‘শিকড়ের সন্ধান করলে, প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধেই ফিরতে হবে’

কবি ফকির ইলিয়াস সাহিত্যে বিচরণ করেছেন, বহুমাত্রিক মাঠে। লিখেছেন, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, কলাম, গান। তার লেখা গ্রন্থ সংখ্যা ২২টি। সমাজ ও প্রজন্ম বিনির্মাণে নিবেদিত এই কবি বসবাস করেন বিশ্বের রাজধানী বলে খ্যাত নিউইয়র্ক নগরে। গত ২৮ ডিসেম্বর (২০২০) কবির জন্মদিনে তাঁর সাথে কথা বলেছেন কবি ও সাংবাদিক আহমাদ সেলিম।
আহমাদ সেলিম: এই করোনাকালীন বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে বলুন।
ফকির ইলিয়াস: কোভিড ১৯ সাহিত্য সমাজের গতি প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। মানুষের কাছে থাকার কথা ছিল। সেই মানুষ এখন দূরে।
বিশ্বসাহিত্যে নতুন সংযোজন এই নয়া ধরণের মহামারী। তা নিয়ে লিখছেন না না ভাষার লেখকেরা।
এই মুহূর্তে যে বইগুলোর কথা মনে পড়ছে, সেগুলো হলো- প্যাট্রিশিয়া লকউড এর ‘প্রিস্টডেডি’, জাডি স্মিথ এর প্রবন্ধ সংকলন, ইলান স্টাভানস এর ‘এন্ড উই কেইম আউটসাইড এন্ড সো দ্যা স্টারস এগেইন’ নয়জন নবীন গল্পকারের বই ‘টুগেদার এপার্ট’, বিল হায়েস এর ‘হাও উই লিভ নাও’ ইত্যাদি অন্যতম।
প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। মানুষ শংকিত। কবিরা বিষাদিত। সেই ছায়া পড়েছে প্রায় সকল ভাষাভাষির লেখায়। অনেকগুলো প্রকাশিত হয়েছে। বেশির ভাগ এখনও বের হয়নি।
আহমাদ সেলিম: আপনি কি লিখলেন, কি বই আসছে?
ফকির ইলিয়াস: মহামারিকালীন সময়ে মধ্য মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত পুরোই ছুটিতে ছিলাম। নতুন ডাইমেনশনে বেশ কিছু কবিতা লিখেছি।
প্রবন্ধ লিখেছি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছে। অনলাইনে গিয়েছে।
জীবন তো থামার নয়। আমার ‘কবিতা সংগ্রহ-১’ বের করছে খ্যাতিমান প্রকাশনা চৈতন্য। ২০২১ এর মাঝামাঝি একটি প্রবন্ধের বই আসতে পারে। গানের সংকলনের কাজটি গুছিয়ে আনতে চাই আগামী বছরে।
আহমাদ সেলিম: আপনি সিলেটের মানুষ। স্থানিক বিবেচনায় এই সময়ে সিলেট বিভাগের সাহিত্য চর্চা নিয়ে কি বলবেন?
ফকির ইলিয়াস: দেখুন, সিলেটের সাথে আমার সম্পর্ক নাড়ির। আমি এই অঞ্চলের লেখকদের লেখা মনযোগ দিয়ে পড়ি।
৯০ দশকের পরে এই বিভাগে উজ্জ্বল কোনো লেখক এই মুহুর্তে আমার চোখে পড়ে না।
নব্বই দশকে একঝাঁক তরুণ কবি এসেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত। এর পরে আর কাউকে মোটা দাগে নজরে পড়ে না।
লেখালেখি করতে হলে আত্মাকে বড় ক্যানভাসে ধারণ করতে হয়। মৌলিক শিকড়কে লালন করতে হয়।
সংকীর্ণতা নিয়ে সাহিত্য হয় না। আর মনের, ভাবনার সীমাবদ্ধতা লেখককে পঙ্গু করে দেয়। পঠনে মনোযোগের অভাব এই বিভাগের তরুণ লেখকদের পিছিয়ে রেখেছে।
আহমাদ সেলিম: আপনি রাজনীতি সচেতন কবি। বিশ্বে রক্তপাত ও শান্তি বিষয়ে এই সময়ে কি ভাবছেন?
ফকির ইলিয়াস: বিশ্বে সাম্যের শান্তি প্রতিষ্ঠা আমার চিরদিনের চাওয়া।
ক্ষমতাধরদের রক্তপাত বন্ধ করতে হবে। মানুষকে মানুষের মূল্য দিতে হবে। দুর্নীতি গণমানুষের পাঁজর ভাঙছে সর্বত্র। তা রোধ করতে হবে। যুদ্ধের নামে প্রজন্মকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে।
আহমাদ সেলিম: প্রযুক্তি সাহিত্যের মাঠে কি ভূমিকা রাখছে?
ফকির ইলিয়াস: প্রযুক্তি সাহিত্যের সুবিধা যেমন দিচ্ছে, ক্ষতিও করছে প্রচুর। হাতে হাতে ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া সবাইকে কবি লেখক বানিয়ে দিয়েছে!
আমার কথা হচ্ছে, লিখুন। ৩০ ঘন্টা পড়ে ২ ঘন্টা লিখুন। সাধনা ছাড়া সিদ্ধি হয় না। প্রযুক্তির আবর্জনা বর্জন করে চলতে হবে আমাদের।
আহমাদ সেলিম: নতুন কবি’র প্রতি আপনার আহ্বান কি?
ফকির ইলিয়াস: এক কথাই। প্রস্তুতি নিয়ে আসুন। খালি হাতে বাণিজ্য হয় না। পুঁজি লাগে। পঠন পাঠন আপনার পুঁজি। বেশি করে মহান মুক্তিযুদ্ধের বই পড়ুন। ৭১ কে বুকে ধারণ করুন। জানুন।
মনে রাখুন, ৩০ লাখ শহিদের রক্ত ঋণ ছাড়া আপনি লেখক হতে পারতেন না। সমাজ সচেতন হয়ে, মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ান।
আহমাদ সেলিম: আপনার জন্মদিনে পাঠকের উদ্দেশ্যে কি বলবেন?
ফকির ইলিয়াস: আমি চাই মানুষ মানবিক হবে। সত্যের পক্ষে থাকবে। আলোময় বিশ্বের স্বপ্ন দেখবে। তা না হলে আমরা কেউই কৃত্রিম অন্ধকার থেকে বাঁচতে পারব না।
আহমাদ সেলিম : বাংলাদেশের তরুণদের কবিতাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
ফকির ইলিয়াস: অনেক তরুণ ই ভালো লিখছেন। তারা বিশ্বসাহিত্যের সাথে কম্পিট করেই লিখছেন। এটা আশার কথা।
কবিতায় একেবারে নতুন ট্রেন্ডকে ধারণ করতে হয়। এর পাশাপাশি বাংলা কবিতায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের তথ্য উপাত্ত আরও বিকশিত হওয়া দরকার। আমাদের তরুণ রা খুবই ডেডিকেটেড। যারা পিছিয়ে আছেন, তারা আলোকিতদের অনুসরণ করবেন এটাই নিয়ম। এটা নিশ্চিত করে বলি, আমি চলমান সময়ের মেধাবী তরুণদের কবিতার ঘনিষ্ঠ পাঠক।
আহমাদ সেলিম: : কবিতাকে কতটা মহিমান্বিত করেছে নারী?
ফকির ইলিয়াস: কবিতায় নারী সবমসময়ই মূল উপমা।
প্রেম আর প্রিয়তমা নিয়েই লেখা হয়েছে বিশ্বের সকল ভাষার অধিক সংখ্যক কবিতা। সম অধিকারে নারী, ধর্ষণের বিরুদ্ধে কবিতা, মানব জাগরণে নারী এমন অনেক বিষয় এখনও বিশ্বে কবিতার প্রতিপাদ্য বিষয়।
আহমাদ সেলিম: তরুণদের কবতায় মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্ট উচ্চারণ কম হচ্ছে কেন?
ফকির ইলিয়াস: তরুণদের অনেকে সম্প্রদায় ও মানবতা কে পরখ করতে পারছেন না। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি? চেতনা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক, সকল মানুষের, বাংলাদেশ।
তরুণরা যখন ৩০ লাখ শহিদের ত্যাগের দিকে তাকাবেন, তখনই দেখবেন প্রকৃত বাংলাদেশের ঝলক। ধর্ম পালন ভালো। ধর্ম কল্যাণ আনে। কিন্তু ধর্মের নামে সাহিত্যকে খুব সীমিত করে ফেললে তা ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
শিকড়ের সন্ধান করলে, প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধেই ফিরতে হবে।
এখনও মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক বিষয় -আশয় আছে, যে উপকরণ দিয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ কবিতা লেখা সম্ভব।
আহমাদ সেলিম: আপনাকে ধন্যবাদ
ফকির ইলিয়াস: আপনাকে ধন্যবাদ ও অশেষ কৃতজ্ঞতা। আমরা নান্দনিক সমাজ চাই। আমরা ক্রিয়েটিভ ওয়ার্ল্ড চাই। এর জন্য আমরা যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করতে পারি। শুভেচ্ছা, প্রিয় পাঠক-পাঠিকাকে।