নিরাপদ থাকুক সকলে

ফাহমিদা ইয়াসমিন
বিশ্ব এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। করোনা নামক মহামারি সেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তাই তো করোনা নিয়ে যতোই দিন যাচ্ছে ততোই জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কখনো কখনো মনে হচ্ছে এই মহামারির থেকে কখনোই বুঝি নিস্তার পাওয়া যাবে না। আবার কখনো মনে হচ্ছে বিশ্বের নামী দামী বিজ্ঞানিরা এই বুঝি কোনো উপায় বের করলো যা দিয়ে এই মহামারির মোকাবেলা করা যায়। কিন্তু আসলে হচ্ছে কি তা দেখতে আরও সময় অপেক্ষা করতে হবে। তাছাড়া ভাইরাসটি সনাক্ত হওয়ার সময় থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা থেকে শুরু করে সকল চিকিৎসা ও স্বাস্থ বিষয়ক গবেষকরা বলছে ঠান্ডায় সংক্রমণ বৃদ্ধির ভয়াবহতা সম্পর্কে। যদিও কোভিড সম্পর্কে এখনো বিজ্ঞানীরাও সব জানেন না। সময়ের সঙ্গে এটি দুর্বল হয়ে পড়বে নাকি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, টিকা আদৌ আসবে কি না বা কবে নাগাদ আসবে, হার্ড ইমিউনিটি আসলেই সম্ভব কি না ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর এখনো ধোঁয়াশায়। কিন্তু এতোকিছুর মাঝেও বিজ্ঞান যে সঠিক তথ্য কিছুটা দিয়েছে বা তাদের গবেষণা যে খুব বেশি মন্দ নয় তার প্রমাণ মিলেছে বেশ কয়েকটি দেশে সংক্রমণ কমে যাওয়ার পর দ্বিতীয় বারের সংক্রমণের মধ্য দিয়ে। তাছাড়া তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতাও আছে ভাইরাসের সম্পর্কে। উনিশ শতকের দিকে স্প্যানিশ ফ্লুর মোট তিনটি ঢেউ দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউটা ছিল প্রথমটির তুলনায় মারাত্মক। তাই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত বসে থাকার কোনো উপায় নেই। ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে সংক্রমণের হার বাড়ছে। ইউরোপ আবার কঠোর লকডাউনে। কিন্তু একে দ্বিতীয় ঢেউ বলা যাবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দ্বিধায় আছেন। অনেকেই মনে করছেন, প্রথম ঢেউই এখনো শেষ হয়নি। যেহেতু মানুষের বাইরে যাওয়া বেড়েছে, বাড়ছে জনসমাগম, খুলে দেওয়া হয়েছে অনেক কিছু, সে কারণে সংক্রমণের হার বাড়তেই পারে। যাঁরা আগে বের হননি, তাঁরাও এখন বের হচ্ছেন। শিশু-কিশোরেরাও বের হচ্ছে, অনেক দেশে তো স্কুল-কলেজও খুলে গেছে।
কিন্তু আশার আলো হলো এরই মধ্যে করোনার বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন বাজারে এসেছে। এবং সেই ভ্যাকসিনের সফলতাও দেখা দিয়েছে। কিন্তু গণহারে ভ্যাকসিন পেতে যে আরও কয়েক মাস লেগে যেতে পারে সেই বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। আমরা যারা লণ্ডন প্রবাসি বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে কিছু বয়জ্যৈষ্ট ইতিমধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহণও করেছে প্রথম দফায়। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, কিছু স্বার্থান্নেষী ধর্মান্ধ প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, ভ্যাকসিন মূলত তৈরি হয় নিষিদ্ধ পশুর চর্বি থেকে তাই মুসলিমদের জন্য এটা হারাম। এসব প্রচারণায় কান দেওয়ার মতো মানুষের সংখ্যা কম হলেও গুজবটা যে কতো বড় বেকার তা ভেবে দেখার মতোও সময় নেই কারও হাতে এখন। কিন্তু ভ্যাকসিন বাংলাদেশে পেতে হয়তো একটু সময় লাগবে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে সাধারণদের চলাচল করা দরকার। বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায় বাংলাদেশের শহর ও গ্রামে মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করছে, অনেকেই অপ্রয়োজনে এবং স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন সবসময় সবখানে। স্কুল না খুললেও শিশুদের নিয়ে বাবা-মায়েরা বাইরে যাচ্ছেন, পার্কে যাচ্ছেন, সমুদ্র সৈকতে যাচ্ছেন। এটা মোটেও ঠিক না।
সময়ের সাথে সাথে নতুন ধরনের করোনার আলামত মিলছে বিভিন্ন দেশে। তাই জনগণের সচেতনতা খুবই প্রয়োজন। যা ভ্যাকসিন প্রয়োগের চেয়েও ভীতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে শীতের সময় চলে এসেছে। তাই বাংলাদেশেও করোনার প্রভাব যে বৃদ্ধি পেতে পারে তার কোনো সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে করোনা বেড়েও গেছে। আশার বিষয় হলো, দেশে এখন পরীক্ষাগার বেড়েছে। তাছাড়া এখন বসে থাকার সময় নয়। বরং নির্দেশনা মেনে চলার সময়। তাই এই সঙ্কটের সময়ে আতঙ্কিত না হয়ে বরং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে নিজেকে ও আশেপাশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বারবার পরামর্শ দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে সাবান ও পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুতে বলা হয়েছে ডব্লিউএইচওর নির্দেশনায়। এছাড়া মাংস ও ডিম অবশ্যই যথাযথ তাপে ও ভালোমতো রান্না করে খেতে বলা হয়েছে। হাঁচি ও কাশির সময় অবশ্যই হাত বা টিস্যু দিয়ে মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে হবে। এরপর টিস্যু ফেলে দিতে হবে এবং অবশ্যই হাত ধুয়ে নিতে হবে। যে কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার পর হাত ধুতে হবে। কোনো প্রাণির যত্ন নিলে বা স্পর্শ করলে ও প্রাণিবর্জ্য ধরার পরও হাত ধুতে হবে। শরীরে যে কোনো সংক্রমণ এড়াতে রান্না ও খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধুয়ে নিতে হবে। নিজের পাশাপাশি অন্যকে সুরক্ষিত রাখতে করণীয় সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। এছাড়া আরও অনেক বিধিনিষেধ করেই যাচ্ছে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তির ম্ধ্যামে। নিজেদের সুরক্ষা এখন নিজেদের হাতেই। তাই ভ্যাকসিনের আশায় বসে না থেকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজেদের সচেতন হতে হবে। নইলে কোনো ভাবেই এই অদৃশ্য মহামারির সাথে পেরে উঠা সম্ভব নয়।
একটি গুজব প্রায়ই শোনা যায় যে, করোনা একবার হলে আর হবে না। এসব গুজব থেকে নিজেদের সচেতন করতে হবে। কেননা বিজ্ঞান নিজেই জানে না এর শুরু আর শেষ কোথায় হতে পারে। তাই শুধু সচেতনতাই আমাদের নিজেদের ও স্বজনদের কিছুটা স্বস্থি দিতে সক্ষম। সবাই সচেতন হই। নিজে বাঁচি অন্যকেও বাঁচতে সাহায্য করি এই পণ করার এখনই যোগ্য সময়।