জয়ীতা বীথিকা দত্ত স্মরণে

বিনয় ভূষণ তালুকদার::
বিরানব্বইয়ের কথা আমি তখন সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম বিবেকানন্দ বিদ্যার্থী ভবনের ছাত্র। সিলেট নগরীর মির্জাজাঙ্গালস্থ শ্রী যুক্তা বীথিকা দত্ত মহোদয়ার সুযোগ্য নেতৃত্বে সংগঠিত হচ্ছেন সিলেটের সারদা অনুরাগী মায়েরা। তাঁদের কিছু কাজে যুক্ত হয়ে বহুদিন বিমলানন্দ অনুভব করেছি আমি। তিনি ছিলেন বিনয় বিমান সহ দেশ বিদেশের অসংখ্য নুতন প্রজন্মের কাছে মাতৃস্থানীয়া। স্নেহও করতেন সন্তানবৎ।
মির্জাজাঙ্গাল নিবাসী তাঁর স্বামী প্রয়াত কামেশ রঞ্জন দত্ত ছিলেন সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের একজন একনিষ্ট ভক্ত। একমাত্র পুত্র চাকুরীজীবি কৃপাশংকর দত্ত পাপলু ও একমাত্র কন্যা অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত সুকন্যা দত্ত তন্বী। এই দুই কৃতিসন্তানের সফল জননী তিনি। নিজেকে শ্রীমা সারদা সংঘের পতাকাতলে সিলেটের সেবাব্রতীদের নিয়ে সত্য, সুন্দর ও আদর্শ জীবন গঠনে নিজেকে সমর্পিত করলেন।
আমার এই ক্ষুদ্র লেখক জীবনে দুটি বই বেরিয়েছে। দুটি প্রকাশনা উৎসবেই তিনি বিশেষ অতিথির সম্মানিত আসন অলংকৃত করে আমাকে প্রাণিত করেছেন। “শ্রীমন্ মহাপ্রভু স্মারক গ্রন্থ” এর প্রকাশনা উৎসবে ঢাকাদক্ষিণ মহাপ্রভুর বাড়িতে শ্রীমা সারদা সংঘের সকল সদস্যবৃন্দকে নিয়ে অতিথি হিসেবে যোগদান করে আমাদেরকে উৎসাহিত করেছিলেন। রামকৃষ্ণ মিশন বেলুড় মঠের অন্যতম গুরু স্বামী গহনানন্দজী মহারাজের স্মৃতিধন্য হবিগঞ্জের পাহাড়পুর শ্রীরামকৃষ্ণের নব-নির্মিত মন্দির উদ্বোধনেও তাঁর এবং শ্রীমা সারদা সংঘ সিলেটের সেবাব্রতী মা বোনদের অনন্য ভূমিকা ছিল। আমার এই ভেবে ভালো লাগছে যে, তিনি তাঁর সকল কাজে বিশেষ করে সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিত হতেন। সকল শুভ কাজে আমাদেরকে সঙ্গী হতে উৎসাহিত করতেন। তাঁর সদা হাস্যজ্জ্বোল মুখ ও স্নেহপরায়নতার জন্য কোন কারণেই বিমুখ হওয়া যেত না। মানুষকে আপন করে নেয়া ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। নুতন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের সাহিত্য সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সঙ্গে সম্মিলিত হওয়ার জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন শ্রীহট্টমাতার এই কৃতিসন্তান। শ্রী শ্রী ঠাকুর-মা- স্বামীজীকে ভালোবেসে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁদের আদর্শকে বাস্তবায়ন করার জন্য ছুটে গেছেন দেশ বিদেশের নানা প্রান্তে। তাই জীবন সায়াহ্নে এসে লাভ করলেন রাষ্ট্রীয় সম্মান জয়ীতা। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন সহ মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্ট থেকেও ধর্ম ও সমাজসেবায় সম্মাননা লাভ করেন। যদিও এসব তাঁর চিন্তাতে ছিলনা। শ্রী শ্রী মায়ের বাড়ীকে কেন্দ্র করে সিলেট তথা বাংলাদেশে যে নারী জাগরণ সংগঠিত হয়েছে তাঁর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন এই মহতপ্রাণ শ্রীমা ভক্ত।
গত ৪ জানুয়ারি সোমবার ৭৮ বছর জীবনের অবসান হলো তাঁর। কিন্তু যে কীর্তি করে গেলেন এই এক জীবনে তা কখনো ভুলব না আমরা। হয়তো তিনি আমাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়া ছিলেন না। কিন্তু স্নেহে ভালোবাসায় শ্রদ্ধায় কর্মে যাপিত জীবনে হয়ে উঠেছিলেন আমাদের সকলের মাসি, দিদি তথা অত্মার আত্মীয়। শ্রদ্ধেয়া বীথিকা মাসির বিদেহী আত্মা চিরশান্তি লাভ করবে এ শুভ প্রার্থনা পরম করুণাময়ের কাছে।
পরিশেষে যে মহৎ জীবন সম্পন্ন করে গেলেন আমাদের সকলের প্রিয় সমাজহিতৈষি বীথিকা দত্ত তাঁর স্মৃতিকে সমুজ্জ্বল রাখতে কবিগুরুর ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে-
“এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর!/ পুণ্য হল অঙ্গ মম, ধন্য হল অন্তর সুন্দর হে সুন্দর।/ আলোকে মোর চক্ষুদুটি মুগ্ধ হয়ে উঠল ফুটি,/ হৃদগগনে পবন হল সৌরভেতে মন্থর সুন্দর হে সুন্দর।/ এই তোমারি পরশরাগে চিত্ত হল রঞ্জিত,/ এই তোমারি মিলনসুধা রইল প্রাণে সঞ্চিত।/ তোমার মাঝে এমনি ক’রে নবীন করি লও যে মোরে/ এই জনমে ঘটালে মোর জন্ম-জন্মান্তর সুন্দর হে সুন্দর।”