্দ সমষ্টির শব্দরুট পেরিয়েও চলছে অভূতপূর্ব বংশবিস্তার। আমাদের দেশজ পাখিরা যেন প্রকৃতির এক মহান ও প্রধান নিয়ামক, অনন্য উপাদানও বটে। আর সেই পাখীদের মধ্যে ‘বাংলার মানুষের সবচেয়ে কাছের পাখি হচ্ছে ‘চড়–ই পাখি’ ইংরেজি নাম স্প্যারো। এটি (ধাবং) এভিস পর্বের অন্তর্ভুক্ত, বর্গঃ চধংংবৎরভড়ৎসবং।
বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের নানান দেশে রয়েছে তার আবাসস্থল। বেশির ভাগই মেরু অঞ্চল ব্যাতিত প্রায় সবখানেই রয়েছে এর জীবন। নানান প্রজাতির নানান বর্ণে রয়েছে জাত পরম্পরা, ছোট্ট এই পাখিটির শরীরবর্ণ- চিকচিকে ও বাদামী পালক বিশিষ্ট হয়ে থাকে- তার সাথে খানিকটা ধুসর বর্ণ ও সংমিশ্রিত। সাধারণত চড়–ই পাখিরা ওজনে- হয়ে থাকে- আর আকৃতি প্রধানত একমুষ্টি হিসেবে পরিমাপযোগ্য।
চড়–ই পাখিকে কাছের পাখি বলার কারণ : এরা বেশির ভাগই মানুষের আঙ্গিনায় বাসা বেধে থাকে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এদের প্রচুর দেখা যায়, তুলনামূলক শহর নগরাঞ্চলেও রয়েছে এর পরিধি, বুড়ো গাছের ফোকরে বা বাড়ির টিনশেড কুঠুরীতে, ব্যান্ডিলেটর এবং শহরের দালানকোঠার চিলেকোঠায় সর্বাধিক এবং আয়েশ করে বাসা বাধে।
বাসার উপকরণ ঃ খড়, শুকনো ঘাস, পরগাছার শেকড়। চড়–ই পাখির  প্রধানতম খাদ্য হচ্ছে- শস্যদানা বা ফুলের কুড়ি, কীটপতঙ্গ, কচি ঘাসের ডগা, আগাছার বীজ ইত্যাদি। এছাড়া উচ্ছিষ্ট ও নানান ধরনের খাদ্য পেলে ছাড়ও দেয় না!
প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বাড়ির উঠান জুড়ে ঝাকে ঝাকে চড়–ইয়েরা আসত (পাশের বিল্ডিংয়ে একাধিক বাসাও ছিল) তো মুরগির জন্য দেয়া বেশির ভাগই শস্যদোনা, ধান, উচ্ছিষ্ট ভাত আমাদের উঠানের কোনায় ছিটিয়ে দেয়া হত- মোরগের সাথে গ্রোগ্রাসেই ভাগ বসাতো একপাল দূরন্ত চড়–ই।
হঠাৎ একদিন বারান্দায় বসে ছিলাম- প্রতিদিনের মতো একঝাক চড়–ই এসে আমাদের উঠান জুড়ে বসল, সেদিন উঠানে কোনো খাদ্য ছিটানো ছিল না, এক্কেবারে পরিষ্কার ছিল, ঝাড়– দেওয়া উঠান... তো চড়–ইয়েরা বসে খাদ্য না পেয়ে- নাচানাচি করতে লাগল (ক্ষুধার্ত ছিল ভীষণ) অতঃপর ক্লান্ত হয়ে খানিকটা জিরোলো আমাদের উঠানস্থ শিমের মাচায়; কিছুক্ষণ এদিক সেদিক তাকানোর পরে যখন দেখলো এই মুহূর্তে এখানে আধার জোটবে না। আমি মনে করেছিলাম এক্ষুনই ফুড়–ৎ দিবে... কিন্তু না! দেখলাম গোগ্রাসেই তারা শিমের বুড়ো পাতাগুলি ঠুকরে ঠুকরে ছিড়ে খেয়ে ফেলল প্রায় সবকটি চড়–ই। তারপর নিজ গন্তব্যে সাঁই সাঁই করে উড়ে গেল, আমিতো খানিকটা অবাক হলাম- ক্ষুদার্থ ও দূরন্ত চড়–ই পাখিদের এই খাদ্যাভ্যাস দেখে।
আচ্ছা- যাই হউক, চড়–ই পাখি কিন্তু আমাদের পরিবেশ বান্ধব ও উপকারী পাখি, গ্রামের কৃষকেরা মনে করেন ‘চড়–ইয়েরা ফসলের ক্ষেতে হামলা করে বেশি ক্ষতি সাধন করে।’ আসলে তা না, শস্যতো খায় বটে- কিন্তু অপকারের চেয়ে উপকারই বেশি করে থাকে- ফসলের জন্য ক্ষতিকারক বিষাক্ত পোঁকামাকড় খেয়ে ফসলী ক্ষেতকে আরো সতেজ ও ফলপ্রসূ করে তুলে- এইসব দূরন্ত চড়–ই পাখিরা। এছাড়াও নানাবিধ জানা অজানা নানান ধাপে এরা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে- অধিক ভূমিকা রাখে।
ইদানীং দেখা যাচ্ছে খুবই দ্রুত ভাবে চড়–ই পাখির সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে, এ নিয়ে শুধু বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞরা চিন্তিত নন, বরং দেশের শিক্ষিত ও ভাবুক মানুষেরা পড়ে গেছেন মহা চিন্তায়। লক্ষ্য করা যাচ্ছে গত কয়েক দশক হতে চড়ুই পাখির সংখ্যা বিদ্যুৎ গতিতে এবং বৃহৎ হারে হ্রাস পেতে শুরু করেছে। ১৯৮০ সাল নাগাদ পৃথিবীর বৃহদাংশ ভাগ হ্রাস পেয়েছে, প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ। বিজ্ঞদের মতে- চড়–ই পাখির এই দুর্বিসহ অবস্থার কারণ হচ্ছে- মোবাইল টাওয়ার হতে নিসৃত বিকিরণ। বিকিরণের ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বাভাবিক ক্রমবিকাশ, অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহার, ফসলী ক্ষেতে পোকা মাকড়ের ক্ষতিসাধন হতে রক্ষা পেতে ক্ষতিকর ও বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ এবং পাখি শিকারীদের তান্ডবের ফলে দিনদিন বিপুল হারে বিলুপ্তির গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে- এইসব পরিবেশ বান্ধব চড়–ই পাখির জীবন বিস্তার ও অস্তিত্ব। এছাড়াও রয়েছে নানান কারণ সমূহ, মানবসৃষ্ট বহুমুখী নিষিদ্ধ কার্যকলাপ। যার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শান্ত ¯িœগ্ধ চড়–ই পাখিরা।
এতে করে নিখুতভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছি আমরা। স্বল্প মাত্রা হতে বৃহৎ মাত্রায় যোগ হচ্ছে নানান ও বহুবিধ সমস্যা, ভারসাম্য হারাচ্ছে প্রকৃতি। আসলেই তা দুঃখজনক এবং অপ্রীতিকর, চড়–ইপাখির সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় কতটা যে দুঃসহ পরিণতি হবে- তা আমরা সাধারণ মানুষেরা বুঝতে পারি না, কিন্তু পাখি বিশেষজ্ঞদের মত উপস্থাপনে নিশ্চিত আমাদের ভ্রু কুঁচকে যাবে!
যাই হোক, আমরা যদি একটু সচেতনভাবে সামান্য কিছু কাজ করি- তাহলে বাঁচাতে পারব পরিবেশ বান্ধব চড়–ই পাখিদের, বাড়াতে পারব বংশবিস্তার, সামান্য কিছু উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে পারি স্বাভাবিক ও অনুকূল পরিস্থিতি: সুন্দর হতে পারে এদের জীবনবৈচিত্র্য। আমরা যদি বাসায় বা চিলেকোঠায়- বাড়ির ছাদ, ব্যালকনি, উচু জানালার কার্নিশে ছোট ছোট বাকশো কিংবা ছোট্ট মাটির পাতিল বেধে দিই তাহলে তো ভীষণ একটা কাজের কাজ হবে।
দেখবেন কিছুদিনের মধ্যেই চড়–ইয়েরা এতে বাসা বাধবে এবং কিছুটা হলেও নিরাপদে থাকতে পারবে। সেই সাথে বাড়বে তুলনামূলক বংশবিস্তার। আমাদের অবশিষ্ট কিংবা উচ্ছিষ্ট খাদ্যদানা কিংবা অপ্রয়োজনিও খাদ্যগুলি উপযোগী জায়গায় ছিটিয়ে দিই, তাহলে অতি সহজে তারা আহার পেয়ে যায়, এদিক সেদিক কষ্ট না করে অথবা খাদ্যভাবের জন্য মারাও যাবে না। এই কাজটা নেহাৎ মন্দ হয় না। সেই সাথে গ্রামের কৃষকদেরকেও একটু অবগত করে রাখি এবং চড়–ই পাখি সম্পর্কে ভুল ধারণা এড়াতে ও রক্ষা করতে সঠিক অনুধাবন ও জ্ঞান প্রদান করি। আসুন, আমরা সকলে মিলে না হয় সামান্য কিছু করি, দেখবেন সবার সামান্য ও অতিক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় বিলুপ্তির পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারি পরিবেশবান্ধব এইসব চড়–ই পাখিদের।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT