করোনাকালেও সিলেটে হত্যাকান্ড থেমে নেই

গেল বছর ২৬৪ হত্যার ঘটনা ॥ সর্বোচ্চ হবিগঞ্জ জেলায় 

কাউসার চৌধুরী::
করোনাকালেও সিলেটে হত্যাকান্ডের ঘটনা থেমে নেই। সিলেট বিভাগের চার জেলায় গেল বছর ২৬৪ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আগের বছরের তুলনায় হত্যাকান্ড বেশি সংঘটিত হয়েছে ১৮টি। গত বছর কেবল হবিগঞ্জ জেলায়ই ঘটেছে ৮৮ হত্যাকান্ড।
পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, জমি-জমা নিয়ে পূর্ব বিরোধ, গাঁও-গেরামের মাতব্বরি নিয়ন্ত্রণের বিরোধ, অর্থনৈতিক ঝামেলা, পারিবারিক কলহ, প্রেম প্রত্যাখ্যান করা সহ নানা কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আবার অনেক আত্মহত্যার ঘটনাকে হত্যা মামলা হিসেবে ভিকটিমের স্বজনরা এজাহার দেন। তবে সবকটি ঘটনায় মামলার পাশাপাশি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
পুলিশ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) এলাকায় ২০২০ সালে ৩১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০১৯ সালে এসএমপি এলাকায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৩২টি। এ হিসেবে ২০১৯ সালের তুলনায় গেল বছর এসএমপিতে ১টি হত্যাকাণ্ড কমেছে। করোনাকালে এসএমপির ৬ থানায় এ সকল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে বলে এসএমপির মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের জানিয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট রেঞ্জ পুলিশ এলাকায় অর্থাৎ সিলেট বিভাগের ৪ জেলায় (এসএমপি ব্যতীত) গত বছর ২৩৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০১৯ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২১৪টি। ২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সালে সিলেট রেঞ্জে ১৯টি হত্যাকাণ্ড বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলায় গত বছর ৫৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর আগের বছর ২০১৯ সালে এর সংখ্যা ছিল ৬৬টি।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে সিলেট জেলায় ১১টি হত্যাকাণ্ড কমেছে। ২০২০ সালের তুলনায় সুনামগঞ্জ জেলায় ৪টি হত্যাকান্ড কমেছে। ২০২০ সালের ৪৮টি হত্যাকান্ডের বিপরীতে ২০১৯ সালে এ জেলায় হত্যার ঘটনা ঘটে ৫২টি। মৌলভীবাজার জেলায় ২০২০ সালে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ৪২টি। ২০১৯ সালে এ জেলায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৪৪টি। এক বছরে হত্যার ঘটনা কমেছে দুটি। হবিগঞ্জ জেলায় গেল বছর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় সর্বোচ্চ ৮৮টি। ২০১৯ সালে হবিগঞ্জ জেলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ৫২ জন। তুলনামূলকভাবে হবিগঞ্জ জেলায় ২০১৯ সালের তুলনায় গত বছর ৩৬টি হত্যাকাণ্ড বেড়েছে।
গত ২ বছরের হত্যাকান্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিলেট মহানগর, সিলেট জেলা, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় হত্যাকাণ্ড কমে এলেও শুধুমাত্র হবিগঞ্জ জেলায়ই হত্যার ঘটনা ঊর্ধ্বমুখী। হবিগঞ্জে খুনের বাড়তি সংখ্যাই সিলেট অঞ্চলের হত্যাকান্ডের ঘটনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
সূত্র জানায়, সিলেট বিভাগের ৪ জেলার মোট জনসংখ্যা ৯৮ লাখ ৭ হাজার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকদের সেবার জন্যে রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের ৫০টি থানা। সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) এলাকায় ৬টি ও সিলেট রেঞ্জের আওতায় ৪ জেলায় রয়েছে ৪৪টি থানা। এর বাইরে পুলিশ তদন্তকেন্দ্র এবং পুলিশ ফাঁড়িও রয়েছে।
সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো: জেদান আল মুসা সিলেটের ডাককে বলেছেন, বিভিন্ন ঘটনায় এ সকল ব্যক্তি খুন হন। সবক’টি ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ ঘাতকদের গ্রেফতারের পাশাপাশি বিচারের মুখোমুখিও করছে বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।
সিলেট মহানগর পুলিশ এসএমপি’র মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের বলেন, সামান্য বিষয়েও হত্যাকাণ্ড ঘটে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার আগে জানালে পুলিশ বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ নেয়। তিনি জানান, সকল হত্যাকাণ্ডেরই পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। আসামীদের গ্রেফতারও করেছে।
হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লাহ (পিপিএম) সিলেটের ডাককে জানান, নানা কারণে হবিগঞ্জে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। যেমন করোনাকালে অনেকে অবসর সময়ে পারিবারিক সহিংসতায় লিপ্ত হয়। কিছু আত্মহত্যার ঘটনায়ও হত্যা মামলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশেও হত্যা মামলা রেকর্ড করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার এগুলোই মূল কারণ।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা গ্রাম-গঞ্জে সচেতনতামূলক সভা করেছি। খবর পেয়েই পুলিশ জনগণের পাশে চলে যায়। আগামীতে অবশ্যই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমে আসবে। এ জন্যে পুলিশ মাঠে কাজ করছে।
সুশাসনের জন্যে নাগরিক সুজন’র সিলেট জেলা সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার ফলেই হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। ঘটনার প্রকৃত তদন্ত, সঠিক অভিযোগপত্র আদালতে উপস্থাপন, রাষ্ট্রপক্ষের যথাযথ ভূমিকা থাকলে অপরাধীকে সাজা পেতেই হবে। কিন্তু, আইনের মারপ্যাঁচে অনেক হত্যাকারী জেল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে-মামলা থেকে খালাস পাচ্ছে। এসব দিক লক্ষ্য রেখেই ব্যবস্থা নিলে সমাজ উপকৃত হবে। তিনি সর্বত্র সচেতনতা বৃদ্ধিরও আহ্বান জানান।