দুপুরে পুকুরের গল্প

ইছমত হানিফা চৌধুরী
ইদানিং সবার মধ্যেই দেখি নব্বই দশকের নষ্টালজিয়া কাজ করছে। আর আমারও বার বার মনে পড়ছে নানান স্মৃতি। হয়তো নব্বইয়ের আগের সময় নিয়েও তখনকার সবার মাঝে নষ্টালজিয়া আছে। কিন্তু নব্বই হচ্ছে, মানব সভ্যতার মাইল ফলক, এই সময়কে ঘিরে, এনালগ থেকে ডিজিটাল হয়েছে সবকিছু। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে সবকিছুর পরিবর্তন হয় এবং এই পরিবর্তনকে সহজভাবে মেনে নিতে হবে। নব্বই দশকের আগ-পর্যন্ত সিলেট শহরের প্রায় বড় বড় বাড়িতে পুকুর ছিল আবার অনেক জায়গায় ছিল বেশ বড় বড় দীঘি। সেই সব দীঘির কিছু আজও বিদ্যমান। পানির চাহিদা পূরণের জন্য বলতে গেলে প্রথম ও প্রধান মাধ্যম ছিল পুকুরের পানি। এই পানি পান করা সহ সকল প্রকার ঘর-গৃহস্থালির কাজ তথা গোসলের কাজেও বাড়ীর বৌ ঝি রা একসাথে পুকুরে গোসল করতেন। মুসলমান পরিবারের মেয়েরা জোহরের আযানের আগে আগে গোসলের সময় একই বাড়ীর এক দুই করে যত ঘর বাড়ীতে আছে, সব ঘরের মা, ঝি, বৌরা একসাথে পুকুর ঘাটে আসতেন। কখনো কখনো দেখা যেত অন্য বাড়ীর পুকুরের পানির স্বচ্ছতা কম, কিংবা কোন সমস্যা তখন কাছাকাছি পুকুরে আশেপাশের বাড়ি থেকে অনেক সময় অনেকে এসে একই পুকুরে জড়ো হতেন।
যদিও সবাই পুকুরে গোসলের উদ্দেশ্যে আসতেন কিন্তু সাথে করে নিয়ে আসতেন নানান রংয়ের নানা বর্ণের নানা যুগের হাজার হাজার গল্প। দুপুরবেলা পুকুরঘাটে গল্পের মেলাকে কেন্দ্র করে কি রান্না করলেন আজ। সেই গল্পে কখনো উঠে আসত নতুন রেসিপি আবার কখনো রান্নার নানান টিপস যেমন ভাবি আলু-মাংস দিয়ে রান্না করেছি কিন্তু তরকারিতে কেমন মিষ্টি মিষ্টি ভাব খেতে স্বাদ হয় নাই। শুনে অন্যজন বলছেন, সমস্যা নাই ভাদ্র-আশ্বিন মাসের গোল আলু-মিষ্টি হয়ে যায় তাই এই সময় রান্না করার আগে একটু সিদ্ধ করে নিলে এই মিষ্টি ভাব একেবারে থাকবে না। আবার পড়াশুনা নিয়ে ছোটদের গল্প উঠে আসতো কখনো স্কুলের ক্লাসের গল্প যেমন রিনি বলছে আজ যে, অংকের ক্লাসে বাবু স্যার ঐকিক নিয়ম কি পড়াইছেন কিছুই বুঝিনি তখন মেধাবী ছাত্রী সুমি তার চাচাতো ভাই বোন কি বা পাড়াতো সাথী বলে উঠলো আমি বুঝেছি এভাবে এভাবে। শুরু হয়ে গেল অংকের ক্লাস, বড়রাও শুনতেছেন যে ঐকিক নিয়মের অংক বুঝেনি সবার সহযোগীতায় তা সহজ হয়ে গেল। আবার কেউ একজন বলতেছে গতকাল খুব সুন্দর একটা থ্রি পিচের কাপড় কিনেছি। কিন্তু কোথায় বানাতে দিব আর কি ডিজাইন দিব বুঝতেছিনা সকলের সহযোগীতায় এর সমাধানও এই পুকুর ঘাটে হয়ে যাচ্ছে।
সেই সময় মানুষের সাথে মানুষের যেমন সু-সম্পর্ক ছিল তেমনি শত ব্যস্ততা পরে অফুরন্ত অবসর ছিল। তাই নাইওরিরা আসতো বাবার বাড়ী বেড়াতে বোনের বাড়ি। এই নাইওরি বা তাদের সাথে অতিথি পুকুরে আসতো সাথে করে নিয়ে আসতো আরেক গ্রামের গল্প, আরেক শহরের গল্প, আরেক পরিবারের গল্প। ঐসব গল্পের সূত্রে ভেসে আসতো, অমুকের একটা ছেলে উচ্চ শিক্ষিত, কিংবা প্রবাসী, অথবা ভাল চাকুরিজীবী বিয়ের জন্য পাত্রি খুঁজছেন। আবার অনেক সময় বিপরীত গল্পও হতো পাত্রির জন্য পাত্র খুঁজছেন। এই পুকুর ঘাটে মিলে গেল পাত্র পাত্রির খোঁজ। শুরু হয়ে গেল বিয়ের ঘটকাকালি। শেষ পর্যন্ত ভালভাবে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ গেল শুধু গল্পের দিক। যেখান থেকে বলা যায় পুকুর ঘাটে যেমন রান্নার ক্লাস, স্কুল কলেজের ক্লাস, ফ্যাশনের ক্লাস, রুপচর্চার ক্লাস সবই হত। আবার সব সমস্যার সমাধানও হত। এবার আসা যাক সামাজিক শিষ্টাচারের দিকে, ছোটরা যেমন বড়দের কিংবা বয়স্ক দাদী, নানী, শরীর ঘষে দিচ্ছে, কাপড় ধুয়ে দিয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ বয়স্কদের কাপড় পরিয়ে দিতে সাহায্য করছে এই সহিষ্ণু শিক্ষার প্রথম পাঠ এই পুকুর ঘাটে হয়ে যাচ্ছে নব্বই দশকের নষ্ঠালজিয়ার এই গল্প চিন্তা করলে বর্তমান সময়ের অনেক পার্থক্য চোখে পড়ে। প্রথমত পুকুর এখন নাই। আর যদিও কোথাও আছে কিন্তু এখনকার সময়ের বাস্তবতা তেমন করে আর পুকুর ঘাটে নিয়ে যেতে পারে না। মূল কথা, পুকুর ঘাট হারাই নাই, হারিয়েছি মায়া ঘেরা একে অন্যের হাত।
তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এই এক গল্প। সব শেষে বলতে হয়, হউক অন্য ভাবে একক কামরায়, তবুও সামাজিক বন্ধন ধরে রাখি। প্রত্যেক মানুষের সঙ্গেই পৃথিবীর একটা দেনা-পাওনা আছে। এই বন্ধন আমাদের স্বীকার করে নিতেই হবে স্নেহ ও সেবার সকল মহাপুরুষের জীবনেই দেখতে পাই এই স্নেহ ও সেবার খেলা। মানুষকে ভালবাসতে হবে এবং সেবা নিতে হবে। সেবা দিতে হবে। মানুষের সেবাকে যে অস্বীকার করলো। যে মানলো না স্নেহের বন্ধন সে হতভাগা বিষাক্ত করে গেল মানব সমাজকে।