মেঘনাপারের চরদিঘলদী গ্রামে

চৌধুরী ইশফাকুর রহমান কুরেশী
মানবাত্মার কল্পনা পরমাত্মা কোন না কোন সময় বাস্তবে রূপ দেন। আমার জীবনে এমন ভূরি ভূরি নজির আছে। পাঁচচল্লিশ বছর আগে ১৯৭৫ সালে আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। কবি আহসান হাবীবের একটি কবিতা আমি বারবার পড়তাম। কবিতাটির নাম ‘মেঘনা পাড়ের ছেলে’। পড়ার টেবিলে বসে নিরব হলেই মা মনে করতেন আমরা পড়ছি না। তাই সশব্দে একটা কিছু পড়তে হত। কি আর করা যায়, তাই পড়ি। গড় গড় করে পড়ি আমার প্রিয় শখের কবিতা- ‘মেঘনা পাড়ের ছেলে আমি, মেঘনা পাড়ে বাড়ি/ ইচ্ছে হলে এপার হতে ওপারে দেই পাড়ি’ কবিতাটি পড়ে পড়ে তন্ময় হয়ে তখন আমি সেজে যেতাম-‘মেঘনা পাড়ের ছেলে, আমি মেঘনা নদীর নেয়ে/ মেঘনা নদীর ঢেউয়ের বুকে তালের নৌকা বেয়ে, আমি বেড়াই হেসে খেলে, আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে’।
এত বছর পর বাল্যকালের সেই কল্পনারাজ্যের মেঘনা পাড়ের ছেলে আমি দুইদিনের জন্য হয়ে যাই স্রষ্টার অপার মহিমায়। সেই কল্পনার মেঘনা, সেই মেঘনা পাড়ের গ্রাম। সিলেট বিভাগের বাইরে বাংলাদেশের কোন গ্রামের ছেলে আমি এর আগে কোনদিন হইনি, কোন গ্রামে রাতে ঘুমাইনি। তবে হ্যাঁ, আমি এই মেঘনাপারের ছেলে হতে পেরেছি মেঘনা পাড়ে বেড়ে উঠা একজনের কল্যাণে, তিনি সাইদ আব্দুল্লাহ যীশু। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে তিনি যোগ দেন পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসারে।
যীশুর গ্রামটির নাম চরদিঘলদী। গ্রামের সামনে হাকালুকির মত প্রসারিত বিশাল মেঘনা। নীল জলে দোলে উঠা ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের হানাহানি। চর-দ্বীপ, দিঘল-লম্বা, দী-এলাকা। অর্থ- লম্বাদ্বীপ এলাকা, যেন নিউইয়র্কে লং আইল্যান্ড। এখানে বায়ু বিশুদ্ধ, পানি আকাশের মত নীল, উপরে মেঘের উড়াউড়ি। কেবল ঢাকা হতে আগত খালদিয়ে বিবর্ন জল আসে মেঘনায়, তবে তা এখনো মেঘনার বিশাল জলরাশিকে তেমন কালো করতে পারেনি। চরদিঘলদী ঢাকা হতে খুব একটা দূরে নয়। অথচ এই গ্রামে ঢাকার সেই শব্দ দূষণ নেই, বায়ু দূষণ নেই, নেই জল দূষণ। চরদিঘলদী এখনও প্রকৃতির রাজ্য। মানবসৃষ্ট নানান ভেজাল এসে গ্রামটিকে নষ্ট করে দেয়নি।
ঘন ঘন সিলেট যাওয়া বন্ধ। মহামারী করোনা আমাকে বন্দি করে রেখেছে ধানমন্ডির বাসায়। টিকেট করেও যাওয়া হয়নি তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রে। সহকর্মি যীশু মাঝে মাঝে বলে স্যার আসুন কোনদিকে ঘুরে আসি। আমার বয়স চৌয়ান্ন, তাই করোনা ভাইরাসকে ভয় না পেয়ে পারিনা। যাওয়া হয়না কোথায়ও, অফিস ও বাসায় থাকি এক স্বেচ্ছাবন্দি জীবনে। এমন কি করোনা ভীতি বাসার সামনের অনন্যসুন্দর ধানমন্ডি লেকপারের বাগানে আমার হাঁটাহাঁটিও বন্ধ করে দেয়।
এক বৃহস্পতিবার বিকেলে কোন প্রস্তুতি ছাড়াই একগুয়ে জীবন হতে শুন্য ব্যাগেজে যীশুর সাথে পালাই। অফিসে বসে ডিসিশন, সাথে সাথে বাস্তবায়ন। যীশু বলল, টুথব্রাশ কিনি। আমি বললাম, লাগবেনা। ব্রিটিশ অভিনেতা বেয়ার গ্রিলসের মত বুদ্ধি খাটিয়ে সারভাইভ করে নেবো। আমি টুথব্রাশ হিসাবে ব্যবহার করবো আম পাতা, যে পাতার রস টুথপেস্টের কাজ করে। লুঙ্গি না হয় একটা কিনে নেব।
আমরা মতিঝিল অফিস হতে বেরিয়ে সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের কাছে পুরান ঢাকায় যাই যীশুর বাল্যবন্ধু চরদিঘলদীর জাতক জামিল সাহেবের বাসায়। অনেক বছর পর পুরান ঢাকায় পা রাখা। জনতার ভীড় ও ঘনবসতি পেরিয়ে একটি ভবনের তিতলায় যাই। বাসা ঠান্ডা ও আরামদায়ক। বউ বাসায় নেই তাই সুদর্শন ফর্সা জামিল সাহেব একা বাসায় আছেন। তিনি গার্মেন্টসের বাইং হাউসে চাকুরী করেন। চরদিঘলদী গিয়ে পরার জন্য দুইটি সুন্দর দামী সার্ট তিনি আমাকে উপহার দেন। শোকরিয়া বলে সার্ট দুটি ব্যাগে ভরে নেই। আসলে সেদিন আমার সাথে পরনের পোষাক ছাড়া আর কোন জামা ছিলনা। তাই সার্ট দুটি মনে হল আপদকালে স্রষ্টার দান।
যীশু ও জামিল সাহেব এই প্রত্যন্ত গ্রাম হতে কঠিন সংগ্রাম করে বেরিয়ে এসে শিক্ষিত হন এবং চাকুরী নিয়ে রাজধানী ঢাকায় জীবনে স্থিত হন। তবে তাদের মনপ্রাণ পড়ে থাকে জনম মাটি চরদিঘলদী গ্রামে। চরদিঘলদী গ্রামের ছেলেদের সংগঠন ‘চরদিঘলদী পশ্চিমপাড়া আদর্শ বন্ধুমহল’। এই বন্ধুক্লাবের উপদেষ্টা এসব ছেলেদের উচ্চশিক্ষিত গুরুজন যীশু ও জামিল সাহেব। জামিল সাহেব বড়মনের মানুষ। তিনি প্রচুর অর্থ খরচ করে গ্রামের ছেলেদের জন্য একবস্তা কালো গ্যাঞ্জী কিনেছেন। প্রতিটি গ্যাঞ্জীতে লিখা আছে ‘চরদিঘলদী পশ্চিমপাড়া আদর্শ বন্ধুমহল’। ঢাকা থেকে বেশ কষ্ট করে ভারী কাপড়ের বড়বস্থা চরদিঘলদী বয়ে নিয়ে যান তাঁরা।
সায়দাবাদ এসে একপ্রান্তে আড়াইহাজারের বাস টার্মিনাল। এখানে আগের যুগের কয়েকটি পুরানো বাস দাড়ানো। টিকেট কেটে তিনজন সিটে বসি। গাড়ীর জনতা করোনার ব্যাপারে একদম বেপরওয়া। সবাই গাদাগাদি হয়ে বসে, অনেকের মুখে কোন মাক্স নেই। যীশু বলল ভয় পাবেন না স্যার, আমাদের গ্রামে করোনা ভাইরাসের কোন নামগন্ধ নেই। আমাদের লোকজনকে এই ভাইরাস কিছুই করতে পারবেনা। এসব গ্রামে কত ভাইরাস আসে আর যায়। লোকেরা জন্ম থেকে জীবাণু ও ভাইরাসের সাথে গলাগলি করে বেড়ে উঠে। ওদের শরীরে ভাইরাসের এন্টিবডি ঠাসা আছে। তাই আমাদের গ্রামের লোকজনের শরীরে প্রবেশ করলে করোনা ভাইরাস নির্ঘাত মারা পড়বে। চরদিঘলদী গিয়ে বুঝলাম, যীশু সত্য কথাই বলেছে। মেঘনা পাড়ের সংগ্রামী মানুষ ‘যাদের ঢেউয়ের সাথে গলাগলি ঢেউয়ের সাথে খেলা/ ঝড়ের সাথে লড়াই করে কাটে সারাবেলা’ তাঁরা কি আর করোনা ভাইরাসকে ডরায়।
আমাদের বাস কাচপুর পার হয়ে চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে আগায়। একসময় বাসটি বামের একটি ছোট রাস্তায় ঢুকে যায়। দুটি বাস ক্রস করতে বেগ পেতে হয় এই ছোট সড়কে। দুই একটি শিল্প কারখানা দেখা গেলেও এক সময় রাজধানী ঢাকার কোলাহল মুছে যায়। একদম খাঁটি পল্লী এলাকায় আমরা ঢুকে যাই। রাস্তার পাশে ধান ও পাট ক্ষেত। খাল ও জলায় মাছ ধরার নৌকা ও জাল। স্থানটি নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলা। বাস উপজেলা বাজারে ঢুকে। আড়াইহাজার উপজেলা শহর। লোকজনে ভরা বাজার। বাস বাজার পেরিয়ে আবার অজপাড়া গাঁয়ের তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে বাদসন্ধ্যায় গোপালদী আসে। গোপালদী বাজারের ভীড় ঠেলে বাজার পাশের নদীঘাটে যাই। মেঘনার একটি শাখানদীর পারে এই ঘাট।
গোপালদীর এই ঘাটে একটি বজরা নৌকার শক্ত ছইয়ের উপরে জুতা খোলে বসি। ৪০-৫০ জন আরোহী এসে পূর্ন হলে নৌকা ছাড়ে। নৌকা এই নদীপথে একটু গিয়েই এক বিশাল হাওরে পড়ে। হালকা বাতাস এসে গরমের অস্বস্থি তাড়িয়ে দেয়। আকাশে মেঘের আড়াল হতে বেরিয়ে আসে রূপালী চাঁদ। হাওরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে চাঁদের প্রতিবিম্ব ভেঙ্গে জলে ৩০-৪০ ফুট দিঘল সাদা কম্পমান চন্দ্রমুখ তৈরী করে। হাওরকে আমার চোখে মেঘনা বলে ভ্রম হয়। যীশু বলল, এটা মেঘনা নয়, বর্ষায় নদী ও হাওর মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
এবার মেঘনায় এলাম, প্রায় মাইল খানেক বিস্তারের বিশাল মেঘনা। বাংলার অহংকার মেঘনা, জল ঢেউ বাতাসের ঝাঁপটায় দোলে উঠা আবাহমান কালের সাক্ষী মহানদী মেঘনা। গরগর আওয়াজ তুলে ঢেউ ভেঙ্গে বজরা এপার হতে ওপারে পাড়ি দেয়। কোন ট্রলার কিংবা ইঞ্জিন নৌকা এগিয়ে আসতে দেখলে বজরার যাত্রিরা ভয় পান, মাঝিরা চিৎকার করে কথা বলে জানতে চান ওরা কারা? কারণ কি জানতে চাইলে যীশু বলে জায়গাটা নিরাপদ নয়। প্রায়ই মেঘনায় ডাকাতি হয়। মেঘনার একেক পারে একেক থানা। সবাই ঠেলাঠেলি করে, কেউ দায়িত্ব নেয়না। ঘুষ বাণিজ্য চলে অবাধে, তাই ঘুষখোর পুলিশ, ডাকাত ও অপরাধীরা এখানে বেশ নিরাপদেই অপকর্ম চালিয়ে যায়।
বজরা এসে এবার মেঘনার পূর্বপারের চরদিঘলদী গ্রামের ঘাটে নোঙ্গর করে। চরদিঘলদীর মেঘনারপারে আছে সরকারের তৈরী লম্বা ভাঙ্গন প্রতিরোধ দেয়াল। দেয়ালের পাশ দিয়ে গ্রামের সড়ক। গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে একটি ব্যস্ত ছোট নদী। এই ছোটনদী তার জননী মেঘনাকে উপহার দিতে বয়ে নিয়ে আসছে কাছের ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার পূবালী জল। এই ছোট নদীর পারে পাকা বাঁধ, পাশদিয়ে গ্রামের রাস্তা। নদীপারের গাছের সাথে বাঁধা সারি সারি নৌকা। নদীর তীরে তীরে ঘাট, এইসব ঘাটে ঘাটে নর-নারীরা গোসল করে, কাপড় কাঁচে। বাচ্চারা জলে ঝাঁপ দেয়, সাঁতার কাটে। চরদিঘলদীর শিশুরা খুব অল্প বয়সে সাঁতার শিখে। একটি বালক কয়েকটি কুকের খালি বোতলের মুখ বন্ধ করে রশি দিয়ে বেঁধে কৃত্রিম লাইফ জ্যাকেট বানিয়ে নেয়। যীশুর বাড়ি ছোট নদীর পারে। টিনের ছোট্ট ঘর, মেঝে পাকা। ছোট্ট জানালা দিয়ে তাকালে পাশের ছোট নদী এবং দূরের মেঘনা দেখা যায়। ছোট নদীর দৃশ্য অপরূপ, একটার পর একটা নৌকা, ট্রলার ও জেলে নাও ঢেউ তুলে চলে যায়। নদীপারের জলাবন ঢেউয়ে খানিক দোল খায়। যীশু ও আমি রাতে এই ঘরে ঘুমাই। টিনের ঘর বেশ ঠান্ডা ও আরামদায়ক। ভাসান জলের জন্য গ্রামটিতে বর্ষায় মশা জন্মাতে পারেনা। তাই মেঘনা পারের গ্রাম চরদিঘলদীকে ঘন বর্ষায় আমি মশাশুন্য পাই। রাতে মশারী ছাড়াই ঘুমাই। যীশু বলল, আমি প্রায়ই নৌকায় ঘুমাই। বাড়ির পাশের ছোটনদীতে সারি সারি ছইয়ে ঢাকা নৌকা নোঙর করা আছে। একটিতে ঢুকে ঘুমালেই নদীর শীতল বাতাস ঘুম পাড়িয়ে দেয়। যীশু নৌকায় ঘুমানোর প্রস্তাব দিলেও বিদেশ বিভূইয়ে এভাবে খোলা নৌকায় ঘুমিয়ে রাত পার করার সাহস আমার হলনা।
যীশুর ভাবী সিম্পল গৃহবধু। এক পুত্র ও দুই কন্যা নিয়ে তার সুখের সংসার। ভাই চাকুরী করেন চট্টগ্রাম। তিনি আমার জন্য বেশ যতনে রান্না করেন। শহরে দেশী মোরগ পাওয়া যায়না এবং হৃষ্টপুষ্ট হয়না। চরদিঘলদীতে দেশী পরিপুষ্ট মোরগের মাংস খেতে বেশ ভাল লাগে। বাড়িতে প্রচুর পোষা কবুতর, ভাবী কবুতরের রোস্ট খাওয়াতে চাইলে বলি, আমি কবুতর খাইনা। কবুতর নিরীহ প্রাণী, আমার জন্য কবুতরের প্রাণ যাক তা আমি চাইনি। গ্রামের ফ্রেস গরুর দুধ আমার ভাগ্যে জুটে।
৩রা সেপ্টেম্বর ২০২০। ‘চরদিঘলদী পশ্চিমপাড়া আদর্শ বন্ধুমহল’ ক্লাবের দ্বি-বর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠান চলছে, মাইক বাজছে। যীশুর সাথে অনুষ্ঠান সভায় যাই। সামিয়ানা ঘেরা তেরপাল ঢাকা সভাস্থল বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত। আমি মেঘনাপারের গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা দেখতে এসেছি। সামনের সারির চেয়ারে বসে একজন সাধারণ দর্শক হই। গ্রামের লোকজন এসে দর্শক প্রাঙ্গণ পূর্ন হল। প্যান্ডেলে বসেন চরদিঘলদী পশ্চিমপাড়া আদর্শ বন্ধুমহলের নেতৃবৃন্দ, গ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলনেতাবৃন্দ এবং ক্লাবের উপদেষ্টা যীশু ও জামাল সাহেব। আমাকেও প্রায় জোর করে নিয়ে প্যান্ডেলের এক আসনে বসানো হল। ক্লাবের দ্বিবর্ষ পুতির মোমবাতি জ্বালিয়ে কেক কাটা হয়, জাতীয় সঙ্গীত বাজে, জাতীয় ও ক্লাবের পতাকা উড়ে, সবাই দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানায়। নতুন কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়। সবাই হাততালী দিয়ে নতুন কমিটিকে বরণ করেন। আলোচনা সভায় চরদিঘলদীর নেতৃবৃন্দ ও ক্লাব সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। ক্লাব সদস্যদের উদ্দেশ্য মহৎ। গ্রামের উন্নয়ন, মানুষের উন্নয়ন, এলাকার সমস্যার সমাধানে একসাথে কাজ করা। উদ্দেশ্য একটাই-একে অন্যকে হাত ধরে টেনে উন্নত জীবনে নিয়ে যাওয়া। সদস্যরা অনেকে একে একে বক্তব্য রাখেন। শিক্ষার সমস্যা, বাল্য বিবাহ, মেয়েদের শিক্ষা জীবন হতে অকালে ঝরে পড়া, বেকারত্ব, ইভটিজিং ইত্যাদি সামাজিক ব্যাধি নিয়ে সবাই বক্তব্য রাখেন।
আমাকে মাইকে কিছু বলতে ডাকা হল। চরদিঘলদীর বন্ধুসভার বক্তব্যে বললাম, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, জকিগঞ্জ হতে সুন্দরবন, আমরা বাংলাদেশীরা এক অভিন্ন প্রতিবেশী। গ্রামের সাথে গ্রাম, জনপদের সাথে জনপদ, বাড়ির সাথে বাড়ি জোড়া লেগে লেগে আমাদের এই বাংলাদেশ হয়েছে। আমরা সবাই একে অন্যের প্রতিবেশী। তাই প্রতিটি গ্রাম বদলে গেলে বাংলাদেশ বদলে যাবে। আমরা প্রতিটি মানুষ বদলে গেলে গ্রামগুলো বদলে যাবে। এভাবে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশ হিসাবে দাঁড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ এক অপার সম্ভাবনার একটি দেশ। বাংলাদেশকে কেউ আটকে রাখতে পারবেনা যদি আপনি আমি সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাতে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাই।
বড় ডেগে খিচুড়ি রান্না করা হয়েছে। আমি খেতে চাইনি। আমাকে আবার গাড়ে ধরে খাওয়ানো হল। মুখে দিয়ে দেখি ভারি মজার খিচুড়ি। ডাল, মটর, ছোলা, আলু, গাজর ও কুচি কুচি চিকেনের মিশ্রণে পুষ্টিকর খাবার। আমাদের সিলেট এলাকার মানুষকে এমন খিচুড়ি বানাতে দেখিনি। এই খিচুড়ি ইচ্ছেমত খেয়ে কেউ কেউ বলল রাতের ডিনার হয়ে গেছে।
গ্রামের ছেলেদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হল বন্ধুক্লাব চরদিঘলদী গ্রামে অনেক মহৎ নেতা তৈরী করবে এবং তাঁরা একসময় সুনাগরিক হয়ে মেঘনাপার বদলে দেবে। এক সময় এই গ্রামে বাল্য বিয়ে থাকবেনা, ইভটিজিং থাকবেনা। সবাই শিক্ষিত হবে, কেউ বেকার থাকবেনা। পরবর্তী প্রজন্ম মানুষের মত মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে।
বন্ধুসভা হতে বের হয়ে দেখি মেঘনাঘাটে একটি বজরা সাজানো হচ্ছে। বজরার ছইয়ের উপর কাপড়ের পর্দা ও ছাদ বানিয়ে দুতলা করা হয়েছে। বজরা জুড়ে লাল-হলুদ-নীল মরিচ বাতি জ্বলানিভা করছে। যীশু ও জামিল সাহেব আমাকে পরদিন সকালে এই বজরায় বাংলার গর্বের নদী মেঘনা ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানালেন। মনে মনে বলি, প্রিয় মেঘনা, রাতে আসার বেলা তোমাকে ভাল করে দেখতে পাইনি, কালকে দেখে নেবো তোমার বুকে ঢেউ, কত জল।
দূর নৌকায় আলো জ্বলছে, ভিতর থেকে বাজনার সুর ভেসে আসছে। মেঘনাপারের তরুণেরা বন্ধুবান্ধব মিলে বজরায় গানবাজনা করে, তাস-পাশা খেলে কত যে চাঁদনী রাত পার করে, সে হিসাব কে রাখে। মাছ ধরা, সাঁতার কাটা, নৌবিহার, পারে বসে হাওয়া খাওয়া, এই মেঘনাপারে সবই এক একটা আনন্দের উৎস। মেঘনার বিশাল নির্জন প্রকৃতি হতে মেঘনাপারের মানুষ তাই জীবনের প্রতিদিনের আনন্দ ও সুখ খোঁজে নেয়। চরদিঘলদীর মেঘনার শাখা নদীর ঘাটে আমরা দুইদিনে তিনবার গোসল করি। সাঁতার কেটে ছোট নদী পার হই। নদী দিয়ে বয়ে যাওয়া ট্রলার ও ইঞ্জিন নৌকার ঢেউয়ে দোল খাই।
নদীপারের চাঘরে বসে চা খাই। মেহমানের জন্য দোকানের মুরব্বী খাঁটি দুধের সরদিয়ে চিনিহীন মজার চা বানান, এই চায়ের বিল পাঁচ টাকা দেওয়ার সুযোগ আমার কখনও হলনা। ছোটনদীর উপর সেতু, দুইপারে চরদিঘলদী বাজার। বাজার হতে ঔষধ কিনে নেই। কাছেই গ্রামের পাকা সুন্দর কবরগাহ। এখানে কাশবনের নিচে ঘুমিয়ে আছেন যীশুর জননী। পাশের খালের উপর একটি সদ্য নির্মিত সেতু সিরিয়ার যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভবনের মত ধ্বসে পড়েছে। কোন সিমেন্ট রড ছাড়াই সরকারের ঠিকাদার এই সেতুটি নির্মাণ করে সিংহ ভাগ অর্থ মেরে দেয়। উঁচু করে নির্মিত ঈদগাহ দেখি, এখানে ফলদার বৃক্ষ লাগানো হলে গ্রামবাসী উপকৃত হত।