মনীষীদের দৃষ্টিতে মহানবী (সা:)

আবদুল হামিদ মানিক
গভীর আঁধার কেটে ভেসে ওঠে আলোর গোলক/ সমস্ত পৃথিবী যেন গায়ে মাখে জ্যোতির পরাগ,/ তাঁর পদপ্রান্তে লেগে নড়ে ওঠে কালের দোলক/ বিশ্বাসে নরম হয় আমাদের বিশাল ভূভাগ।
কবি আল মাহমুদের অনুভবে এভাবে ধরা পড়েছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ….। আর জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ভাষায় : মুহাম্মদ নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে/এই নামের এত মধু কে জানিত আগে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) আল্লাহর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল। মানবশ্রেষ্ঠ আল্লার হাবিবের মূল্যায়ন মানুষের মন্তব্যের মুখাপেক্ষী নয়। কিন্তু নবী মুহাম্মদ গোটা বিশ্বে এমন বিপ্লব সাধন করেন যে, যুগ যুগ ধরে জ্ঞানী গুণী দার্শনিক চিন্তাবিদগণ তাঁর সম্পর্কে কথা বলে আসছেন। অমুসলিম মনীষীরাও তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে কথা বলেছেন। মাইকেল হার্ট বিশ্ব ইতিহাসে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জীবন পর্যালোচনা করে ‘দ্যা হান্ড্রেড’ নামে একখানা বই লিখেছেন। ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ একশ জন মানুষের তালিকায় প্রথম স্থান দিয়েছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) কে।
মহানবীর জন্মকালে মানব সমাজে ছিল ঘোর অন্ধকার। এ দিকটি কবি নজরুলের কবিতায় :
এমনি আঁধার ঘনতম হয়ে ঘিরিয়াছিল সেদিন/ উদয় রবির পানে চেয়েছিল জগৎ তমসা লীন।/ পাপ অনাচার দ্বেষ হিংসার আশীবিষ ফনাতলে/ ধরণীর আশা যেন ক্ষীণ জ্যোতি মানিকের মত জ্বলে।/ মানুষের মনে বেঁধেছিল বাসা বনের পশুরা যত/ বন্য বরাহে ভল্লুকে রণ, নখর দন্ত ক্ষত।
মুসলিম লেখক দার্শনিক দুনিয়ার বিভিন্ন ভাষায় হাজার বছর ধরে মহানবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে আসছেন। অমুসলিমরাও তাঁর গুণ ও সাফল্য সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। পাশ্চাত্যের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইনসাইক্লোপেডিয়াতে বলা হয়েছে : বিশ্বের তাবৎ ধর্ম প্রচারকদের মধ্যে মুহাম্মদ (সা:) সর্বাধিক সফল ছিলেন।
চেম্বারস ইনসাইক্লোপেডিয়াতে বলা হয়েছে : মহানবী এমন এক জ্ঞানালোক ও সভ্যতার বিশাল প্রাসাদের বুনিয়াদ স্থাপন করলেন-যা তার সময় থেকে পৃথিবীকে অলংকৃত করে আসছে। কুরআনে বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও। যেখানে তোমরা জ্ঞান দেখবে গ্রহণ করবে, এ বীজ থেকে উদগম হলো বৃক্ষরাজি আর তার শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে গেল বাগদাদ, সিসিলি, মিশর এবং স্পেনে যার ফল ভোগ করছে আজকের ইউরোপ।
নেপলিয়ান বোনাপার্ট বিশ্ববিজয়ী বীর হিসেবে সর্বত্র পরিচিত। তিনি প্রচুর লেখাপড়া করতেন। তিনি বলেছেন : আমি আশা করি সে সময় খুব দূরে নয় যখন সব কটি দেশের বিজ্ঞ ও শিক্ষিত লোকদেরকে আমি একতাবদ্ধ করতে এবং কুরআনের যে নীতিসমূহ একমাত্র সত্য ও যে নীতিসমূহ মানুষকে শান্তির পথে পরিচালিত করতে পারে-সেসব নীতির উপর ভিত্তি করে এক সমরূপ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হব।
জর্জ বার্নাড শ পাশ্চাত্যের সর্বজন নন্দিত লেখক ও দার্শনিক। ইসলাম ও মহানবী সম্পর্কে তাঁর উচ্চ প্রশংসা বহুশ্রুত। তিনি লিখেছেন : মুহম্মদের (সা:) ধর্মকে তাঁর আশ্চর্য প্রাণ প্রাচুর্যের জন্য আমি আজীবন ভক্তি ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে আসছি। আমার মতে দুনিয়ার নিত্য পরিবর্তনশীল অবস্থার সঙ্গে ষোলো আনা মিল রেখে সর্বযুগের সর্বধর্মের মর্যাদা রক্ষা করে চলার মতো সামর্থ যদি কোনো ধর্মের থাকে তবে তা একমাত্র ইসলামেরই রয়েছে। আমারই মতো এই মহামানবের ভবিষ্যদ্বাণীকে উচ্চমূল্যে গ্রহণ করার জন্য জগতের লোক যে উদগ্রীব হয়ে রয়েছে তাতে আর সন্দেহ নেই। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম, ধর্মনীতি ইউরোপে গ্রাহ্য হবে, বর্তমানে তা হতে শুরু করেছে।’ বার্নাড শ আরো বলেছিলেন : আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে, আজ যদি মুহম্মদের মতো কোনো মানুষ পৃথিবীতে সর্বসময় কর্তার আসন গ্রহণ করতেন, তা হলে আধুনিক জটিল সমস্যার এমন সমাধান তিনি দিতে পারতেন, যার ফলে সমস্ত জগৎ অতি আবশ্যকীয় সুখ শান্তির অধিকারী হতে পারতো।
টমাস কার্লাইল ‘হিরো এন্ড হিরো ওয়ারশিপ’ গ্রন্থে লিখেছেন : আরব জাতির জন্য এটা ছিল অন্ধকার থেকে আলোতে উত্তরণ-এক নবজন্ম। এরই মাধ্যমে আরব জাতি প্রথমবারের মতো জীবন্ত প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। মাত্র একটি শতাব্দীর মধ্যেই আরবরা গ্রানাডা থেকে দিল্লি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূভাগের মধ্যে এক দীপ্ত আলোক রশ্মি রূপে সুদীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছুরিত হতে লাগলো।
স্যার উইলিয়াম মূর মহানবীকে দেখেছেন এভাবে; হযরত মুহাম্মদ (সা:) যে যুগে জন্মগ্রহণ করেন শুধু সেই যুগেই তিনি শ্রেষ্ঠ মনীষী ও চিন্তানায়ক ছিলেন শুধু তাই নয় বরং তিনি সর্বকালের সর্বদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক ও মনীষীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন।’
আলফ্রেড লামার্টিন বিশ্ব ইতিহাসে মহৎ মানুষ খুঁজতে গিয়ে বলেছেন : দার্শনিক, বক্তা, ধর্মপ্রচারক, যোদ্ধা, আইন রচয়িতা, ভাবের বিজয়কর্তা, ধর্মমতের ও প্রতিমাবিহীন কর্মপদ্ধতির সংস্থাপক, কুড়িটি পার্থিব রাজ্যের এবং একটি ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা-দেখো সেই মুহাম্মদকে। মানুষের মহত্বের যতগুলো মাপকাঠি আছে তা দিয়ে মাপলে কোন লোক তার চেয়ে মহত্তর হতে পারে?
রুশ লেখক লিও টলস্টয়-এর মন্তব্য : আমি মুহাম্মদ (সা:) থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবী ভ্রান্তির আঁধারে নিমজ্জিত ছিল। তিনি সেই আঁধারে আলো হয়ে জ্বলে উঠেছিলেন। আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য যে, মুহাম্মদ-এর আদর্শ প্রচার ও পথ নির্দেশ যথার্থ ছিল।
লালা লাজপত রায় বলেন : নিঃসংকোচেই বলতে পারি যে, হযরত মুহাম্মদ (সা:)কেই আমি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা ও ভক্তি করি। পৃথিবীর সকল ধর্মপ্রচারক ও সংস্কারকদের মধ্যে তাঁর স্থান সবার উর্ধ্বে।
এছাড়া গ্যাটে, গিবন, হিট্টি, মহাত্মা গান্ধী, নেহেরু, মিলটন, ঐতিহাসিক ডেনিসন, ড. মরিস বুকাইলি সহ অসংখ্য মনীষী মহানবীর উচ্চ প্রশংসা করেছেন। তাই বলতেই হয় : গভীর আঁধার কেটে ভেসে ওঠা গোলক হচ্ছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)।