ডা. মঈনের জন্য আজও কাঁদছেন এলাকাবাসী

করোনায় কেড়ে নেয়া দেশের প্রথম চিকিৎসক

সাঈদ নোমান::
সিলেট নগরী থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে সিলেট-সুনামগঞ্জ রোডে ছাতকের ধারণবাজার (নতুনবাজার)। এ বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরের গ্রাম নাদামপুর। প্রতি শুক্রবারে সিলেট নগরী থেকে কার্ডিওলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ একজন চিকিৎসক যেতেন ওই গ্রামে। স্টেথোস্কোপ,থার্মোমিটারের পাশাপাশি হাজার দশেক টাকা থাকতো তার ব্যাগে। আশপাশ গ্রাম থেকে ধনী-গরীব নির্বিশেষে রোগাক্রান্ত মানুষ তার কাছে আসতেন। দরিদ্র মানুষের হাতে ব্যবস্থাপত্রের সাথে ঔষধ কেনা ও বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর টাকা দিতেন। ‘গরীবের ডাক্তার’ হিসেবে এলাকার মানুষ তাকে সম্বোধন করতে থাকেন। এক সময় তার এই বিশেষণ ছাতক ছাড়িয়ে গোটা সিলেট অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মানবিক এই চিকিৎসকের নাম ডা. মো. মঈন উদ্দিন। তিনি ছিলেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
গত বছরের ১৫ এপ্রিল করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান মানবিক এই চিকিৎসক। ডা. মঈন উদ্দিন ছিলেন দেশে চিকিৎসকদের মধ্যে প্রথম এবং সিলেটে প্রথম করোনায় মৃত্যুবরণকারী।
ডা. মঈন উদ্দিনের সহকর্মী চিকিৎসকরা জানান, ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনারোগী শনাক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্যখাতের সম্মুখযোদ্ধাদের সুরক্ষা নিয়ে কথা উঠে। ভয় এবং আতঙ্কে অনেকেই মনোবল হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু ডা. মঈন উদ্দিনের মতো মানবিক চিকিৎসক ও সেবাদানকারীরা মনোবল হারাননি। তখন করোনার থাবা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সিলেটেও এ নিয়ে চরম আতঙ্ক। এই অবস্থায় ডা. মঈন উদ্দিন রোগীর সেবায় ছিলেন অবিচল। ক্লান্তিহীন সময় পার করেছেন ওসমানী হাসপাতালে রোগীর সেবায়। কিন্তু এরই মধ্যে ৫ এপ্রিল তার করোনা শনাক্ত হয়। ১০ দিন পর ১৫ এপ্রিল তিনি মারা যান।
সম্প্রতি ডা. মঈন উদ্দিনের পিতৃভূমি ছাতকের নাদামপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তিন ইঞ্চি ইটের গাথুনি করা, টিনের চৌচালা দুটি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে সামনের ঘরটি সংলগ্ন কবরে শুয়ে আছেন ডা. মঈন উদ্দিন। স্থানীয়রা জানান, এখানে প্রতি শুক্রবারে তিনি আসতেন। প্রতি শুক্রবারে আশপাশ গ্রামের মানুষের আগমনে ভরে যেতো বাড়ির আঙ্গিনা। অনেকে সহযোগিতা হিসেবে নগদ টাকাও ডাক্তারের কাছ থেকে নিতেন। তার মৃত্যুর পর আমাদের এলাকার অনেক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে রোগে শোকে কাতর দরিদ্র পীড়িত মানুষের আপনজন হিসেবে তিনি ছিলেন। স্থানীয়রা আরও জানান, বাড়িতে এখন আর কেউ থাকেন না। মাঝে মধ্যে ডা. মঈন উদ্দিনের স্ত্রী দুই ছেলেকে নিয়ে আসেন। কবর জিয়ারত করে কিছু সময় কাটিয়ে আবার চলে যান।
সিলেটেস্থ ছাতক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন বলেন, সিলেটে বসবাস করেন ছাতকের রোগীরা ডা. মঈন উদ্দিনের কাছে গেলে তিনি ফ্রি দেখে দিতেন। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষ কতো ফ্রি রোগী দেখিয়েছি তার কাছে। তিনি রোগী দেখে কথা বলেই বুঝতে পারতেন তার অর্থনৈতিক অবস্থা।
ছাতকের চলমহল্লা ইউনিয়নের নানকার গ্রামের সৈয়দ আহমদ বলেন, তিনি ডা. মঈন উদ্দিনের চেম্বারের এটেনড্যান্স হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট সম্মানীর বাইরে অনেক টাকা দিতেন। তিনি বলেন, শুধু রোগীদের সহযোগিতা নয়, অনেক শিক্ষার্থী প্রতি মাসে তার কাছ থেকে পড়ালেখার খরচ নিতেন।
খুরমা দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিল্লাল আহমদ বলেন, ডা. মঈন উদ্দিন এলাকায় অনেক সেবামূলক কাজ করেছেন। তিনি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পসহ সাধারণ দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবার জন্য নিবেদিত প্রাণ একজন মানুষ ছিলেন। এ রকম অসাম্প্রদায়িক উদার মনের মানুষ আমাদের সমাজে বিরল।
ডা: মঈন উদ্দিনের ছোট ভগ্নিপতি ও সিলেট পিটিআই’র সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর মো: খসরুজ্জামান জানান, আনন্দনিকেতনের ছাত্র ডা: মঈনের ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ মাহমুদ জায়ান (৮) এখনো তার বাবার জন্য কাঁদে। কিছুদিন আগে বাবার ব্যবহৃত শীতের স্যুয়েটার নিয়েও সে অনেক কেঁদেছে। স্যুয়েটার নিয়ে তার মন্তব্য ছিল এরূপ বাবা এলে স্যুয়টারটি পরতে পারতেন। পড়ালেখার প্রতি আন্তরিক জায়ান অনলাইনে রুটিন অনুযায়ী ক্লাসে অংশ নেয়। এমনকি হোমওয়ার্কও নিজে নিজে সেরে ফেলে। অটিস্টিক স্কুলের শিক্ষার্থী বড় ছেলে ফাইয়াজ মাহমুদ জিয়াদ (১৩) বাবার মৃত্যুর বিষয়টি এখনো জানে না। টিভি দেখে এবং গেম খেলে এখনো তার সময় কাটে। ডা: মঈন উদ্দিন ট্রাস্টের সদস্য সচিব খসরুজ্জামান আরো জানান, এখনো স্বামীর মৃত্যুর ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেননি ডা: মঈনের স্ত্রী ডা: চৌধুরী রিফাত জাহান। আক্রান্ত হবার পর থেকে ছায়ার মতো স্বামীর পাশে থাকা ডা: রিফাতের মধ্যে এখনো করোনা আতংক কাজ করে বলে জানান খসরুজ্জামান। দুই ছেলেকে সময় দেবার পাশাপাশি কর্মস্থলেও তার কিছুটা সময় কাটে বলে জানান তিনি।
ডা. মো: মঈন উদ্দিন ১৯৭৩ সালের ২ মে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নাদামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুল থেকে পাঠশালা পাশের পর তিনি ধারণ নতুন বাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি এবং ১৯৯০ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। একই বছর ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে ১৯৯৮ সালে কৃতিত্বের সাথে এমবিবিএস পাস করেন। এরপর তিনি এফসিপিএস ও এমডি কোর্স সম্পন্ন করেন।
২২তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ স্বাস্থ্য ক্যাডারে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের ২০ মে তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
ডা: মঈনুদ্দিনের স্ত্রী চৌধরী ডা: রিফাত জাহান সিলেটের বেসরকারি পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (চলতি দায়িত্ব)।
ডা. মঈন উদ্দিন সিলেটে করোনা যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা ছিলেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উদ্যোগে গঠিত সিলেট করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। এর আগে তিনি এ হাসপাতালের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটিসহ আরো কয়েকটি কমিটির দায়িত্ব পালন করেন।
গত ৫ এপ্রিল আইইডিসিআর থেকে তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। গত ৩০ মার্চ থেকে তিনি তার বাসায় কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ৭ এপ্রিল সিলেট নগরীর শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে করোনা আইসোলেশনে সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। ৮ এপ্রিল পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে এ্যম্বুলেন্সযোগে দ্রুত ঢাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউ(ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট)-এ নেয়া হয়। আইসিইউকে থাকা অবস্থায় ১৫ এপ্রিল বুধবার সকালে পৌনে ৭টায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওইদিনই তাকে নাদামপুরে বাবা-মার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।