সিলেটের সীমান্ত এলাকায় তৎপর মাদক কারবারীরা

# একের পর এক ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে # এক বছরে ১১ কোটি ১৩ লাখ টাকার মাদক উদ্ধার # এ্যাকশন চলবে -ডিআইজি

কাউসার চৌধুরী:
কক্সবাজারের পর এবার সিলেটের সীমান্ত এলাকাকে টার্গেট করেছে মাদক কারবারীরা। সিলেটের সীমান্ত এলাকায় ইয়াবার কয়েকটি বড় চালান ধরা পড়ায় বিষয়টি সামনে এসেছে। সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জের রাজনীতিবিদ থেকে জনপ্রতিনিধিরাও ইয়াবার কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, গত বছর সিলেট বিভাগে ১১ কোটি ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬২০ টাকার ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২ হাজার ৪৮৫ জনকে। গ্রেফতারকৃতদের বেশিরভাগই মাদকের কারবারী।
সিলেটের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ (পিপিএম) সিলেটের ডাককে বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে রয়েছে পুলিশ। মাদক নির্মূলে পুলিশ সবসময় অভিযান চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনসাধারণেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি অভিভাবকদেরকেও সন্তানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, মাদক বিরোধী এ্যাকশন চলবে।
ট্রাক চালক থেকে জনপ্রতিনিধিও সম্পৃক্ত
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-ঢাকা জাতীয় মহাসড়কের নরসিংদীর নারায়ণপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পাথরবাহী একটি ট্রাকে তল্লাশী করে ১০ হাজার পিস ইয়াবা, ২৭০ বোতল ফেনসিডিল ও নগদ ৫৫ হাজার টাকা উদ্ধার করে নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে গোপন সংবাদ পেয়ে অভিযানটি চালানো হয়। গ্রেফতার করা হয় ট্রাক চালক তাজ উদ্দিনকে। সে জকিগঞ্জ উপজেলার সোনাসার গ্রামের ছলু মিয়ার পুত্র। মাদকের চালান নিয়ে সে রাজধানীতে যাচ্ছিল। সিলেট থেকে পাথরবাহী ট্রাক নিয়ে কৌশলে সে রওয়ানা দেয়।
সিলেট থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে করে মাদকের চালান ঢাকা যাচ্ছে-এমন সংবাদের ভিত্তিতে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চুনারুঘাট উপজেলার উবাহাটা এলাকায় নতুন ব্রীজ গোল চত্বরে অবস্থা নেয় হবিগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। গোল চত্বরের পাশের চেকপোস্টে হানিফের বাসটিকে থামিয়ে তল্লাশি শুরু করলে ২ নারী বাস থেকে নেমে যায়। পুলিশ ২ নারীকে গ্রেফতার করে। এ সময় তল্লাশী করে নাহিদা বেগমের পেট ও বুক থেকে ১৫৫ প্যাকেটে ৩১ হাজার পিস ও শাহিনা খাতুনের পেট ও বুক থেকে ১৫০ প্যাকেটে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় তাদের ব্যবহৃত দু’টি মোবাইল ফোন। গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনা ঘটে। পরদিন রাতে ২ নারী হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুলতান উদ্দিন প্রধানের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়।
বিশ্বনাথ উপজেলার শিমুলতলায় অভিযান চালায় সিলেট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। ২২ জুলাই রাতে পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিনের নির্দেশে অভিযানটি পরিচালিত হয়। সাঁড়াশি এই অভিযানে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা, ইয়াবা বিক্রির ২৯ হাজার টাকাসহ মাদক ব্যবসায়ী খালেদ মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবা বিক্রির কাজে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। গ্রেফতারকৃত খালেদ মাদক ব্যবসায়ী দুলু মিয়ার সহোদর। দুলু মিয়াও এ ঘটনার আগে মাদকসহ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিল। বড় ধরনের চালানগুলো আটকের পর সিলেটে বিভাগের সর্বত্র বিশেষ নজরদারী বৃদ্ধি করে পুলিশ। বাড়ানো হয় গোয়েন্দা তৎপরতা।
সূত্র জানায়, জকিগঞ্জ পৌর যুবলীগের সভাপতি শাহরিয়ার রহমান ইতোপূর্বে ইয়াবাসহ নগরীর দরগাগেইটে আটক হয়েছিলেন। একইভাবে ইয়াবা পাচারের ঘটনায় আটক হয়েছিলেন জকিগঞ্জের খলাছড়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য শাহিন আহমদ ও ৬নং ওয়ার্ড সদস্য শাহাব উদ্দিন। কাড়ি কাড়ি টাকার লোভে পড়ে সীমান্ত এলাকা জকিগঞ্জের বিভিন্ন পেশার লোকরা ইয়াবা পাচারে জড়িয়েছেন। জকিগঞ্জ থানার ওসি মীর মোঃ আব্দুল জাহের সিলেটের ডাককে জানান, গত বছরে জকিগঞ্জ থানায় ইয়াবা সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১০৯টি। এতে গ্রেফতার হয়েছেন ১৪৯ জন মাদক কারবারী এবং ৩৫ হাজার ২৫২ পিস উদ্ধার করেছে পুলিশ। ফেনসিডিল উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ৩৮৪ বোতল।
১১ কোটি টাকার মাদক উদ্ধার
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) ৩ কোটি ২ লাখ ২৩ হাজার ২৭০ টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে, ৫৫ হাজার ৩০৭ পিস ইয়াবা, ফেনসিডিল ১ হাজার ১৮৭ বোতল, ৭২ কেজি গাঁজা, ১৩ বোতল বিদেশী মদ, ৬ হাজার ২৮৬ লিটার চোলাই মদ, ৫০৫ বোতল অফিসার্স চয়েজ, ৬ গ্রাম ও ২ পুরিয়া হেরোইন, হুইস্কি ৩ বোতল, বিয়ার ২ ক্যান, ৫ হাজার ৪৫০ লিটার ওয়াশ, ভারতীয় হুইস্কি ৩ বোতল, গাঁজার গাছ ২টি, জি-পেথেডিন ইনজেকশন ১২ এ্যাম্পল, জি-মরফিন ইনজেকশন ১ এ্যাম্পল, সেন্ট্রাডল ২০টি ও চোলাই মদ তৈরির উপকরণ ৫ হাজার ৪৫০ লিটার।
জানা গেছে, সিলেট রেঞ্জ ডিআইজির অধীনস্থ বিভিন্ন ইউনিট গত বছর অভিযান চালিয়ে ৮ কোটি ১১ লাখ ১০ হাজার ৩৫০ টাকার মাদক উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে, ১ লাখ ৭১ হাজার ৭১৬ পিস ইয়াবা, ১ হাজার ৯৯ কেজি গাঁজা, ৫৫ গ্রাম ও ২০ পুরিয়া হেরোইন, ৪ হাজার ৫০৯ বোতল অফিসার চয়েস, ৯৫২ বোতল বিদেশী মদ, খোলা মদ সাড়ে ৮ লিটার, ফেনসিডিল ৫ হাজার ৭৩৩ বোতল, দেশী মদ ৫ হাজার ৪১১ লিটার, ভারতীয় কোভিন সিরাপ ২২ বোতল, ৪ হাজার ২৭৭ লিটার ওয়াশ, স্প্রিট ৫ লিটার, স্কাপ কফ সিরাপ ২৮ বোতল, মাদক উৎপাদনের কাঁচামাল ২৫ লিটার ও ২১০টি গাঁজা গাছ। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করে পুলিশ।
কারাগারে ২৪৮৫ মাদক কারবারী
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর সিলেট বিভাগে ১ হাজার ৯৫০টি মাদক মামলা রেকর্ড হয়েছে। এ সকল মামলায় ২ হাজার ৪৮৫ জন গ্রেফতার হয়। যাদের প্রায় সবাই মাদক কারবারী। সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) এর ৬ থানায় রেকর্ডকৃত মামলার সংখ্যা ৫৩৮টি। এতে গ্রেফতার হয় ৬০৫ মাদক কারবারী। সিলেট রেঞ্জ পুলিশের থানা সমূহে মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৪১২টি। গ্রেফতার হয় ১ হাজার ৮৮০ মাদক কারবারী। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৩৮৬টি মামলায় গ্রেফতার হয় ৪৪৯ জন। মৌলভীবাজার জেলায় ৪০৪ মামলায় ৫৫২ জন গ্রেফতার হন। হবিগঞ্জ জেলায় ২৮২ মামলায় ৪২৩ জন গ্রেফতার হন। সুনামগঞ্জ জেলায় ৩৪০ মামলায় গ্রেফতার হয় ৪৫৬ মাদক কারবারী।
এ্যাকশন অব্যাহত থাকবে
সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের সিলেটের ডাককে বলেন, নগরীর সকল পাড়া-মহল্লায় পুলিশ নজরদারী করছে। মাদক বিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাদক নির্মূল করা সম্ভব হলে অপরাধও কমে আসবে।
সিলেটের রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মোঃ জেদান আল-মুসা বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পোশাকের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা টিমও বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিরোধী কাজ করছে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এ্যাকশন অব্যাহত থাকবে।