একই সাথে দুই কানের পর্দা জোড়া লাগানোর অপারেশন

ডাঃ নূরুল হুদা নাঈম
কান মানব দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শোনা এবং শরীরের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি কান আমাদের সৌন্দর্য্য বর্ধন করে। আমাদের কানের তিনটি অংশ রয়েছে-(১) বহিঃ কর্ণ (২) মধ্যকর্ণ ও (৩) অন্তঃকর্ণ। বহিঃ কর্ণ ও মধ্য কর্ণের মধ্যে একটি তিন লেয়ারের পর্দা থাকে যার নাম টিম্পেনিক মেমব্রেইন বা কানের পর্দা। এটাকে আমরা বাসার ছাদের সাথে তুলনা করতে পারি। বাইরের লেয়ার স্কীন, ভিতরের লেয়ার মিউকাস ও মধ্যের লেয়ার ফাইব্রাস যা মাকড়শার জালের মতো থাকে এবং বাহিরের ও ভিতরের লেয়ারকে সাপোর্ট দেয়। যেমনটা ছাদের ইঞ্জিনিয়ারিং এ আমরা মধ্যখানে রড ব্যবহার করি।
এবার আসি মাইরিংগোপ্লাস্টি সম্পর্কে, আসলে এটি হচ্ছে কানের পর্দায় কোন কারণে ছিদ্র হয়ে গেলে যা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে নিজ থেকে জোড়া না লাগলে অপারেশনের মধ্যেমে জোড়া দেয়ার অপারেশন। টিম্পেনোপ্লাস্টির সাথে এর তফাৎ হচ্ছে, এখানে শুধুমাত্র কানের পর্দাটাই জোড়া লাগানো হয় মধ্যকর্নের হাড় গুলোতে কিছু করা হয়না।
কেন এই অপারেশন করাবেন?
যাদের ছোট বেলা থেকে কানে পুঁজ বা পানি আসার কারণে কানের পর্দায় স্থায়ী ছিদ্র থেকে যায় বা পরবর্তীতে আঘাত বা এক্সিডেন্টের কারণে পর্দায় ছিদ্র হয়ে যায়, তাদের মাঝে মধ্যেই কান দিয়ে পুঁজ, পানি আসতে পারে এবং এক্ষেত্রে রোগীর কানে কমশোনার ও সমস্যা থাকে। বার বার ইনফেকশনের ফলে শোনার আরো অবনতি ঘটে। এমনক্ষেত্রে শুধুমাত্র কানের পর্দাটা জোড়া লাগিয়ে দিলেই হয়ে যায়। এতে কান স্থায়ীভাবে শুকনো থাকে এবং শোনারও কিছুটা উন্নতি হয়।
অপারেশনের আগে কি করবেন?
কানের পর্দায় ছিদ্র আছে এমন রোগীদের বেলায় অপারেশনের পূর্বে কানটাকে পুরোপুরি শুকনো করে নিতে হবে। বলা হয়ে থাকে কমপক্ষে ৩ সপ্তাহ ঔষধ ছাড়া শুধুমাত্র নিয়ম মেনে কান শুকনো থাকলে মাইরিংগোপ্লাস্টি করা যায়। অনেক সময় এলার্জি জনিত কারণে কান কোনভাবেই শুকায় না। সেক্ষেত্রে এলার্জিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অপারেশনটি করতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে নাকের হাড়, পলিপ, গলায় টনসিল বা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এডিনয়েডের অপারেশন আগে করে নিতে হয়। কানের ছিদ্র বন্ধের জন্য এই অপারেশনে সাধারণত কানের উপর থেকে টেম্পোরালিস ফাসা বা কানের সামনের ট্রেগাস থেকে পেরিকন্ড্রিয়াম বা কার্টিলেজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আকারের উপর নির্ভর করে কানের পর্দার ছিদ্র তিন প্রকার-ছোট, মাঝারী এবং বড়। কানের ক্যানেলের আকার অনুযায়ী ক্যানেলের ভিতর দিয়ে, কানের পিছনে কেটে অথবা সামনের দিকে কেটে এই অপারেশন করা যায়। মাইক্রোস্কোপ, লোপ অথবা এন্ডোস্কোপ এর সাহায্যে এ অপারেশন করা হয়ে থাকে। সাধারণত সম্পূর্ণ অজ্ঞান করা হয়না কেবল বাচ্চা বা নন কো-অপারেটিভ রোগীদের বেলায় অজ্ঞান করার প্রয়োজন পড়ে। কোন রোগীর দুই কানের পর্দায় ছিদ্র থাকলে বিশ্বজোড়ে অপারেশনটি এক কানের অন্তত; দেড়মাস পর অন্য কানের অপারেশন করার নিয়ম প্রচলিত। সম্প্রতি কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে একসাথে দুইকানের পর্দা জোড়া লাগানো সম্ভব। একটা কানের উপর থেকে একটু বেশি পরিমাণে টেম্পোরালিস ফাসা গ্রাফট নিয়ে অপজিট কানে না কেটে কানের ক্যানেল ও পর্দার ছিদ্রের ভিতর দিয়ে জোড়া দেয়া সম্ভব। বিগত ২০১০ সাল থেকে শুরু করা একটা স্টাডিতে আমরা এর সুফল পেয়েছি। ৩০ জন রোগীর মোট ৬০ টি কানে আমরা এই পদ্ধতিতে অপারেশন করে ৯০ ভাগ সফলতা অর্জন করতে পেরেছি। যা আমাদের ওসমানী মেডিকেল টিচার্স এসোসিয়েশন জার্নালের জানুয়ারী ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সীমিত হলেও এখন ইন্টারনেটে কিছু আর্টিকেল পাওয়া যায় যা ঐ সময়ে আসতো না এবং এটা এখন স্বীকৃত যে, দুই কানের পর্দা একই সাথে জোড়া লাগানো সম্ভব।
আসুন জন্মদিনে একটি ভালো কাজ করি। এ স্লোগানকে সামনে রেখে সিলেটে এনজেএল ইএনটি সেন্টার ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ ডিসেম্বরকে টিম্পেনোপ্লাস্টি ডে হিসেবে পালন করে আসছে। প্রতি বছর এই দিনে ১০ জন গরীব রোগীকে এ অপারেশন করে দেওয়া হয়।