সাহিত্য

বিচিত্র ভাবনা ও টুকরো স্মৃতি : সময় ও সমাজের সহজপাঠ

বাশিরুল আমিন প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০১-২০১৮ ইং ০১:৩১:৪৮ | সংবাদটি ১৯২ বার পঠিত

সৈয়দ ছলিম  মোহাম্মদ আব্দুল কাদিরের  তিরিশটি বাছাই গদ্যের মলাটবদ্ধ সংকলন “বিচিত্র ভাবনা ও টুকরো স্মৃতি” বইটি। আত্মজৈবনিক কথকতা, নিজের টুকরো স্মৃতি, সমাজ ভাবনা, সমস্যা ও সংকটের  মনোসামাজিক ব্যবচ্ছেদ ও জীবনের নানা সঙ্গ-অনুসঙ্গ নিয়ে কলম ধরেছেন তিনি। এই বিপুলা পৃথিবীতে লেখক চলতে চলতে যা দেখেছেন, দেখতে দেখতে যা ভেবেছেন তাই তুলে ধরেছেন তাঁর বয়ানে। সময়-সমাজের বৈচিত্র্য, জীবনের আশা-দূরাশার রকমফের ও স্মৃতি-বিস্মৃতির অবগাহনে জীবনের চিত্র এঁকেছেন হরফের ভাষায়, কাগজের পটে। ভ্রমণ কথা, গল্পও লিখেছেন তিনি। তাঁর সহজ-সরস গদ্য, ভাষার প্রাঞ্জলতা, বর্ণণার ধ্রুপদি ঢঙ পাঠককে আকৃষ্ট করবেই।  গতিময় বয়ানভঙ্গি, নিটোল বাক্য পাঠককে যেন হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যায় লেখকের সাথে সাথে জীবনের পথে প্রান্তরে। সরস শব্দ ও শব্দজুটির প্রয়োগ এক ধরনের প্রণোদনা সৃষ্টি করে পাঠক মনে। যা  একজন পাঠক হিসেবে আমি খুব উপভোগ করেছি।
গ্রন্থের প্রথম লেখাটি একটি স্মৃতিগদ্য যার শিরোনাম “চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়: টুকরো স্মৃতি”। লেখক যে অতীত সচেতন ও প্রখর স্মৃতির অধিকারী এর দেখা মিলে গদ্যটিতে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের একুশতম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রজীবনের স্মৃতিচূর্ণ ও বন্ধুত্বের প্রগাঢ় অবগাহনের কথা শুনতে পাই তাঁর কথায়। বন্ধুদের লেখা ছোট ছোট কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন তিনি। যা লেখাটিতে অন্যরকম একটি স্বাদ এনে দিয়েছে।
মহাপুরুষদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি যা দেখেছেন যা শিখেছেন- তাঁর কিছুটা আলোকপাত করেছেন তাঁর গ্রন্থে। প্রফেসর সৈয়দ মহিব উদ্দিন, প্রফেসর মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, প্রফেসর ডা. মো. আজিজুর রহমান, প্রফেসর হায়াত হোসেন, প্রফেসর নুরুল গণি, প্রফেসর মো. আবু তৈয়বসহ গুণীজনদের সাহচর্যের কথা লেখক গল্পচ্ছলে বলেছেন আমাদের। তাঁদের মহানুভবতা, চরিত্রের সৌন্দর্যতা, জীবনাচরণের সৌষ্ঠব, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবনার নির্যাস অতি সংক্ষেপে অথচ গভীরভাবে উপস্থাপন করেছেন পাঠকের কাছে।  লেখক তাদের  ঋণ স্বীকারে কুন্ঠাবোধ করেননি। নিজের প্রাপ্তির কথা বলেছেন অকপটে। মহান ব্যাক্তিদের সান্নিধ্যে লেখক কী পেয়েছেন, কী দেখেছেন আর কী অর্জন করেছেন তা কৃতজ্ঞকন্ঠে লিখেছেন সৈয়দ ছলিম।
প্রফেসর সৈয়দ মহিব উদ্দিনও  প্রফেসর মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কথা লিখতে গিয়ে- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন- বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ-প্রতিবেশ যা একজন পাঠককে বিশ^বিদ্যলয় সম্পর্কে ভালো একটি ধারণা লাভ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।  সেই সাথে লেখকের কর্মজীবনের খানিক অভিজ্ঞতাও পাঠকের সামনে উপস্থাপিত হয়।
তিনি হূমায়ুন আহমেদের একনিষ্ঠ পাঠক, তার সাথে দেখাও হয়েছে দুয়েকবার। যা লেখকের স্মৃতিভা-ারকে সমৃদ্ধ করেছে। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হূমায়ুন আহমেদকে নিয়ে লিখেছেন স্মৃতিবহ ও মূল্যায়নধর্মী একটি গদ্য।  যাতে লেখক সৈয়দ ছলিম  মোহাম্মদ আব্দুল কাদিরের পাঠকসত্ত্বা ও সাহিত্যিক বিচারবোধের একটি পরিচয় পাওয়া যায়। প্রাজ্ঞ সমালোচকের মতো তিনি হূমায়ুনকে নিয়ে লিখেছেন বেশ সচেতনভাবে, আবেগি ভাষায়। তিনি বর্তমান কথাসাহিত্যে হূমায়ুনের প্রভাব ও অবদানের কথা বলতে গিয়ে লিখেনÑ
একসময় কলকাতাকেন্দ্রিক লেখকদের যে দোর্দ-প্রতাপ ছিল, তাতে দৃশ্যমানভাবেই আঘাত হানতে সক্ষম হন হূমায়ুন আহমেদ। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্ম দিয়ে এ আঘাত হানেন। স্বতন্ত্র ধারা বজায় রেখে পাঠক হৃদয় তিনি জয় করেন।  তাঁর বই দেশে বিদেশে সাড়া জাগায়। তিনি তাঁর সাহিত্য, নাটক, সিনেমার জন্য পেলেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা । আমরাও পেলাম দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনকারী এক অনন্য সাহিত্যিককে।
তাঁর স্বচ্ছ ভাবনা, সমস্যার বিশদ বিশ্লেষণ, সংকটের  ব্যবচ্ছেদ ও তার উত্তরণের উপায় নিয়ে লেখকের চিন্তা সত্যিই অনন্য। তাঁর চিন্তায় প্রসারতা আছে, ভাবনায় আছে প্রগাঢ়তা ফলে তিনি  যে সমস্যা-সংকট-বিড়ম্বনা-নিয়ে ভেবেছেন তার সুরাহার একটি পথও খুঁেজেছেন যা তাঁর লেখক সত্ত্বাকে একটি বিশালত্ব দান করেছে। তিনি লিখেছেন অটিজম নিয়ে, আত্মহত্যা নিয়ে, ক্রেডিট কার্ডের মায়াজাল ও বিড়ম্বনা নিয়ে। প্রবাসী সিলেটিদের স্বúœ, দুঃখগাঁথা ইত্যাদির একটি বাস্তব চিত্র এঁকেছেন সুনিপুণ শিল্পীর মতো। ফ্ল্যাট কেনা ও শেয়ারবাজার বিষয়ক অভিজ্ঞতার কথাও রসিক জবানে শুনিয়েছেন পাঠককে।
অটিজম নিয়ে তাঁর লেখাটি একদম সময়োপযোগী। তিনি অটিজম নিয়ে মানুষের কুসংস্কার ও অবান্তর ভাবনাকে ব্যাখ্যা করেছেন মনোসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে।  তাছাড়া সন্তানের সকল ধরনের অনিষ্ঠের জন্য যে মাকে দায়ী করা হয়- এসব কথা তুলে ধরে এর প্রতিকার নিয়ে ভেবেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়-
 তাছাড়া সমাজে সন্তানদের কোন কিছু হলেই মা’দের দোষ দেয়ার প্রবণতা চালু আছে। প্রকৃতপক্ষে অটিজম পুরোপুরি জেনেটিক কারণে নয়, চারপাশের অনেক কিছুই এর জন্য দায়ী।
সিলেটের বিশাল জনগোষ্ঠী প্রবাসী। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান অনেক। তিনি সিলেটেী প্রবাসীদের সমস্যা ও সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকতা টেনেছেন রবার্ট লিন্ডসে থেকে বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত । প্রবাসী সম্পর্কে লেখক বঙ্গবন্ধুর যে  মূল্যায়নের উপস্থাপন করেছেন তা প্রবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি লিখেছেনÑ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইংল্যান্ড প্রবাসী সিলেটিদের সম্পর্কে বলতেন- সিলেটিরা আমার ‘দূর্দিনের বন্ধ’ু । তিনি বলেন আমি কোনদিন সিলেটীদের ঋণ শোধ করতে পারব না। এরাইতো আমার জন্য ইংরেজ ব্যারিস্টার পাঠায়।  যে দিন আইয়ূবের বিরুদ্ধে কেউ একটি কথা বলতে পারছিল না সে দিন প্রবাসীরা লন্ডনে আইয়ূবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। মাওলানা ভাসানীকে, সোহরাওয়ার্দী সাহেবেকে দীর্ঘদিন এরা স-সম্মানে রেখেছে লন্ডনে। আর এবারে তারা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
রোহিঙ্গাদের দূর্দশা, গণহত্যা ও করুণ পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক । তাদের উত্তরণের উপায় নিয়ে  ভেবেছেন তিনি। তিনি বলছেন- এ নির্যাতন যেন থামছে না। এজন্য মায়নমার সরকারের বিরুদ্ধে বিশ^জনমত গড়ে তুলতে হবে। কারণ বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সমস্যা দিন দিন প্রকট হবে।
ধর্মীয় উৎসব । আচার-ব্যবহার। উৎসবের একাল সেকাল ইত্যাদি নিয়ে লেখকের স্মৃতি চারণ পাঠককে আন্দোলিত করবে। অতীতকে এনেছেন বেশ জীবন্ত করে। পড়তে পড়তে মনে হবে সময়ের সাঁকোপথে পাঠকও ঘুরে আসছেন লেখকের অতীত। ঈদ উৎসব: একাল-সেকাল ও স্বাগতম মাহে রমজান পাঠকদেরকে অতীতের মধুর স্মৃতিকে অবশ্য নাড়া দেবে।  যেমনÑ
আমদের সকলেরই ছোটবেলায় রোজা রাখাকে কেন্দ্র করে অনেক মজার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ছোটবেলা তো রোজা রাখার জন্য রীতিমত ছোটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। আমিও এর ব্যতিক্রম নই । ঠিক কত বৎসর থেকে রোজা রাখা শুরু করেছি তা এখন আর মনে করতে পারছি না  তবে ছোটবেলায় রোজা রাখায় অন্যরকম মজা ছিল। কেউ কেউ তখন কলসীতে রোজা রেখে ভাত খেয়ে আবার রোজা রাখত । এতে রোজা ভেঙ্গে গেল  কিনা  তা ভাবার বয়স ছিল না।
অনবদ্য এই গদ্যের বইটিতে রয়েছে মানবিক সম্পর্কের রসায়ন, বন্ধুত্বের অবগাহন, বিচ্ছেদ-বিরহের কথামালা। আছে কলকাতা  ভ্রমণ নামে  একটি ভ্রমণকাহিনী ও কবিতার কলাপাতা প্রেম  শিরোনমে একটি ছোটগল্প। আশা করি সুখপাঠ্য এ বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে।
১২৮ পৃষ্ঠার এ বইটির প্রচ্ছদ করেছেন-দেওয়ান আতিকুর রহমান। উন্নত মুদ্রণ ও মানসম্মত বাঁধাইয়ে বইটি বাজারে এনেছে চৈতন্য । মূল্য ধরা হয়েছে ২৫০ টাকা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT