পাঁচ মিশালী

নায়াগ্রা জলপ্রপাত

প্রফেসর মো. আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০১-২০১৮ ইং ০১:৪৩:৫৩ | সংবাদটি ১৩১ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
টরেন্টো থেকে বেশ ক’টি বাংলা সাপ্তাহিক বের হয়, এগুলোর মধ্যে ভোরের আলো, সময়, বাংলা কাগজ, বাংলা মেইল ইত্যাদি রয়েছে।  মন্ট্রিয়লের বাংলাদেশী দোকানেও এগুলো ফ্রি পাওয়া যায়। প্রত্যেকটি সাপ্তাহিকের আকার বিরাট, কোনটি সত্তর বা বাহাত্তর পৃষ্ঠা। অথচ বিনামূল্যে সরবরাহ হচ্ছে। আসলে পত্রিকাগুলো এডভারটাইজ নির্ভর। পত্রিকার অধিকাংশ পৃষ্ঠা জোড়ে থাকে ব্যবসা বাণিজ্যের পাবলিসিটি। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কানাডার বিভিন্ন শহরে অবস্থিত শাখাগুলোর প্রচারপত্র প্রায়ই এসব বাংলা পত্রিকার পুরো এক পৃষ্ঠা জোড়ে মুদ্রিত হয়। এতে স্থানীয় নেতাদের ছবিসহ নাম প্রকাশিত হয়। শুনেছি কেউ কেউ নাকি পত্রিকায় নিজের ছবি ও নাম প্রকাশের লোভেই বিভিন্ন দল করে থাকেন। বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মতৎপরতার সমর্থনে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন পত্রিকায় প্রকাশ পায়। কোন কোনো সময় দেখা যায় একই শহরে একই রাজনৈতিক দলের সমর্থনে একাধিক কমিটি গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলীয় নেতা কানাডা সফরে এলে তাকে সংবর্ধনা দিতে কখনো কখনো দেখা যায় একই শহরের একাধিক কমিটির সদস্যরা পরস্পর লজ্জাকর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছেন। প্রত্যেক কমিটির সদস্যগণ দাবি করেন যে, তারাই সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব করছেন। এ নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে যায়। এই উৎসাহী ব্যক্তিগণ যদি কানাডার গণতান্ত্রিক রাজনীতির কালচার ও সুফল যা তারা এখানে থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতেন এবং বাংলাদেশে তা বাস্তবায়নের সাধ্যমতো প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন, তাহলে বাংলাদেশের হয়ত কিছু উপকার হতো। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ছাড়াও উপমহাদেশের ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশের বিপুল সংখ্যক অভিবাসী কানাডায় বসবাস করছেন। কিন্তু তারা এখানে রাজনৈতিক দলীয় ভিত্তিক কোন সংগঠন করেন না। যা হোক। সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোয় বাংলাদেশের বেশ কিছু খবর থাকে এবং বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের কলামিস্টদের লেখাও ছাপা হয়।
টরেন্টোয় বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অভিবাসী মুসলমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অনেক মসজিদ রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশীও আছেন। মসজিদগুলোর নাম ‘বায়তুল মুকাররাম’, ‘মসজিদ আল আমান’ ইত্যাদি। বাংলাদেশী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত মসজিদের নাম ফলকে ইংরেজির সাথে বাংলাও রয়েছে। জোহরের সালাত জামাতে আদায় করলাম ‘সুন্নাতুল জামাত অব ওন্টারিও কানাডা’ নামক মসজিদে। এটি ড্যানফোর্থ রোড স্কারবরোতে অবস্থিত ও পাকিস্তান থেকে আগত অভিবাসী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। অনেক জায়গা নিয়ে একতলা বিশিষ্ট বিরাট আকারের মসজিদ; আঙিনায় গাড়ি পার্কিং এর যথেষ্ট জায়গা। মসজিদে শিশুদের জন্য প্রাথমিক ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের নির্মাণ কৌশল দেখে মনে হলো, এটি অস্থায়ী একতলা ভবন; অদূর ভবিষ্যতে নিশ্চয় বহুতল বিশিষ্ট, অনেক সুযোগ সুবিধাসহ মসজিদ কমপ্লেক্স পুনর্নিমাণ করা হবে।
এবার মিলন আমাকে টরন্টোর মিসিসুয়াগা নামক সিটির একটি আবাসিক এলাকা ঘুরিয়ে নিয়ে এল। এখানকার বাড়িগুলো বৃহৎ, সুন্দর ও জাঁকজমকপূর্ণ। সমাজের সম্পদশীল ব্যক্তিদের বাস। এখানে কিছু ধনাঢ্য বাংলাদেশী পরিবার বসবাস করেন। সবার জানা, এদেশে ছিনতাই, রাহাজানি, অপহরণ, সড়ক দূর্ঘটনা ইত্যাদি প্রায় নেই। বাংলাদেশের ধনী পরিবারের সন্তানগণ এখানকার নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে। পরিবারের কর্তা সব সময় টরন্টোয় থাকেন না। দেশে হয়ত তার বড় ব্যবসা আছে অথবা তিনি উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত রয়েছেন। তাই তাকে দেশেই থাকতে হয়। মাঝে মাঝে এসে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গ দিয়ে যান। এখানে স্ত্রী অর্থাৎ বেগমগণ সব সময় ছেলে-মেয়েদের সাথে থাকেন। তাই এখানকার বাংলাদেশীদের কাছে এলাকার নাম বেগমপাড়া। কানাডাসহ পাশ্চাত্যে সবাই নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে থাকেন। এখানে ড্রাইভার নিয়োগের প্রচলন নেই। সামর্থ্যও নেই। শুনেছি কানাডার প্রধানমন্ত্রী নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে থাকেন। কিন্তু বেগমপাড়ার বেগমদের গাড়ির ড্রাইভার নিয়োজিত রয়েছে।
দুপুরের খাবার শেষে সীমা-মিলনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেলা তিনটায় আমরা নায়াগ্রার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। বৃষ্টি না ঝরলেও আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন। বাতাসও বেশ জোরে বইছে। আমোদ ভ্রমনে প্রতিকুল আবহাওয়া সঙ্গী হিসেবে কারো কাম্য নয়। তবে সুমন সুখবর জানালো, আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস আগামীকাল সূর্যালোক থাকবে। আমরা তা-ই কামনা করছি। এদিকে মহাসড়কে রাজকীয় তোরণের মতো স্থায়ীভাবে স্থাপিত বিলবোর্ডে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সতর্ক বার্তা বার বার প্রদর্শিত হচ্ছে, ‘হাই উইন্ডস অন স্কাই! ড্রাইভ কেয়ারফুলি। সুমন ড্রাইভিং-এ সব সময় কেয়ারফুর। সতর্ক বার্তা তাকে আরো কেয়ারফুল করে তুললো। হাই ইউন্ডস-এর সতর্কবাণী মাথায় নিয়ে দু’ঘণ্টা ভ্রমনের পর বিকাল পাঁচটায় আমরা নায়াগ্রা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত ডাবল ট্রি হোটেলে পৌঁছলাম। কুড়ি তলা বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের হোটেলটিতে সিট অগ্রিম রিজার্ভ করা ছিল। আমাদেরকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে সুমন রিসেপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় দফতরি কাজ সম্পন্ন করলো। ওয়েলকাম গিফ্ট হিসেবে হোটেল কর্তৃপক্ষের দেয়া কয়েক প্যাকেট সুস্বাদু বিস্কুটসহ সুমন একটি বেশ বড় আকারের ট্রলি ঠেলে নিয়ে এল; এতে কোট বা অন্য কিছু ঝুলিয়ে রাখার হ্যাঙ্গার রয়েছে। ট্রলিতে আমাদের সব মালপত্র তোলা হল। কিন্তু আরিসা তার ব্যাগটি নিজের কাছেই রেখে দিল। চাকাযুক্ত ব্যাগটি সে অনেকক্ষণ টেনে নিয়ে চললো। এখানে লিফ্টকে এলিভেটর বলা হয়। ট্রলিসহ এলিভেটরে চড়ে আমরা পঞ্চম তলায় পাঁচ’শ এক নম্বর রুমে পৌঁছলাম। বেড রুম ছাড়াও এতে সুসজ্জিত বেশ বড় আকারের ড্রয়িং রুম রয়েছে। ড্রয়িং রুমের বড় সোফাটি সুমন মুহূর্তে ম্যাট্রেসযুক্ত ডবল খাটে রূপান্তরিত করে ফেললো। হোটেল রুমের জানালা দিয়ে নায়াগ্রা ফলস দেখতে পেয়ে আমরা উল্লোসিত হয়ে উঠলাম। হোটেলের আশেপাশে ছড়িয়ে রয়েছে আরো অনেক উঁচু ভবন। কিছুটা দূরে কালচে বাদামি রং-এর এক প্রাচীন গির্জা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। মনে হলো গির্জাটি অনেক পুরনো। এটি দেখার পর বাংলাদেশে রামুতে অবস্থিত প্রাচীন কিয়াং-এর কথা বার বার স্মরণে এলো।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT