শ্রদ্ধাঞ্জলি: আপন আলোয় রাবেয়া খাতুন

আহমাদ মাযহার
রাবেয়া খাতুনের জীবনাবসান ঘটল ৮৪ বছর পূর্ণ হবার পর। কেবল যে দীর্ঘ জীবনই তাঁর ছিল তা নয়, তিনি ছিলেন সাহিত্যিকতায় মুখরও। গল্প-উপন্যাস-ভ্রমণসাহিত্য-শিশুসাহিত্য- কথাসাহিত্যের নানা সংরূপে তাঁর সৃষ্টিসম্ভার বিপুল। সমাজের গভীরে যে ভাব স্রোতের প্রবহমান তাঁর শিল্পীসত্তা তাকে ধারণ করে রেখেছে। পঞ্চাশেরও বেশি উপন্যাসের রচয়িতা তিনি, সংকলিত ছোটগল্পের সংখ্যা চারশোর বেশি, ছোটদের জন্য লেখা গল্প-উপন্যাসের সংখ্যাও প্রচুর। অপ্সৃয়মাণ গ্রামীণ জীবনবোধের সমান্তরালে বুর্জোয়া নাগরিক জীবনোপলব্ধির জটিলতাকে তিনি নভেলার অনতিবিস্তৃতপরিসরে ও ছোটগল্পের মিতায়তনে পেরেছেন সম্পন্নভাবে ধারণ করতে। নিজে সংবেদী নারী ছিলেন বলে একইভাবে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনে নারীর মনস্তাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যের উপলব্ধিকে পেরেছেন রূপায়িত করতে। কিন্তু আমাদের সমালোচনাসাহিত্য যথেষ্ট বিচিত্রমুখী ও অগ্রসর নয় বলে তাঁর মতো একজন লেখকের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে যথেষ্ট পর্যালোচনা হয় নি। তাঁর প্রয়াণোত্তর এই স্মরণলেখ রচনাকালে এই অভাবটিই তাড়া করে ফিরছে।
এ-কথা অনেকেরই জানা যে, গ্রামসমাজ ও নাগরিকসমাজের পরিবর্তমানতা ধরা পড়েছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস মধুমতীতে (১৯৬৩)। ক্ষয়িষ্ণু তাঁতি সম্প্রদায়ের জীবন-সংকটের সঙ্গে নাগরিক উঠতি মধ্যবিত্তের জীবন-জিজ্ঞাসা ও ব্যক্তি মনের রোমান্টিকতা এতে উন্মোচিত। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরুর কালে ঢাকা অঞ্চলের মানুষের অবস্থান ছিল আধুনিকতা ও গ্রামীণতার সন্ধিতে। তাঁর প্রজন্মের লেখকদের আগে ঢাকাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত সমাজের জীবন-সংকটের পরিচয় তেমন একটা পাওয়া যায় না। উপন্যাস ও ছোটগল্পের আধারে তিনি ধারণ করে রেখেছেন গঠমান নগরবোধের সঙ্গে গ্রামজীবনের শিথিল সম্বন্ধকে। স্মরণীয় যে, এখনকার নগরের জীবনযাত্রার সঙ্গে চিরকালীন গ্রামীণ জীবনযাত্রার পার্থক্য দুস্তর; কিন্তু তাঁর যৌবন কালে পুরনো ঢাকা কাঠামোগত দিক থেকে নগর হিসেবে চিহ্নিত হলেও গাঢ় হয়ে ওঠেনি তার যথার্থ নাগরিক জীবন। তখনকার গঠমান সমাজমানসে সক্রিয় ছিল যে চেতনা-প্রবাহ তার অন্তরঙ্গ পরিচয় রয়েছে তাঁর উপন্যাসে ও গল্পে। পুরনো ঢাকার জীবনযাত্রার সেই সময়ের এই স্বাতন্ত্র্যকে রাবেয়া খাতুন স্বচ্ছভাবে তুলে আনতে পেরেছিলেন রাজাবাগ (১৯৬৭), বায়ান্নো গলির এক গলি (১৯৮৪) কিংবা সাহেব বাজার (১৯৬৯) প্রভৃতি উপন্যাসে।
বাংলাদেশের মানুষের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামী সত্তার পক্ষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর সংবেদনে নাড়া দিতো বলেই তাঁর গল্প-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য হয়েছে বারবার। নয় মাসের অবরুদ্ধ দিনের দিনলিপি একাত্তরের নয় মাস (১৯৯০) একদিকে হয়ে ওঠেছিল সহৃদয়হৃদয়সংবেদ্য সাহিত্য, অন্যদিকে প্রামাণ্য দলিল। মুক্তিযুদ্ধকালের পরিস্থিতি বাংলাদেশের মানুষের জীবনবোধকে কীভাবে বিবর্তিত করেছে তার পরিচয়ও খুঁজে পাই আমরা তাঁর কথাসাহিত্যে! মুক্তিযুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলো নিয়ে লিখিত হয় প্রথম বধ্যভূমি (২০০৪) ও পাখী সব করে রব (১৯৮৭) প্রভৃতি উপন্যাস; ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা হয়ে যায় ফেরারী সূর্য (১৯৭৫), ঘাতক রাত্রি (১৯৯৯), হিরণ দাহ (১৯৯৫), বাগানের নাম মালনিছড়া (১৯৯৫) ও হানিফের ঘোড়া (১৯৯৫) ।
আধুনিক চিকিৎসা-শাস্ত্র অধ্যয়নের ইতিহাস বেশি পুরনো নয়। বহুকাল ধরে প্রাকৃতিকতায় নির্ভরশীল হেকিম-কবিরাজদেরই কদর ছিল সমাজে। রাবেয়া খাতুনের মোহর আলী (১৯৮৫) উপন্যাসে সৃষ্ট চরিত্র মোহর আলীরা সেই ধারারই শেষের প্রজন্ম। সমাজের অপ্সৃয়িমাণ একটা জীবন বোধকে ধরে রেখেছেন তিনি। দূরে বৃষ্টি (২০০৩), ঠিকানা বি এইচ টাওয়ার (২০০৫), কুয়াশায় ঢাকা নগর বধূ (২০০৩), রমনা পার্কের পাঁচ বন্ধু (২০০৩) ইত্যাদি উপন্যাসে বিশ্বায়ন কবলিত নগরজীবনের সংকট ও স্বপ্নকে বা স্বপ্নভঙ্গকে ধারণ করেছেন। পল্লীজীবনের বিবর্তনকথা তিনি বলেছেন ই ভরা বাদর মাহ ভাদর (১৯৮৮) উপন্যাসে।
তাঁর স্বামী ফজলুল হক চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সিনেমা নামে চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা, যখন বাংলাদেশে চলচ্চিত্রেরও সূচনা ঘটেনি। সেখানে কর্মসূত্রে এবং নিজের উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ লাভের সূত্রে তাঁকে চলচ্চিত্র-জগতের মানুষ বললেও ভুল হবে না। সেই সুবাদে এই জগতের মানুষদের সম্পর্কে অনেক কাছ থেকে জেনেছেন। ফলে তিনি লিখে ফেলতে পেরেছেন রঙিন কাচের জানলা (২০০১) বা কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি (২০০৪) উপন্যাস। আসলে রুপালি পর্দার জীবনের অন্তরালে তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের ব্যক্তিক সংকটকেই উন্মোচন করেছেন এবং প্রকাশ করেছেন ঔপন্যাসিক হিসেবে নিজের জীবনোপলব্ধিকে।
গৃহকোণবাসী বাঙালি মুসলমান সমাজে তীর্থযাত্রা বলতে ছিল বিত্তশালীদের হজ। কিন্তু সে যাত্রারও সমৃদ্ধ ভ্রমণকাহিনী নেই তেমন একটা। বিশ শতকের মধ্যভাগে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশযাত্রার সূত্রে দেশভ্রমণ করলেও তাঁদের হাতে ভ্রমণসাহিত্য গড়ে উঠতে পারেনি। ব্যতিক্রমী রাবেয়া খাতুন ভ্রমণ শুধু ভালোই বাসতেন না, ভালোবাসতেন তার আনন্দ ও উপলব্ধিকে পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে। ভ্রমণসাহিত্য রচনাকে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করেছেন বলে তাঁর এই সংরূপের বইও অনেকগুলো। হে বিদেশী ভোর (১৯৯০), মোহময়ী ব্যাংকক (১৯৯১), টেমস থেকে নায়েগ্রা (১৯৯৩), কুমারী মাটির দেশে (১৯৯৪), হিমালয় থেকে আরব সাগরে (১৯৯৯), কিছুদিনের কানাডা (২০০০), চেরি ফোটার দিনে জাপানে (২০০১), কুমারী মাটির দেশ অস্ট্রেলিয়া (২০০৪), মমি উপত্যকা এবং অন্যান্য আলোকিত নগর (২০০৫) তাঁর উল্লেখযোগ্য ভ্রমণসাহিত্য। আরো অনেক লেখা পত্র-পত্রিকার পাতায় ছড়িয়ে আছে। এসবের মধ্য দিয়েও আমরা পাবো গ্রাম ও গঠমান নগরের দ্বান্দ্বিক জীবনপ্রতিসরণের রূপকে!
সরাসরি পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী না লিখলেও আত্মজৈবনিক স্মৃতিমূলক রচনা লিখেছেন প্রণিধানযোগ্য সংখ্যায়। একাত্তরের নয় মাস (১৯৯০) বইটির কথা তো আগেই উল্লিখিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর লেখা স্মৃতিকথায় কেবল নিজের কথা বলতেই ব্যাকুল থাকেননি, বরং নিজের হয়ে ওঠায় যে-সব মানুষের প্রভাব ও ভূমিকা রয়েছে তাঁদের কথা বলেছেন। স্বপ্নের শহর ঢাকা (১৯৯৪), স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোয় যাঁদের দেখেছি (২০০৫), চোখের জলে পড়ল মনে (২০০৮) প্রভৃতি বইয়ে তাই নিজের ব্যক্তিজীবন নয়, পরিবারের ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল যে-সব ব্যক্তির সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তাঁদের মমতাময় ছবি পাওয়া যায়।
আপনা আপনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালির চিরকালের লোক-সংস্কৃতির সম্পদকে রাবেয়া খাতুনের সহজাত প্রতিভা নিয়েছে আত্মস্থ করে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার ও জসীম উদ্দীন নির্দেশিত পথে চলা রাবেয়া খাতুনের শিশুসাহিত্যের মাধুর্য আমাদের শৈশব-কৈশোরকে রাঙিয়ে রেখেছে। কথকতার সৌন্দর্যকে তিনি যেমন রূপকধর্মী গদ্যে হাজির করতে পেরেছেন তেমনি নিপুণতায় বাক্সময় করতে পেরেছেন আধুনিক নগরজীবনের পরিবর্তমান শিশুমনস্তত্ত্বকেও। তিনি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীরও লেখক- দুঃসাহসিক অভিযান (১৯৬৭) যার নিদর্শন। নগরজীবনের পটভূমিকায় লেখা সুমন ও মিঠুর গল্প (১৯৭৮) তো আধুনিক ক্ল্যাসিকই হয়ে উঠেছে। ছোটদের জন্য লেখা একাত্তরের নিশান (১৯৯২) উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ উপস্থিত রয়েছে সরাসরি। ইতিহাসের ঘটনা যে মানুষের মধ্যে জীবনবোধের পরিবর্তন ঘটায় তার পরিচয় রয়েছে ছোটদের জন্য লেখা তাঁর তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৯৮১) উপন্যাসে। ভ্রমণসাহিত্যের লেখক হিশেবে বিবেচনা না-করে যেমন তাঁর কথাসাহিত্যিক সত্তার সম্পন্নতাকে অনুভব করা যায় না তেমনি তাঁর চলো বেড়িয়ে আসি (২০০১)-এর কথা উল্লেখ না-করলে তাঁর শিশুসাহিত্যিক সত্তাকেও পরিপূর্ণভাবে ধারণ করা যায় না। এই বইয়ে প্রধানত বাংলাদেশের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য স্থানে ভ্রমণের কথা বলা আছে। বইটি ছোটদের কেবল ভ্রমণেই উৎসাহী করে তোলে না, তাদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে দেশাত্ম বোধ বা দেশের প্রতি ভালোবাসা।
প্রধান প্রধান রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়া সত্ত্বেও এবং গণমাধ্যমের আলোয় প্রায় সবসময়ই আলোকিত থাকার পরও রাবেয়া খাতুনের সাহিত্য রয়ে গেছে অনালোচিত। এই অপরিচয়েরই নিদর্শন আমরা পাই মৃত্যুত্তর কালে গণমাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বিশিষ্টজনদের ভাষ্যে। কেবল বিনোদনের উপলক্ষ হিসেবে সাহিত্যকে যে রাবেয়া খাতুন বিবেচনা করেননি, বরং সাহিত্যচর্চাকে ভেবেছেন জীবন-উপলব্ধির মাধ্যম হিসেবে তার সম্যক উপলব্ধির জন্য তাঁর সাহিত্যের নির্মোহ ও অনুসন্ধানী পর্যালোচনা জরুরি। আশা করি সে পথেই উত্তরপ্রজন্মের মানুষেরা একদিন হাঁটবেন!