কিশোরগ্যাং ও অভিভাবকের দায়

মো. আব্দুল ওদুদ
কিশোররা দেশের প্রাণশক্তি, তারা বহুবিদ শক্তির অধিকারী। তাদের মধ্যে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। চলার পথে কিশোরদের রয়েছে অনেক বাধা বিপত্তি। সেই বাধা বিপত্তি তাদের অতিক্রম করতে না পারলে তারা বিপথগামী হবে। সব বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে পারলেই দেশ জাতির উন্নয়নের অবদান রাখতে পারবে।
অপ্রিয় হলেও সত্য, অধিকাংশ কিশোর বিপথগামী এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ কাজের সঙ্গে জড়িত। তারা সন্ত্রাস চাঁদাবাজী, চোরাকারবারী, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদকদ্রব্য চালান, মাদক সেবক, খুন, রাহাজানি, জুয়া খেলার সাথে জড়িত। কিশোর গ্যাং বর্তমানে আমাদের দেশে সর্বপর্যায়ে সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। কিশোর গ্যাং এর অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের আশ্রয় পশ্রয়ে থাকায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিত ব্যাপক ভাবে অবনতি হচ্ছে এবং বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে’জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মানুষকে সার্বিক ভাবে লালন পালন করা মা বাবা ও রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রিয় ব্যবস্থাপনা সঠিক ভাবে কিশোর সমাজ বিকশিত হতে পারলে সে অবশ্যই সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। সুনাগরিকদের মাধ্যমে দেশে সুশাসন গড়ে উঠবে।
রাষ্ট্রিয়ভাবে আমাদের দেশে কিশোর অপরাধ সংশোধনাগার আছে। এসব প্রতিষ্ঠান সঠিক ভাবে কাজ না করায় অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ সংশোধনের পরিবর্তে কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি যশোর কিশোর অপরাধ সংশোধনাগারে এক কিশোরকে দৈহিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনের কারণে সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি প্রমান পেয়েছেন হত্যাকান্ডের সাথে সংশোধনাগারের কর্মকর্তা কর্মচারীরাই জড়িত।
কিশোরদেরকে যদি সঠিক পথে ও দেশের উন্নয়নের পথে আনা যায় স্বপ্ন দেখানো যায় তাহলে দেশের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ হয়ে তারাই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারবে। এজন্য প্রয়োজন তৃণমূল থেকে তাদেরকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে গড়ে তোলা। তার জন্য প্রয়োজন খারাপ কাজ হতে তাদেরকে বিরত রাখা। এদেশের কিশোরদের সঠিক নেতৃত্বে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তৃমুল পর্যায় থেকে সৎ দক্ষ ও মেধাবীদের গুরুত্ব দেওয়া রাজনীতিবিদদের উচিত। বর্তমান সমাজে কিশোর গ্যাং ও কিশোর ক্লাব দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা ইন্টারনেট ও পারিপার্শ্বিকতায় প্রভাবিত হয়ে নিজের ও বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং ও ক্লাব গড়ে তুলছে এবং খারাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছে। এ সব গ্যাং ও ক্লাবের সাথে জড়িত কিশোরদের কে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে না পারলে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে। অথচ সামাজিকভাবে আমরা এসব গ্যাং ও ক্লাসের খারাপ কর্মকান্ডকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করছি না। যার ফলে সমগ্র দেশে দ্রুত গতিতে কিশোররা অপরাধ জনিত কর্মকান্ডের সহিত জড়িয়ে পড়ছে।
স্বাভাবিকভাবে কিশোররাই আগামীতে জাতির নেতৃত্ব দিবে। কিশোরদের যে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা রয়েছে বর্তমান পরিবর্তিত পৃথিবীতে তাদের এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে। একটি সুখী সুন্দর শোষহীন অপরাধমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে অবশ্যই তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। সব ধরনের বাধা বিপত্তিকে মোকাবিলা করে কিশোররা যদি দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে সর্বাবস্থায় চেষ্টা করে তাহলে দেশকে উন্নতির দিকে, সমৃদ্ধির দিকে, প্রগতির দিকে নিয়ে যেতে অবশ্যই সহায়ক হবে।
বর্তমান পৃথিবীতে বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। গুনে ধরা সমাজের পরিবর্তনই নতুন যুগের লক্ষ্য। ব্যাপক পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন যুগের ভাল সমৃদ্ধশালী সমাজ গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য সমাজ কাঠামো অবশ্যই দরকার। সেদিক বিবেচনায় রেখে কিশোরদের কে এগিয়ে যেতে হবে। কিশোরদের শক্তির বিনাশ নেই। কিশোর শক্তি দূর্বার। তাদের চলার গতি সব সময় সামনের দিকে। মূল কথা হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য ভাল কিছু করে যেতে হবে। চলার পথে অনেক বাধা থাকবে সব বাধাকে অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হবে। জীবনে দুঃখ আছে সংঘাত আছে এমনকি ব্যর্থতা রয়েছে। তারপরও সেটাই জীবনের শেষ কথা নয়। কিশোররা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ব্যর্থতা জয় করেছে এবং জয় করবে। আজকের কিশোররা সজীব সম্ভবনাময় বিরাট প্রাণ শক্তির অধিকারী। তারা পরাজয় মানেনা, মানবেও না। দিন দিন কিশোররা সচেতন হচ্ছে। সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নও দেখছে। সাহসীকতার সহিত নতুন উদ্যোমে কিশোরাই নতুন পৃথিবী গড়ার আশা রাখছে।
কিশোর জাতি গঠনে মূল প্রাণ শক্তি। তারা সত্যিকার অর্থে দেশের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। স্বাধীনতা সংগ্রামের যুদ্ধে সেই দিকটিই প্রমাণিত হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে দেশটি আমরা পেয়েছি সে দেশকে সােনার বাংলায় পরিণত করতে হলে আগে কিশোরদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও দেশ গঠনে জাতিকে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সৎ, সাহসী, গুণাবলি অর্জন করতে হবে আজকের কিশোর শক্তিকে। কারণ আজকের কিশোররাই যে কোন জাতির সেরা সম্পদ। আমাদের সমাজ ও দেশের জাতীয় সমস্যা সমাধানে কিশোররা সামনের সারিতে থাকবে এই প্রত্যাশা সভার। এজন্য তাদের অজ্ঞতা কাটিয়ে উঠে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে সন্ত্রাসী মাদক জঙ্গিবাদ দুর্বৃত্তের পথ পরিহার করে সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নিজেদের তৈরী করতে হবে। অধিকাংশ রাজনীতিবিদরা যা করতে পারেন না। এদেশের কিশোররা তা করতে সক্ষম। রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন কর্মসূচী বিভিন্ন সময়ে ঘােষনা করে থাকেন। আর তা বাস্তবায়ন করে ছাত্র যুবক ও কিশোররা।
বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে সঠিক দিক নির্দেশনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের নিতে হবে। আমরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। সারা বিশ্ব বদলে যাচ্ছে পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে আমাদের দেশকে বর্তমানে এগিয়ে নেওয়ার কারণে অনেক দেশই আমাদের অনুস্মরণ করছে। আমরা অতিতের দিক দিয়ে নজর দিলে দেখতে পাবাে সব দেশেই কিশোররা সমাজের পরিবর্তন ঘটাতে উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। কিশোরদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে যেতে হবে। সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে কোন বাধাই তাদেরকে পিছনের দিকে নিয়ে যেতে পারবে। দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি বর্হিবিশ্বে উজ্জ্বল থেকে আরো উজ্জ্বল হবে।
ইদানিং কারণে অকারণে চলছে খুন, রাহাজানি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ সহ বিভিন্ন অমানবিক কার্যকলাপ। এই সমস্ত কর্মকান্ডের সহিত কিশোর গ্যাং বাহিনীও জড়িত। এহেন অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার বাহাদুরকে নিতে হবে কঠোর আইনী ব্যবস্থা। শিক্ষাই আলো, শিক্ষাই শক্তি। মানব শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর মাতাই হলেন তার প্রধান শিক্ষক। প্রথমেই মায়ের মাধ্যমেই শিশুটি সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়। একজন মাতা যে দরদ ও মায়া মমতা দিয়ে তার সন্তানদের শারীরিক ও মানষিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন, দেশের অন্য কোন মানুষ দিয়ে সে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। শিশু কালে ঘরের শিক্ষা কিশোর জীবন কে প্রভাবিত করে। মাতৃ, পিত্ব, দেশ, স্নেহ বঞ্চিত শিশুরাই কিশোর কালে সহজেই বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সে কারণে সরকারের পাশাপাশি কিশোর অপরাধ দমন করতে পারিবারিকভাবে মা বাবার বিশেষ ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে। নেটওয়ার্ক সমগ্র পৃথিবীর মানব সমাজকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে।
আমাদের দেশের কিশোররাও ইন্টারনেটের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারছেন না। ইন্টারনেটের প্রভাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিশোররা অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ছে। অতিব সম্ভাবনাময় এসব কিশোরকে ভাল পথে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন পারিবারিক সামাজিক সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। একটি শিশু বেড়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে অভিভাবকদের রাখতে হবে বিশেষ নজর।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবীণ রাজনীতিবিদ।