তাঁর নাম শেখ মুজিব

পুলক রঞ্জন চৌধুরী::
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি জন্ম নিলেও ব্রিটিশের লুণ্ঠন, জমিদারি প্রথায় প্রজাদের অসহায়ত্ব, হিন্দু সমাজে জাতপাতের দৌরাত্ম্য, লাহোর প্রস্তাব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশকে ভারতবর্ষের সমর্থন, মহাত্মা গান্ধীর Quit India Movement, মুসলিম লীগ রাজনীতির উত্থান-পতন, সিলেটে গণভোট, ভারত ভাগ ইত্যাদি ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর নজরে আসে। যখন যেখানে প্রয়োজন মনে করেছেন সেখানেই সম্পৃক্ত হয়েছেন। নিজের কাজ ফেলে অন্যের কাজে ছুটে যাওয়া এবং সহায়তা করার অভ্যাসটি ছিল তাঁর আজন্ম শৈশবের।
১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোলাপগঞ্জ সফরের সময় সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক মিশন স্কুল পরিদর্শনকালে হোস্টেলের ছাদ মেরামতের জন্য তাঁর নিকট হতে স্কুলছাত্র মুজিব প্রয়োজনীয় অর্থপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি (১,২০০ টাকা) আদায় করেন। মন্ত্রী মহোদয় বালক মুজিবের সাংগঠনিক তৎপরতায় মুগ্ধ হয়ে কলিকাতায় দেখা করতে বলেন। ১৯৩৯ সালে কলিকাতায় দ্বিতীয় বার এবং ১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক (গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুল) পরীক্ষার পর গণতন্ত্রের মানসপুত্রের সাথে পুনরায় সাক্ষাৎ হয় এবং ঘনিষ্ঠতা বাড়ে─অর্থাৎ রাজনৈতিক হাতেকড়ি তাঁর মাধ্যমেই। এ হাতেকড়ির আগেই তিনি প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন ১৯৩৯ সালে─স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সভা করার দুঃসাহসিকতার জন্য। কলেজ জীবনে কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রসংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকই শুধু হন নি─সোহরাওয়ার্দীর সহকারীও নিযুক্ত হন।
সে সময় তাঁর দেশপ্রেমমূলক কর্মের জন্য কলিকাতার মানুষ আদর করে বলতেন, ‘শেখ মুজিব তরুণ বাংলার সুভাষ বসু।’ সেখানেও হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গারোধে (১৯৪২) জীবন বাজি রেখে বেকার হোস্টেল থেকে বেড়িয়ে সুদূর আসানসোল পর্যন্ত ছুটে গিয়েছেন। পরের বছর মহাদুর্ভিক্ষে (লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়) লঙ্গরখানা খুলে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন ভূখাদের বাঁচাতে। হক সাহেবের প্রণীত লাহোর প্রস্তাবের ছোট কিন্তু মৌলিক পরিবর্তন (এপ্রিল ১৯৪৬, স্টেটস্ এর স্থলে স্টেট) করে কায়দ-ই-আযমের পাকিস্তান কায়েমে (১৯৪৭) মুসলিম লীগ নেতা-কর্মীদের সাথে তিনিও দিনরাত কাজ করেছেন।
তবে, নব পাকিস্তান রাষ্ট্রের তেরাত্র পার হওয়ার আগেই তিনি বুঝলেন─বাঙালির আশা এই উদ্ভট রাষ্ট্রে পূরণ হবার নয়। কারণ ঢাকায় প্রকাশিত (০৬/১২/৪৭) Morning News-এ পূর্ব বাংলার জনগণ দেখলো, কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তানের ৫৬% মানুষের একক ভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে (৮%) একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে সরকারকে জানালেন ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাদের মুক্তি না দিলে ১৬ ফেব্রুয়ারি হতে অনশন ধর্মঘট শুরু করবেন। জেল কর্তৃপক্ষ অনশন ধর্মঘট না করতে বললে তিনি বলেছিলেন, ‘ছাব্বিশ-সাতাশ মাস বিনাবিচারে বন্দি রেখেছেন। কোনো অন্যায়ও করি নাই। ঠিক করেছি জেলের বাইরে যাব, হয় আমি জ্যান্ত অবস্থায় না হয় মৃত অবস্থায় যাব। Either I will go out of the jail or my deadbody will go out:
কিন্তু ‘তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’─এ ভাবনা অপরিণামদর্শী শাসকচক্রের মাথায় আসেনি─ফলে, অনেক দাম দিয়ে হলেও শেখ মুজিবুর রহমান নির্যাতনের মাসুল কড়ায় গণ্ডায় উসুল করেন। ভাষার সাথে আদায় করেন ভোট এবং স্বায়ত্তশাসনের স্থলে স্বাধীনতা! মাত্র দু’দশকে সাড়েসাত কোটি বাঙালিকে নিয়ে পূর্ব-বাংলায় পাকিস্তানের নাম-নিশানা মুছে প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’। সদা স্মরণ রেখেছেন, পিতার উপদেশ, ‘Sincerity of purpose and honesty of purpose. ’
কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠিত হলে, তিনি (কারাবন্দি অবস্থায়, মাত্র ২৯ বছর বয়সে) দলের যুগ্ম সম্পাদকে মনোনীত হন এবং মধ্য নভেম্বর ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক পদে উন্নীত হন। ১৯৫৪ সাল, পাকিস্তানের প্রথম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন। স্বাধীনতার প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে চার বছর যিনি কারাগারে কাটালেন, সেই শেখ সাহেবের নিকট কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াহিদুজ্জামান শুধু পরাজিত হননি─জামানতও হারান! এ প্রসঙ্গে লড়াকু মুজিব বলেছেন, ‘দুনিয়ার ইতিহাসে একটা ক্ষমতাসীন দলের এভাবে পরাজয়ের খবর কোনদিন শোনা যায়নি।’
কত গঠন-অগঠন, অস্বাভাবিক গতি-বিকৃতির পর ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করা হয় (০৮/১০/৫৮)। আবির্ভূত হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৬২ সালে জেনারেল আইয়ুব খান প্রণীত সংবিধানকে ‘স্বৈরতন্ত্রের সংবিধান’ বলে তা বাতিল করে গণপরিষদের সদস্য কর্তৃক সংবিধান প্রণয়নের দাবিতে ঢাকায় বিবৃতিদাতা নয় নেতার অন্যতম ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনায়েম খানের আমলে আবারও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। যা নিবৃতকরণে শেখ মুজিব ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ নামে আন্দোলন গড়ে তুলেন এবং খাদেম শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরে ঐতিহাসিক প্রচার পত্র ছেপে বিলি করলে দাঙ্গা প্রশমিত হয়।
কাশ্মির ইস্যুতে পাক-ভারতের যুদ্ধ বাঁধে পরের বছরই। ১৭ দিন ব্যাপী সে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দ শহরে শাস্রী-আইয়ুব চুক্তির মাধ্যমে। পরবর্তীতে ‘তাসখন্দ চুক্তি এবং তার পরিণতি’ বিষয়ে ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সর্বদলীয় জাতীয় সংহতি সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সেখানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ পেশ করেন। যা ছিলো কাশ্মির যুদ্ধে হেরে যাওয়া শাসকের মাথায় আরেকটি বজ্রপাত। ছয় দফা দাবিতে সারা পূর্ব বাংলার জনসাধারণের সমর্থন আদায়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। পুনঃ পুনঃ গ্রেফতারের মধ্যে জামিনের ফাঁকে সভা (৬০টি) করে পূর্ব বাংলায় অভূতপূর্ব সাড়া জাগান! একদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান হুঙ্কার দিলেন, ‘ছয় দফা প্রণয়নকারী দল পাকিস্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শত্রু।’ ফলে আন্দোলনকারীদের উপর শাসকের নির্যাতন বাড়তে থাকে। একবছর আটমাস দশদিন কারাভোগের পর নেতা শেখ মুজিব ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৮ রাত একটায় মুক্তি পেয়ে বিশ মিনিট পরেই ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’ জেলগেটে পুনরায় আটক হন।
শাসকদেরও বুঝতে বাকি ছিল না, বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বেঁচে থাকা মানে─পাকিস্তানের অখণ্ডতা হুমকির মুখে। শেষাশেষি তিনি নিজেই আদালতের আসামির ডকে দাঁড়ালেন। নিজের লিখিত ঐতিহাসিক জবানবন্দিতে (৬ জানুয়ারি ১৯৬৯) নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এই মামলা শাসকগোষ্ঠী তাঁর ‘বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের বিষময় প্রতিক্রিয়া’ বলে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে এগারো দফা দাবি নিয়ে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ DAC, রাজনৈতিক দল, সুধীসমাজ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক-সাংবাদিক-শিল্পী-কৃষক-শ্রমিক-যুব-বৃদ্ধ-বনিতা তেজদীপ্ত স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করতে থাকে। যা ছিল ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’, ‘জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও, ক্যান্টনমেন্ট পুড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি। অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে আইয়ুব খান ২১ ফেব্রুয়ারি বেতার ভাষণের মাধ্যমে ‘আগরতলা মামলা’ প্রত্যাহার করলে পরদিন প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্তি পান।
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ খ্রি. বাঙালি জাতির জীবনে ঐতিহাসিক দিন। যেদিন রেসকোর্স ময়দানে প্রায় দশ লক্ষ জনতার উল্লাসিত উপস্থিতি ও মুহুর্মুহু করতালিতে প্রদত্ত গণসম্বর্ধনায়, সভার সভাপতি ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ পূর্ব বাংলার জনগণের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জন করে ! বাঙালিরা এবার নিশ্চিত হয়─দুঃখের দিন শেষ হবে। ১০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় বৈঠক করে বঙ্গবন্ধুকে ‘পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন করলেও ১ মার্চ তিনিই সংসদ অধিবেশন আহ্বান অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেন! ‘স্থগিত’ ঘোষণা শোনা মাত্রই পূর্ব বাংলার মানুষ ক্ষোভে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ২ মার্চ থেকে পূর্ব বাংলা জুড়ে শুরু হয় ‘অসহযোগ আন্দোলন’। ‘মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য’ প্রবন্ধে তোফায়েল আহমেদের বর্ণনায় পাই ‘মার্চের ৩ তারিখ বঙ্গবন্ধুকে “জাতির পিতা” ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের “সর্বাধিনায়ক”, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” গানটিকে জাতীয় সংগীত ঘোষণা করেন, বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।’
এলো ৭ মার্চ, অনেক উৎকণ্ঠা এবং হুমকির মধ্যেই রেসকোর্স ময়দানে গগণবিদারী স্লোগানে মুখরিত জনসমুদ্রে হাজির (বিকাল ৩টা ২০ মিনিট) হলেন বঙ্গবন্ধু। ১৮ মিনিটের অলিখিত, ভূবনবিজয়ী ঐতিহাসিক ভাষণে (১৩০৮ শব্দ) বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ‘শেখ মুজিবের পথ ধর, বাংলাদেশ কায়েম কর’ স্লোগান নিয়ে সব পেশার মানুষ রাজপথে নামে।
১৬ মার্চ থেকে প্রেসিডেন্ট ভবনে শুরু হয় কথিত মীমাংসালোচনা। যেথায় উড়ে এসে জুড়ে বসেন ভুট্টোও। কিন্তু শতচাপেও বাঙালির স্বার্থে অটল ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এর মধ্যে সে-ই প্রস্তুতির মাত্রা পূর্ণ হলে তাঁরা বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা না করেই ২৫ মার্চ হঠাৎ পূর্ব বাংলা ত্যাগ করেন। সেদিন-ই মধ্য রাতের আগে পাক সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস ও ঘৃণ্যতম পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড শুরু করে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে নিরতিশয় ভয়শূন্যতা নিয়ে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার বরণের পূর্বেই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেন।
এবার বাঙালি জাতির পিতাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে না রেখে পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্টে (মিয়ানওয়ালি) পাঠিয়ে দেয়া হয়। ২ আগস্ট ঘোষণা হলো ‘রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে’ বিচার শুরু হবে। বিচারের রায়ের আগেই জেলখানায় তাঁর সেলের পাশেই কবর খোঁড়া হলো। স্বাধীনতার পর এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘হ্যাঁ, আমি নিজের চোখে দেখলাম ওরা কবর খুঁড়তে। আমি নিজের কাছে নিজে বললাম, “আমি জানি, এ আমার কবর। ঠিক আছে। কোনো পরোয়া নেই।” আমি তৈরি আছি।’ যেন বিদ্রোহী কবির সে-ই ‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয় গান…’ কল্পনার বাস্তব রূপায়ন! (কাণ্ডারী হুশিয়ার, লাইন-২৩)। তবে আত্মপ্রত্যয়ে প্রস্ফুট সমরবিদের চিত্ত সংশয়হীন ছিলো বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবেই। যে বিজয়ে এ বাংলার পথ-ঘাট-প্রান্তর, খাল-নদ-নদী শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, মা-বোনের সম্ভ্রম হানির বেদনায় অন্তর-অন্তরীক্ষ বিধুর হয়েছে, বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তেও হারাতে হয়েছে বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের! স্বাধীনতার জন্য অল্প সময়ে এতো বলিদান দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই!
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রি., বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়─স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা। নব রাষ্ট্র─রক্তাক্ত-ক্ষতবিক্ষত-বিধ্বস্ত এক ধংসস্তুপ। পাক সেনারা হাট-বাজার, শিল্প-কারখানা, স্কুল-কলেজ সব জ্বালিয়ে ছাই করে গেছে। তিনি ১৭ মার্চ ১৯৭২-এর মধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনী ফেরৎ, ভারত হতে এক কোটি বাঙালিকে দেশে এনে তাদের এবং দেশের আরো তিন কোটি মানুষকে পুনর্বাসন, যুদ্ধাহত ও বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা, সাত মাসের মধ্যে সংবিধান তৈরি, সাধারণ নির্বাচন, বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি, ওআইসি-জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ অর্জন, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা, ৭.৫ জিডিপি অর্জন, বাংলা ভাষার মর্যাদা বাড়াতে জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ (একই সাথে ইংরেজি অনুবাদে উপস্থাপন করেন সিলেটের ফারুক চৌধুরী) প্রদানসহ নানামুখী কাজ দ্রুততম গতিতে সম্পন্ন করেন। দেশে দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনদের সতর্ক করেন। কিন্তু এর-ই মধ্যে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি সপরিবারে নিহত হন। বাঙালি জাতিকে যিনি উদ্দাম উদ্দীপকে উদ্ভাসিত করে পরাধীনতার গ্লানি মুছে বীর ও বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বসমাজে উন্নীত করলেন, হাজার বছরে যা কেউ পারে নি─সেই জনকের বক্ষ বুলেট বিদীর্ণ করলো বিপথগামীরা!