সাহিত্য

বোকা

মুহাম্মদ মহিবুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০১-২০১৮ ইং ০১:২৫:০৮ | সংবাদটি ১৪৬ বার পঠিত

- বলো না তোমার বন্ধুদের কথা।
- নিতান্ত আবদারের সুরে লীনা শুয়ে শুয়েই বলল সুজিতকে।
অমল, বিমল, শ্যামল আর সুজিত। এরা চার বন্ধু জীবনের অনেকগুলো অধ্যায় কাটিয়েছে বড় কাছাকাছি। নামগুলো ওলট পালট করে ভাবতে বেশ ভালো লাগে সুজিতের।  
আরেকদিন বলব লক্ষ্মীটি, আরেকদিন-
সিগারেটে টান দিয়ে হাতের কবিতার বইখানা রেখে দিয়ে বলল সুজিত।
লীনা সুজিতের স্ত্রী। ক’মাস হল ওদের বিয়ে হয়েছে। এখনো লজ্জা লজ্জা ভাব কেটে ওঠেনি এদের। এখনো ভাবতে কেমন লাগে লীনা আর সুজিত এক বিছানায়। কল্পনাকে ভেঙ্গে দিয়ে  অতি বাস্তবের মাঝে। ওর পাশে বসে বসে তাকাচ্ছিল ওর দিকে। তারপর লীনা সুজিতের দিকে মুখ করে পাশ ফিরল। একফালি দুষ্টুমিভরা হাসি চোখে মুখে। সুজিত আনমনা হয়ে এ সব লক্ষ করছিল। লীনা মাঝে মাঝে চোখ বুজে বুজে কী যেন ভাবছিল।
- আমি বলছি, বলো। আমি শুনব তাদের কথা। সহসা চোখ মেলে বলল লীনা। লীনা সুজিতের ডানহাতটা তার বুকে চেপে ধরল। এভাবে কিছুক্ষণ রইল। সুজিতের কেমন যেন ভাল লাগছিল। শেষটায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে লীনার ঘন চুলগুলো নাড়তে লাগল।
চুল থেকে ছড়ানো গন্ধ শ্বাসের সঙ্গে সুজিতের ভেতর ঢুকে গেল। একটা আমেজ, একটা অনুভূতি সুজিতকে আরাম দিতে লাগল। লীনা কেমন যেন আরাম করে সুজিতের দিকে অপলক চেয়ে রইল।
- সত্যি শুনবে তাদের কথা?
- হাতের অর্ধেক শেষ করা সিগারেটটা ফেলে দিল এসট্রেতে। সুজিত বলতে আরম্ভ করলÑ
অমল দার্শনিক প্রকৃতির। কোন কিছুতেই তার আসক্তি নেই। বন্ধুদের জন্যে সে কী না করতে পারে। বাবা-মাকে হারিয়ে ছোট ভাইবোনদের দায়িত্ব নিয়েছে কাঁধে। ওদের সুখ, শান্তি, প্রচেষ্টা তার জীবনের সাধ, আনন্দ। মেয়েদের প্রতি চিরদিন শ্রদ্ধার ভাব।
- অনেক পুরুষ মানুষই এরকম একটা ভাব দেখায়।
সুজিতের কথায় বাধা দিয়ে হঠাৎ বলে উঠল লীনা।- শেষকালে দেখা যায় সব মিথ্যে।
- না লীনা, তুমি জান না। অমল একসেপ্শান। এ ধারণা তোমার ভুল।
হয়ত লীনা সুজিতের উগ্র কামনাকে উপলব্ধি করেই এমনি একটা ধারণা করে নিয়েছে। যাক সুজিত আর এ প্রসঙ্গে কিছু বলল না। থেমে গেল।
মশারিটা ছেড়ে দিল সুজিত। লীনার মাথার কাছটায় একটা ফাঁক রেখে দিল ইচ্ছে করেই। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই লক্ষ করল লীনা ছট্ফট্ করছে কেমন যেন। দু-একটা মশা প্যান্ প্যান্ করছিল ওর কানের কাছে। তাই লীনা হাত দিয়ে চুলকাচ্ছিল কানের কাছটায় এক একবার।
- আর বিমল। সুজিত বলতে লাগল। বিমল তার উৎশৃঙ্খল নামটা ঘুচাতে অনেক চেষ্টা করেছে। পারল সেদিন, বিয়ে হ’ল যেদিন। লীনা, ওর বউটা বড় ভাল। বিমল স্কুলমাস্টার, আর বৌ তার কেরানী। সুজিত লীনার বিয়ের এক বছর আগেই তার বিয়ে হয়। এখন ঢাকায় আছে। সেবার সুজিত হঠাৎ গিয়ে সেখানে উপস্থিত। ওদের দাম্পত্য জীবন খুব ভাল লাগছিল। কিন্তু চার পাঁচ দিন যেতে না যেতেই কিসের একটা অভাব, হতাশা টের পেলো সুজিত ওদের জীবনে। বিমল মদ খায়। ওর স্ত্রী দুঃখ করে বলল একদিন। শেষ কিন্তু এখানটাতেই নয়- নিরীহ বেচারীকে শয়তানটা মাঝে মাঝে মারধোর করত।
লীনা বসে পড়ল সুজিতের পাশে। সুজিত টের পেল লীনার ভাল লাগছিল না বিমলের এ রকম বিশ্রী ব্যবহার।
-পুরুষ মানুষগুলো কেমন যেন হয়ে যায় গোবেচারী মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে পেলে। জানো আমার ইচ্ছা হয়, এ রকম মানুষগুলোকে একেবারে ঠিক করে দিতে। মদ খাবে, আর নাচবে- আর নিজের স্ত্রীর ওপর যতসব অত্যাচার। ছি! ছি!
- লীনার উত্তেজিত ভাবটা সুজিতকে রীতিমত ভাবনায় ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সুজিত বলল- বিমল উৎশৃঙ্খল ছিল লীনা। তাই তার ক্ষ্যাপামিটা মাঝে মাঝে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
- আর তোমার তৃতীয় বন্ধুটি?
- রাগের মাথায় বলল লীনা।
- শ্যামল কিন্তু ভিন্ন প্রকৃতির। জান লীনা, কত মানুষ জীবনে দেখেছি কিন্তু এই একটা ছন্নছাড়া মানুষের জুটি মেলা ভার। বিয়ে করবে না- এই একটা জেদ। কতবার মাসীমার হয়ে কত করে বুঝিয়েছি। না, কিছুতেই কিছু হয় না। কিন্তু লীনা, জীবনে ও জেনেছে কেবল আড্ডা আর আড্ডা। মেয়ে বন্ধু, পুরুষ বন্ধু ভেদ নেই কোন। ইদানীং উকিল হিসাবে নাম করেছে। বেশ পসার- আয়ও যথেষ্ট। খালা আর শ্যামল। খায় দায় স্ফূর্তি করে। ভাবনা কাকে বলে বুঝলই না জীবনে- পাগলটা।
- কিন্তু বন্ধুটি তো তোমার আড্ডার স্বাদ ভালোই বুঝেছেন।
- ওই যে বললাম, অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব-বান্ধবী লীনা ..... অসংখ্য ......
- কাপুরুষ কোথাকার!
সুজিত বুঝতে পারল না লীনা কী বলতে চায়। লীনা হঠাৎ করে বিপরীত দিকে মুখ করে শুয়ে পড়লো। সুজিত এ অবস্থায় আর বেশি কিছু বলা ভাল মনে করল না। তাই বেডসুইচটা অফ করে দিয়ে ওর গায়ের সমান্তরাল হয়ে শুয়ে পড়ল। একটা অস্পষ্ট হিজিবিজি চিন্তা সুজিতের মনটাকে কেমন যেন ঘিরে ফেলল। সুজিত বুঝতে পারলো না কেন।
সুজিত লীনাকে কোন কষ্ট তো দেয়নি। অন্তত এটা তার চিন্তায় আসে না। সে ভেবেছে তার অধ্যাপক জীবনের খ্যাতি, যশ, অর্থ সবই লীনার। তবে মাঝে মাঝে সুজিতের রাতে ফিরতে দেরি হতো। এ জন্য তার এখনকার কর্মজীবনের বন্ধুরাই দায়ী। লীনা সুজিতের অপেক্ষায়। তাকে ফেলে কোনদিন রাতের খাবার খায়নি বড়ো একটা। বেশি দেরি হলে লীনা তাকে অজস্র বকুনি দিতো। সুজিত নীরবে সব সহ্য করে নিত। মাঝে মাঝে প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে শান্ত করেছে সুজিত।
অমল-বিমল-শ্যামল।
লীনা চুপ। তবে জেগে যে, তা টের পেল। আস্তে আস্তে কানের কাছে মুখ নিয়ে সুজিত বলল- লী - না।
- তোমাদের এতটুকু বিশ্বাস নেই।
- কেন? লীনা। অসহায়ের মতো বলল সুজিত।
- তুমি তোমার বিমল বন্ধুর মতো। একদিন দেখা যাবে তোমাদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই।
- মোটেই না লীনা।
- সুজিত স্নেহের সুরে বলল।
- মারধোর করবে না তো আমাকে কোনদিন?
- কী যে বলো লীনা! এ সন্দেহ তোমার যুক্তিহীন, অবান্তর।
লীনা এরপর থেকে সুজিতের গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগল।
অমল-বিমল-শ্যামল।
এদের জীবন কাহিনী ত্রিস্রোতের মত। লীনা কী যে দর্শন খুঁজে পেল তা সুজিত জানে না। প্রায়ই শুয়ে শুয়ে বলত- অমল বিমল শ্যামল আর তুমি।
সুজিত বুঝতে পারল কী ভুল করে ফেলেছে। ফেলে আসা জীবনের অধ্যায় সে প্রকাশ করে ফেলেছে। লীনা ততই দূরে চলে গেছে যতই সুজিত বন্ধুদের কথা বলে বলে কাছে যাবার চেষ্টা করেছে। অবশেষে সুজিত বুঝতে পারলো- অতীতের কথা স্ত্রীদের কাছে প্রকাশ করা বড় বোকামী।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT