বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ সিরাজপুর

মোহাম্মদ জুয়েল
গ্রাম বলতে সাধারণত একটি অনুন্নত ও কৃষি নির্ভর পরিবেশে সংঘবদ্ধ মানব বসতিকে বুঝায়। গ্রামের কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। বলা হয় যে, সমগ্র দেশই একটি গ্রাম। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এবং সেনানিবাস এলাকাকে শহর হিসেবে সরকারিভাবে গণ্য করা হয়। শহর ব্যতিত সবই গ্রামাঞ্চলভুক্ত। সাধারণত কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হয়। গ্রামে এক বা একাধিক পাড়া বা মহল্লা থাকে। গ্রাম কতটা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ হবে তার আকার কোন দেশেই নির্ধারিত নয়।
ইংল্যান্ডে গ্রামের ক্ষুদ্রতম সংস্করণ হচ্ছে হ্যামলেট। হ্যামলেট বলতে বুঝায় এমন ক্ষুদ্র বসতি যেখানে কোন উপাসনালয় নেই, অর্থাৎ মসজিদ, মন্দিরবিহীন ক্ষুদ্র জনপদ। বাংলাদেশে প্রাচীণকালে এ ধরনের ক্ষুদ্র বসতিকে গ্রাম বলে আখ্যায়িত করা হতো। এ ধরনের ক্ষুদ্র গ্রাম আমাদের দেশে বিদ্যমান আছে। কোন কোন এলাকায় মাঠের বা হাওরের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা দু-তিনটি পরিবারের ক্ষুদ্র বসতিকেও গ্রাম বলা হয়। ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ যে আকারের হোক না কেন প্রতিটি গ্রামের সুন্দর একটি নাম থাকে এবং গ্রামের মানুষ তার গ্রামের নামটিকে ভালোবাসা ও আবেগের সাথে অন্তরে লালন করে।
এমনি একটি গ্রাম বালাগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর। গ্রামটি বড়ভাগা নদীর পশ্চিম তীরে বিদ্যমান। গ্রামের মধ্যদিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর নাজিরবাজার-খন্দকারবাজার-মাদারবাজার পর্যন্ত পাকা রাস্তাটি বিস্তৃত। অন্য একটি রাস্তা সিরাজপুর গ্রামের পশ্চিম দিকে রুগনপুর হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দয়ামীর পর্যন্ত বিস্তৃত। সিরাজপুর গ্রামে অনেক কৃতি সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছেন। তারা নিজ নিজ যোগ্যতা, মেধা ও প্রতিভার দ্বারা দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সময়ের প্রয়োজনে এবং আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের ভিত্তিমূল খুঁজে পেতে যাতে সহজ হয়; যে জন্য ইতিহাসের সেইসব ব্যক্তিবর্গের মধ্যে থেকে কিছু কিছু উপস্থাপন করার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র। মখলিছুর রহমান তিনি ১৯৪৯ ইংরেজী সালে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মহিবুর রহমান। তিনি বঙ্গবন্ধুর ছয়দফার আন্দোলনে সিলেটে প্রথম গ্রেফতার হন। সিলেট সদর মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছয় দফা, এগার দফার আন্দোলনে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৬৮ সালে মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ এর গণ অভ্যূত্থানেও ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। অবিভক্ত বালাগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম দিকেই গোলাপগঞ্জ থানার মীরগঞ্জে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি গ্রেফতার হন। তাকে গ্রেফতার করে প্রথমে ফেঞ্চুগঞ্জ ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। তারপর ওখানকার শান্তি কমিটির এক নেতার প্ররোচনায় তাঁকে কুলাউড়া ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে মাসাধিকাল বন্ধি রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে মৃত্যুপ্রায় মানুষটিকে গুলি করে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয় কুলাউড়া ক্যাম্পের পাকিস্তানী মেজর। দন্ড কার্যকর করতে একজন সৈনিক তাঁকে নদীর তীরে নিয়ে যায়। মৃত্যুপ্রায় মানুষটিকে মারবে কি! সৈনিকটির মনে হয়তো মানবতা জাগ্রত হয়, সে ফাঁকা গুলি করে তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলে ওখানেই ফেলে আসে। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। ওখানকার গ্রামের লোকজন তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। গায়ে অসংখ্য নির্যাতনের ক্ষত চিহ্ন নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন। অত্যন্ত গোপনে তার চিকিৎসা চলে। একটু সুস্থ হয়ে আবার নিখোঁজ হন। কিছুদিন পর গোপনে রাতের বেলা বাড়িতে আসেন। একদিন পর বাড়ি থেকেই রাজাকাররা গ্রেফতার করে। এখানকার রাজাকাররা তাকে ধরিয়ে দেয়। দু’বারই হায়নার হাত থেকে বেঁচে যান। মুক্তি পেয়ে আর বাড়িতে আসেননি।
মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৭ মাসই জালালপুর ও মোগলাবাজার ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধাদের দখলেই ছিল। তিনি ঐ এলাকাতেই ছিলেন। ৭ ডিসেম্বর জালালপুর মুক্ত হয়ে যায়। স্বাধীন দেশ পুর্নগঠনে তিনি মনোনিবেশ করেন। তাঁকে বালাগঞ্জের দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের মনোনীত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক কাজ করেন। ১৯৯২ সালের ২০ অক্টোবর ৫২ বছর বয়সে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। অত্র গ্রামের কৃতি সন্তান প্রয়াত মোঃ রুস্তুম আলী, মুহিবুর রহমান ও নিম্বর আলী জামেয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর মাদরাসার অন্যতম দাতা ছিলেন। রুহুম কুদ্দুছ বাবুল সাবেক ছাত্রনেতা। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি, সিলেট জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ মোজাফফর) এর সাথে জড়িত। আব্দুল হাফিজ জুয়েল। যুক্তরাজ্য প্রবাসী, শিক্ষানুরাগী। সেখানের কমিউনিটির রাজনীতির সাথে জড়িত। পিতা প্রয়াত আব্দুল জব্বার। তিনি ২০ জুলাই ২০২০ খ্রিঃ যুক্তরাজ্যের এসেক্স কাউন্টির মালডন টাউন কাউন্সিলর মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।
২০১৭-১৮ সালে তিনি ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জুয়েল ২০১৫ সালে এসেক্স কাউন্টির মালডন টাউন কাউন্সিল নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এ কাউন্সিলের ফাইন্যান্স চেয়ারম্যান (জেনারেল) ছিলেন। প্রবাসী গহরপুর মাদ্রাসার উন্নয়ন সমিতির প্রাক্তন সহ সভাপতি, দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজের প্রবাসী গহরপুর ভবনের অন্যতম দাতা। এছাড়া, আব্দুল হাফিজ জুয়েল দেশে বিদেশে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত রয়েছেন। ফজলুর রহমান, পিতা প্রয়াত মহিবুর রহমান। তিনি ১৯৬৩ সালে বৃটেনে পাড়ি জমান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনে অন্যান্যদের সাথে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজের প্রবাসী গহরপুর ভবনের অন্যতম সদস্য। আব্দুল কাদির খছরু। পিতা প্রয়াত আব্দুল জব্বার। খছরু মূলত বৃটেন প্রবাসী। তিনি ২০০৪ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে ইউনিয়ন আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব মনোনিত হন। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজ গভর্নিং বডির সদস্য। তারই ভ্রাতা আবুল খলিল (রুয়েল) দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন ছাত্রলীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক। বৃটেনে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত। তিনি দয়ামীরের রাইখদাড়া গ্রামে আস্-সুন্নাহ হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মুহিব আহমেদ, যুক্তরাজ্য প্রবাসী, শিক্ষানুরাগী। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজের আজীবন দাতা সদস্য। অত্র প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাজ্য প্রবাসী গহরপুর ভবনের অন্যতম দাতা। এছাড়াও যুক্তরাজ্য প্রবাসী সমাজকর্মী, শিক্ষানুরাগী মিজানুর রহমান সেলিম, খলকু মিয়া, শাহিন আহমদ, মাহবুবুর রহমান ও এখলাছ আলী দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজের প্রবাসী গহরপুর ভবনের অন্যতম দাতা। মো. আতাউর রহমান (মুজিব) তিনি বড়জমাতের ছমিরুন নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক। তারই অনুজ হাফিজ মাওলানা মো. আতিকুর রহমান জামেয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনি খেলাফত মজলিস সিলেট জেলা শাখার অন্যতম নেতা। মো. মনু মিয়া। তিনি তাজপুর ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। বর্তমানে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন। খলিলুর রহমান দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক। প্রয়াত মো. আনছার মিয়া। তিনি কয়েকবার দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজের গভর্ণিং বডির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মাওলানা মামুনুর রশিদ, মাওলানা কামাল হোসেন, মাওলানা জাহিদ আহমদ, মাওলানা আব্দুল কাদির, মাওলানা শামসুল হক, মাওলানা সাহেদ আহমদ ও মাওলানা নাজমুল ইসলাম জামেয়া ইসলামীয়া হোসাইনিয়া গহরপুর মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাশ করেছেন। প্রয়াত মনোহর আলী ও তাছির আলী বালাগঞ্জের অন্যতম কৃতি কাবাডি খেলোয়াড় ছিলেন। মখলিছুর রহমান প্রাক্তন নাজির, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সিলেট। মো. তোহাহিদ আলী, মো. লাল মিয়া ও মো. ছুরাব আলী দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন সদস্য। মো.আনু মিয়া, নেছাওর আলী সমাজ কর্মী। ওলিউর রহমান, যুব নেতা, স্পেন প্রবাসী। নেছাওর আহমদ মাস্টার। তিনি একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী। তিনি বড়জমাতের ছমিরুন নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন (২০০৬ খ্রি:) প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন। তাঁর জৈষ্ঠ পুত্র ড. রায়হান আহমদ (শাওন) দক্ষিণ কোরিয়ার ওয়াংক ওয়াং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। সে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। সিরাজপুর গ্রামে শাহ মোহাম্মদ মন্তাজ আলী সারং হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও সিরাজপুর কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এ স্থলে বলে রাখা ভালো, প্রবন্ধে প্রদত্ত তালিকাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় এবং এটা কোন গবেষণামূলক প্রবন্ধও নয়; অতএব, বাদ পড়া ও ভুল থাকাটা প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক। পরিশেষে আশা করব আগামী প্রজন্ম সিরাজপুর গ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্য আরো সুদৃঢ় করবেন।