সাহিত্য

হিটলারের সাহিত্যিক প্রত্যাবর্তন

শাহনেওয়াজ বিপ্লব প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০১-২০১৮ ইং ০১:২৫:৪৮ | সংবাদটি ১২৮ বার পঠিত

মৃত্যুর ৬৭ বছর পর হিটলার আবারও ফিরে এসেছেন এবং আবারও জার্মানিতেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হিটলারের সম্পত্তি ও প্রকাশনার দায়দায়িত্ব গ্রহণকারী জার্মানির বেভারিয়া রাজ্য সরকার কর্তৃক হিটলারের সাড়াজাগানো গ্রন্থ ‘মাইন ক্যাম্ফ’ প্রকাশের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো নতুন করে অনুমতি দেওয়া হবে- সাম্প্রতিক এ সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর জার্মান পত্রপত্রিকা আর সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে এখন হিটলারকে নিয়ে নানা মন্তব্য, লেখালেখি আর প্রতিবেদন প্রকাশের হিড়িক পড়েছে। গুন্টার গ্রাসের কবিতা-বিতর্ক ছাড়িয়ে জার্মান সাহিত্যে আর জার্মান রাজনীতিতে এখন আলোচনার বিষয় কেবল হিটলারের বই '‘মাইন ক্যাম্ফ’'।
বিষয়টি বলা যায়, আশ্চর্য হওয়ার মতোই একটি ঘটনা। অ্যাডলফ হিটলার কোনো নামকরা লেখক নন। বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত আর কুখ্যাত স্বৈরাচারী শাসকদের অন্যতম একজন ছিলেন তিনি। অথচ তার লেখা আইন ক্যাম্ফ বা আমার সংগ্রাম বইটি ৯০ বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বেস্টসেলার বই।
শুধু ভারতে এবং বাংলাদেশে গত ১০ বছরে এ বইয়ের দেড় লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। জার্মানিতে গত দুই বছরে বিক্রি হয়েছে এ বইয়ের ১০ লাখ কপি, তুরস্কে ২৫ হাজার কপি আর ব্রিটেনের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আলবাটার্স লিমিটেড ‘মাই ব্যাটল নাম দিয়ে ইংরেজি সংস্করণে এক লাখ কপি প্রকাশ করেছিল দুই বছর আগে এবং তা-ও প্রায় নিঃশেষ। বর্তমানে ৫০ ডলারের বিনিময়ে আমাজন ডট কম হিটলারের বইটি বিক্রি করছে।
হালবাটার্স প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী পিটার  ম্যাকগে বলেন, হিটলারের লেখা ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটি এমন নয় যে প্রথাগত বেস্টনেসার উপন্যাসের মতো এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ বিক্রি তালিকার শীর্ষে থেকে আর বিক্রি হয় না; বইটি বিক্রি হয় ধীরে ধীরে এবং নিয়মিত।
হিটলারের বইটির এত বহুল প্রচার আর প্রসার দেখে ইতিমধ্যে নড়েচড়ে বসেছেন জার্মানি প্রকাশকরা। কারণ ১৯৭৯ সালে জার্মান হাইকোর্টের এক রায়ে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জার্মানিতে হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটির প্রকাশনা বন্ধ ছিল। তার পরও সরকারিভাবে অনুমতি দানের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর পর জার্মানিতে হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটি প্রকাশের স্বত্বাধিকারী পাওয়ার জন্য ইতিমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে জার্মান প্রকাশকদের মধ্যে। এ ছাড়া জার্মানির নিউ নাজি সংগঠনগুলোও পেতে চাইছে, বইটি প্রকাশের স্বত্ব।
হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটির স্বত্বাধিকার পাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে জার্মানির ইহুদিবাদী সংগঠনগুলো। তাদের মতে হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটির ধারাবাহিক পুনঃ প্রকাশ একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এবং ৩৭ বছর পর ‘মাইন ক্যাম্ফ’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে জার্মানিতে হিটলারের প্রত্যাবর্তনে তারা শঙ্কিত বলে জানিয়েছেন। ইহুদিবাদী সংগঠনগুলো মনে করে, অনেক পাঠকই হিটলারের বইটি কেনার জন্য কিনেছেন এবং দুই এক পৃষ্ঠা পড়ার পর বাড়িতে বুকশেলফে অথবা টেবিলে ফেলে রেখেছেন। পুরো বইটি পড়েছেন, এমন পাঠক নগন্যই বলে মনে করে তারা।
যে বইটি নিয়ে এত মাতামাতি সে ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটি হিটলার লেখা শুরু করেছিলেন ১৯২৪ সালে তাঁর ৩৫ বছর বয়সে। জার্মানির ল্যান্ডসবার্গ কারাগারে থাকাকালীন প্রথমে তিনি আত্মহত্যা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং পরে সিদ্ধান্ত বদলে তিনি লিখেছিলেন বইটি। আসলে প্রচলিত অর্থে যেভাবে টেবিলে বসে বই লেখা হয়, ঠিক সেভাবে বইটি লেখেননি হিটলার বরং তিনি বলে গিয়েছিলেন এবং লেখার কাজটি করেছিলেন তারই কারাসঙ্গী।
হিটলারের আত্মজীবনীমূলক এ গ্রন্থটির দুটি খন্ড রয়েছে। প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে এবং দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে। ‘মাইন ক্যাম্ফ’ হিটলারের আত্মজীবনী হলেও এ বইতেই হিটলার নাৎসিবাদ সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা দেন। প্রথমে হিটলার বইটির শিরোনাম নির্বাচন করেছিলেন মিথ্যা, বোকামি আর কাপুরুষতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এই নামে। শেষে প্রকাশক হিটলারের অনুমতিক্রমে কেটেছেঁটে বইটির শিরোনাম নির্ধারণ করেন ‘মাইন ক্যাম্ফ’।
‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইতে হিটলার মানবজাতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। তার মতে সাদা চামড়া, সোনালি চুল আর নীল চোখের জার্মানরা হচ্ছে মানুষদের ভেতর শ্রেষ্ঠ আর ইহুদি এবং আভিক জাতিগোষ্ঠী, যেমন- চেক, পোলিশ, রাশিয়ান এমনকি কালো ও হলুদ চামড়ার লোকেরা জার্মানদের অধীনস্থ হওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেছে।
হিটলার মনে করতেন, জার্মানদের এই শ্রেষ্ঠত্ব নষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ইহুদিরা। তাই ‘মাইন ক্যাম্ফ’ এ তিনি ইহুদিদের অভিযুক্ত করেছেন মিথ্যাবাদী, নোংরা, ধূর্ত, সংস্কৃতিহীন, রক্তচোষা বহিরাগত এ রকম অজ¯্র শ্লেষে।
১৯২৫ সালে ‘মাইন ক্যাম্ফ’ প্রকাশের পর ১৯৩০ সাল পর্যন্ত বইটি জনমনে তেমন আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। ১৯৩০ সালে হিটলারের এন.এস.ডি.পি পার্টি জার্মানিতে দ্বিতীয় শক্তিশালী পার্টি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ওই বছরই ‘মাইন ক্যাম্ফ’ এর ১০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। ১৯৩২-এ এসে হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বিক্রি হয় দুই লাখ ৪১ হাজার কপি। ১৯৩৩ এ জার্মানির সংসদ নির্বাচনে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে হিটলারের নাজি পার্টি এবং সে বছরই ৯ লাখ কপি বিক্রি হয়ে যায় ‘মাইন ক্যাম্ফ’ এর। ১৯৩৩ সালেই আমেরিকায় প্রকাশিত হয় ‘মাইন ক্যাম্ফ’ এর ইংরেজি সংস্করণ ‘মাই ব্যাটল’।
প্রকাশকদের মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালের ব্রিটিশ শাসক উইন উন চার্চিলকে লেখা বিখ্যাত বই ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ ও হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ এর মতো এতটা বিক্রি হয়নি। যা হোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত সব মিলিয়ে ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বিক্রি হয়েছিল এক কোটি ২০ লাখ কপি। এর ভেতর ৬০ লাখ কপি কিনে নিয়েছিলেন হিটলারের শাসনাধীন জার্মান সরকার।
হিটলারের আদেশ মোতাবেক প্রত্যেক সরকারি কর্মকর্তা, বিয়ে পড়ানো ম্যাজিস্ট্রেট, বিয়ের আসরে বর ও কনেরা উপহার হিসেবে পেতেন ‘মাইন ক্যাম্ফ’।
১৯৪৩-এ প্রথমবারের মতো হিটলার তাাঁর ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটির জন্য পাঁচ দশমিক সাত মিলিয়ন জার্মান মার্ক সম্মানী পান নাজি প্রকাশনা সংস্থা ফ্রানজ ইমের কর্তৃক। সম্মানী গ্রহণকালে চুক্তি সইয়ের সময় হিটলার তার ঠিকানা লিখেছিলেন প্রিন্স রেগেন্টেনপ্লাটস ১৬, মিউনিখ, ব্রায়ান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যদের দ্বারা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নাজিদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। আর তারপর থেকে হিটলার সম্পর্কিত সব কিছুই ইতিহাসে ঘৃণিত হতে শুরু করে।
কিন্তু তার পরও হিটলারকে জানার অদম্য আগ্রহ আর কৌতুহল মানুষের আজও রয়েছে। আর হিটলারকে জানার, তার নীতি এবং চিন্তাকে জানার অন্যতম সূত্র তাঁর ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটি। এই আগ্রহের কথা বিবেচনা করেই ১৯৯৫ সাল থেকে এমনকি ইসরায়েলও হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ হিব্রু ভাষায় প্রকাশের অনুমতি দিয়েছে। তুরস্কেও ২০০৪ সাল থেকে ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বিক্রি হচ্ছে তুর্কি ভাষায়। আর ভারতে তো ‘ক্ল্যাসিক’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে ‘মাইন ক্যাম্ফ’।  
হাঙ্গেরিতে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মানবাধিকারের বিরুদ্ধে লেখা বই অভিযোগে হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সেখানেও ১৯৯৭ থেকে ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বিক্রি হচ্ছে হাঙ্গেরীয় ভাষায়। ৩৬৮ পৃষ্ঠার হাঙ্গেরীয় ভাষায় ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটির দাম রাখা হয়েছে ১০ ইউরো। ১০ ইউরো দাম রাখার পরও বিক্রির পরিমাণ বেশ সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন ‘মাইন ক্যাম্ফ’ এর হাঙ্গেরীয় প্রকাশক অ্যারন মনোচ।
অন্যদিকে ‘মাইন ক্যাম্ফ’ এর ব্রিটিশ প্রকাশক অ্যালবাটার্স লিমিটেড বর্তমানে মাইন ক্যাম্ফের ক্ষুদ্র সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। মোট ৪৮ পৃষ্ঠার এ ক্ষুদ্র সংস্করণে প্রতিটি ১৬ পৃষ্ঠায় প্রথম অধ্যায়ে হিটলারের আত্মজীবনী, দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রোপাগান্ডা এবং তৃতীয় অধ্যায়ে হিটলারের ধারণাসমূহ স্থান পাবে।
অলবাটার্স প্রকাশনী স্বত্বাধিকারী পিটার ম্যাকলের মতে, হিটলারের সম্পর্কে অনেক খারাপ ধারণা জনমনে থাকলেও তার সম্পর্কে জানার জন্য আগ্রহের কমতি লক্ষ করা যাচ্ছে না।
পিটার ম্যাকলের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই বিভীষিকার দিনগুলো জানতে হলে হিটলারকে জানা অত্যাবশ্যক। আর হিটলারকে জানতে হলে তার ‘মাইন ক্যাম্ফ’ই সম্বল। ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট জানতে হলে পাঠকদের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটি পড়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।
পিটার ম্যাকগে বলেন, ইউরোপের প্রতিটি বই দোকানে হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটি এত বেশি বিক্রি হয়েছে, এত বেশি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছেছে, সেটা দেখে, বেস্টসেলার লেখক হিসেবে হিটলার সম্ভবত নরকে বসেই হাসছেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT