কামরানবিহীন সাড়ে ৬ মাস সুনসান নিরব ছড়ারপাড়ের বৈঠকখানা

সাঈদ নোমান::
সিলেট নগরীর সুগন্ধা ছড়ারপাড়ে ৬৫ নম্বর সাদা রঙের দু’তলা বাসা। বাসাটিতে প্রবেশ করেই বাম দিকে রয়েছে একটি বৈঠকখানা। এক সময় এ বৈঠকখানা মানুষের কোলাহলে মুখরিত ছিলো। শ্রমিক, পেশাজীবী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের ছুটে যেতেন এ বৈঠকখানায়। বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, সহযোগিতা, সহমর্মিতার উষ্ণ ভালোবাসা নিয়ে ফিরতেন এখান থেকে। এই বৈঠকখানার মধ্যমণি ছিলেন সিলেটের মানুষের নয়নমণি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।
সদা হাস্যোজ্জ্বল, মাথায় সাদা টুপি, মুখে কালো গোঁফ, চোখে সাদা চশমা, পাঞ্জাবী-পায়জামা পরা ধীরস্থির প্রকৃতির ‘জনতার কামরান’ নগরবাসীর যেকোনো সমস্যায় ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হতেন। একটা সমাধান করে আসতেন। তিনি ছিলেন নগরবাসীর বিপদের আশ্রয়স্থল।
প্রায় সাড়ে ৬ মাস হলো বদর উদ্দিন আহমদ কামরান নেই। গতকাল রোববার তার ছড়ারপারের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বৈঠকখানাটি সুনসান নিরব। তার বসার চেয়ারটি শূন্য পড়ে আছে। শোকেসে স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে উপহার হিসেবে পাওয়া অসংখ্য ক্রেস্ট। নীচ তলার বৈঠকখানার দেয়ালসহ উপরতলায় ওঠার সিঁড়ির দেয়ালের স্থানে স্থানে বাঁধাই করা রয়েছে অসংখ্য ছবি। প্রতিটি ছবিতেই দেশ বিদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের সাথে হাস্যোজ্জ¦ল কামরানের ছবি শোভা পাচ্ছে। সিলেটের কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক কামরান ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসে শহর, নগর ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন দীর্ঘদিন।
মাত্র ২২ বছর বয়সে জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার সযোগ পান তিনি। খোলা মন, সরল প্রকৃতির অমায়িক ব্যবহার দিয়ে তিনি জয় করে নেন সাধারণ জনগণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের হৃদয়। একসময় বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন আর জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার কর্মজীবন দিয়ে তিনি হয়ে উঠেন জনতার কামরান। তারা জানান, সিলেটবাসীর সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে উঠা গণমানুষের নেতা কামরান সশরীরে না থাকলেও তিনি জীবদ্দশায় মানুষের যে ভালোবাসা ক্ুড়িয়েছেন , তা কখনও ফুরিয়ে যাবার নয়।
বদর উদ্দিন আহমদ কামরান স্ত্রী আসমা কামরান, দুই ছেলে ও ১ মেয়ে রেখে গেছেন। তার জ্যেষ্ঠ ছেলে ডা. আরমান আহমদ শিপলু সিলেটের ডাককে জানান, মার্চ মাসে করোনা এবং লকডাউনের পর তার পিতা ঘরে বসে থাকেননি। ঘরবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ ও সাহায্য বিতরণে তিনি নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়িয়েছেন। সর্বশেষ ঈদুল ফিতরের দিন বাসায় বড় আকারে কুরমা পোলাও তৈরী করে দিনভর মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছেন। এরপর ২৭ মে আসমা কামরানের করোনা শনাক্ত হয়। আসমা কামরান বাসায় আইসোলোশনে থাকাবস্থায় ৫ জুন করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের। পরদিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখান থেকে ৭ জুন তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল বা সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ জুন ভোর রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিলো ৬৯ বছর।
গতকাল রোববার বাসায় গিয়ে কামরানের স্ত্রী আসমা কামরানের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সিলেট মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের এ সভানেত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে আর ঘর থেকে বের হতে দেখা যায়নি। স্বামীর শোকে শরীর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে দুর্বল হয়ে গেছেন আসমা কামরান। স্বামী সম্পর্কে তিনি কোনো কথা বলতে পারেননি।
ছেলে আরমান আহমদ শিপলু বলেন, তার পিতা বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সাথে সিলেট নগরের মাটি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্ক ছিলো। সুখে-দুঃখে নগরবাসীর পাশে থেকেই জীবন কাটিয়েছেন তিনি। তাই পিতার অবর্তমানে সিলেটের মানুষের মধ্যেই তিনি তার পিতার প্রতিচ্ছবি দেখতে পান।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। শিক্ষাজীবনের শুরু হয় শহরের জিন্দাবাজারের দুর্গাকুমার পাঠশালায়। এরপর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া অবস্থায় ১৯৭৩ সালে সিলেট পৌরসভার ভোটে ৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশানর পদে দাঁড়ান তিনি। নির্বাচনে ৬৪২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে সর্বকনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার অভিষেক হয়। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে কামরান এমসি কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব সামলে সব সময় ক্লাস করা কামরানের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে তাই কামরানকে কলেজ পরিবর্তন করতে হয়। সিলেটের মদন মোহন কলেজ থেকে ১৯৭৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি পাস করেন তিনি। এরপর ১৫ বছর পৌর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কামরান। মাঝে কিছুদিন বিদেশে থাকায় একবার তার নির্বাচন করা হয়নি। বিদেশ থেকে ফিরে এসে ১৯৯৫ সালে তিনি সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
২০০২ সালে সিলেট পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর কামরান মেয়র মনোনীত হন। ২০০৩ সালে সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে জিতে মেয়র পদ ধরে রাখেন তিনি। ২০০৭-২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুই দফা গ্রেফতার হয়ে ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন কামরান। সে সময় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই আওয়ামী লীগ নেতা কারাগারে থেকে নির্বাচন করেও বিপুল ভোটে জয়ী হন। ২০০৩ সালে থেকে টানা ১০ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করে ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে মেয়র পদ হারান কামরান। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি লড়েছিলেন, কিন্তু জয়ী হতে পারেননি।
ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে আসা কামরান জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমানভাবে রাজনীতিতেও সক্রিয় এবং জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে সিলেট শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০২ সালে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন কামরান। সেই দায়িত্ব তিনি সামলেছেন প্রায় দেড় যুগ। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদ পান কামরান। বর্তমান কমিটিতেও একই পদে ছিলেন তিনি।