রাজনীতিবিদ এম এ হক জনপ্রতিনিধি না হলেও ছিলেন জনসেবক

সাঈদ নোমান::
এমএ হক, পুরো নাম মোহাম্মদ আব্দুল হক। রাজনৈতিক নেতাকর্মীর কাছে তিনি ছিলেন ‘হক ভাই’ নামে পরিচিত। সিলেটের রাজনৈতিক, সামাজিক অঙ্গনে সাদা মনের মানুষ এমএ হক মহামারি করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত বছরের ৩ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সিলেটের কয়েকজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা জানান, রাজনীতিবিদ এমএ হক জনপ্রতিনিধি না হয়েও জনসেবক ছিলেন। তিনি ছিলেন সহনশীল উদারবাদী এক রাজনৈতিক নেতা। দলীয় কর্মকান্ড ছাড়াও নিজ দলের নেতাকর্মীর পাশাপাশি ভিন্ন দলের লোকজন বিপদে-আপদে তার কাছ থেকে অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয়েছেন। বিভিন্ন সময় জমি বিক্রি করেও দলীয় ও সাধারণ মানুষকে সাহায্য করেছেন তিনি।
সম্প্রতি এমএ হকের সোবহানীঘাটস্থ বেঙ্গল গ্যাসোলিনে গিয়ে দেখা যায়, তার একমাত্র পুত্র ব্যারিস্টার রিয়াশাদ আজিম হকের বসার রুমে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক বসে আছেন। তাদের কথাবার্তা থেকে জানা যায়, এমএ হকের জন্মস্থান সিলেটের বালাগঞ্জের কুলুমা থেকে তারা এসেছেন। এমএ হক জীবিত থাকাকালে তাদের মাদ্রাসায় অনুদান দিতেন। তাই, এবার তারা তার ছেলের কাছ থেকে অনুদান নিতে এসেছেন। রিয়াশাদ আজিম হক জানান, অনুদান প্রদানের জন্য তার পিতার আলাদা কয়েকটা নামের তালিকা করা আছে। এসব নামের তালিকা পাম্পের ম্যানেজারের কাছে আছে। তার পিতার নিয়ম অনুযায়ী তালিকা অনুসারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে ম্যানেজারের কাছ থেকে টাকা নেন। পাম্পের ম্যানেজার মনীন্দ্র কুমার সিংহ বলেন, তালিকায় বিভিন্ন লোক ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে তারা অনুদান নিতে আসে। কেউ না আসলে ফোন করে তাকে এনে টাকা দেওয়া হয়।
মনীন্দ্র কুমার সিংহ আরও বলেন, সর্বশেষ করোনার সময় ঈদুল ফিতরে যুবদল, শ্রমিকদল ও ছাত্রদলের যেসব নেতাকর্মী কারাগারে ছিলেন, তাদের পরিবারসহ হাজারখানেক পরিবারে তিনি সাহায্য পাঠান।
এমএ হক সর্বশেষ বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) ও সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির সভাপতি এবং আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। সিলেট মহানগর শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন মিয়া বলেন, তিনি প্রায় ২০ বছর এমএ হকের সহচর হিসেবে ছিলেন। দলীয় সভা-সমাবেশে তার মোটরসাইকেলে করে এমএ হক যেতেন। স্বপন মিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপির কোনো কর্মসূচি নিয়ে যখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতো, সংঘর্ষ বা অনাকাঙ্খিত ঘটনার আশংকা দেখা দিতো তখন এমএ হক উভয় দলের নেতাদের সাথে কথা বলে এসব পরিস্থিতি উত্তরণে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, ২০০৩ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। বিএনপি-জামায়াত জোট তখন ক্ষমতায়। এমএ হক জোট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটের দিন দুপুরের দিকে অবস্থা ভালো নয় দেখে এমএ হক বাসায় চলে আসেন। তখন ৩/৪টা কেন্দ্রে গণ্ডগোল সৃষ্টি করে ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে কিছু নেতাকর্মী তার কাছে অনুমতি চান। এসময় এমএ হক তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, ‘ তোমরা ইতা কাম কইরা আমারে আর শরম দিও না রেবা, এমনেউ বেশি শরম পাইলিয়ার।’
এমএ হকের যতরপুর নবপুষ্প ১৩০ নম্বর বাসায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীর থাকা-খাওয়ার স্থান ছিলো। বেগম খালেদা জিয়া সিলেট আসলে তার প্রিয় খাবার এ বাসা থেকেই রান্না হয়ে যেতো। সম্প্রতি বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এ নেতার বাসায় নিজের এবং দলীয় নেতাদের কোনো ছবি নেই। এ প্রসঙ্গে এমএ হকের স্ত্রী রওশন জাহান চৌধুরী বলেন, তিনি প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। পাশাপাশি ধর্মভীরু ছিলেন। তাই বাসায় তিনি ছবি বাঁধাই করে টানিয়ে রাখা পছন্দ করতেন না। তবে বড় একটি এ্যালবামে রাখা জাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তার অনেক ছবি এনে তিনি দেখান।
রওশন জাহান চৌধুরী বলেন, রাজনীতি ও সামাজিকতার বাইরে আত্মীয়স্বজনের কাছে দায়বদ্ধ হিসেবে তিনি অনেক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ভাইবোনের সন্তানরা তার বাসায় থেকে লেখাপড়া করেছেন। শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে একবেলা ৩৫জন লোকের খাবার তিনি রান্নাবান্না করেছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ কর্তৃক জাতীয়তাবাদী বিএনপির প্রথম সারির নেতৃবৃন্দের জীবন নিয়ে লিখিত বইয়ে এমএ হক সম্পর্কে এক জায়গায় বলেন, সিলেটের এমএ হক এর জাতীয়তাবাদী আদর্শের সাথে প্রথম সম্পর্ক শুরু হয় জাগো দলের মাধ্যমে। মেজর জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশুর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে পরিচয়। তখন জিয়াউর রহমান সিলেটে আসবেন। সিলেটের কোথায় যাবেন সেটি নিয়ে তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েন। তখন এমএ হকের পরামর্শ মতো হযরত শাহজালাল (রঃ) যে পথে সিলেট প্রবেশ করেছিলেন; সেই একই পথে বালাগঞ্জ দক্ষিণ সুরমা সড়কে হেঁটে সিলেট সফর করেন। দেওয়ানবাজার স্কুলে রাতযাপন শেষে পায়ে হেঁটে সিলামে এসে সমাবেশে ভাষণ দেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আর ওই সমাবেশে ভাষণদানকালে এমএ হক সিলেট-গহরপুর সড়কের দাবি জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে ওই সড়কের কাজও শুরু হয়। এই থেকে শহীদ জিয়ার উন্নয়নমুখী রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
এমএ হক ১ জুলাই ১৯৫৪ সালে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ানবাজারের কুলুমাগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-২ (বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি কাউন্সিলের মাধ্যমে সিলেট জেলা বিএনপির প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৪ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৩ ও ২০০৮ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির হয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১০ সালে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ২০১৬ সাল পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
এমএ হক জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত ৩০ জুন হাসপাতালে ভর্তি হন। একদিন পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ৩ জুলাই সকাল ১০টায় সিলেটের বেসরকারি নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান।
মৃত্যুর একদিন আগে তার করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হয়েছিল। জানাজা শেষে লাশ দাফনের পর সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে তাঁর নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন করোনা ‘পজিটিভ’ আসে। তাঁর এক ছেলে ব্যারিস্টার রিয়াশাদ আজিম হক ও এক মেয়ে সাজিদা হক সিমিকা।