সিলেটে সন্তানের জন্মনিবন্ধনে পিতা-মাতার সীমাহীন ভোগান্তি

নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় জড়িতদের সাথে ঘটছে প্রতিদিনই বাকবিতন্ডা

নূর আহমদ::
দেশে নতুন নিয়মে সন্তানের জন্মনিবন্ধন করতে প্রয়োজন বাবা ও মায়ের জন্মনিবন্ধনের কাগজ। বাবা কিংবা মায়ের জন্মনিবন্ধনে প্রয়োজন পড়ছে তাঁদের বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন। অর্থাৎ শিশুর জন্মনিবন্ধনে দাদা-দাদীর জন্মনিবন্ধনের কাগজের প্রয়োজন পড়ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শাখার নতুন সার্ভার সিস্টেমে এমন তথ্য প্রদান করতে হচ্ছে। সারা দেশের মতো সিলেট অঞ্চলেও আগে নিবন্ধন না করা কিংবা সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর নিবন্ধন করতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছেন অনেক অভিভাবক। এ নিয়ে পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন ভোগান্তি।
সন্তানকে স্কুলে ভর্তি, স্কুলের উপবৃত্তি প্রাপ্তিতে জন্মসনদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় অভিভাবকরা এখন ছুটছেন নগর ভবন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদে। তবে, বিপুল সংখ্যক অভিভাবককে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। এ নিয়ে প্রতিদিনই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িতদের সাথে ঘটছে বাকবিতন্ডা।
বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বছরের শুরুতে স্কুলে ভর্তির জন্য প্রস্তুত শিশুদের অভিভাবকদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। কোনো কারণে নামের ভুল হলে ভোগান্তি যেন আরো চরমে। সংশোধনের কোনো নিয়ম জানা নেই বলে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র থেকে। নতুন সিস্টেম সম্পর্কে এখনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি সংশ্লিষ্টদের। এতে অজানা থাকছে অনেক বিষয়।
অন্যদিকে নতুন সিস্টেমে ‘আদি’ পুরুষের নিবন্ধন নিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে জন্মনিবন্ধন করতে আসা প্রতিটি নাগরিকের। জন্মনিবন্ধনের প্রয়োজনে লাগবে বাড়ির হোল্ডিং কর পরিশোধের রশিদ, ভাড়াটিয়া হলে মালিকের। শিশুর জন্মের নিশ্চয়তার জন্য প্রয়োজন চিকিৎসকের সনদ। এসব প্রক্রিয়া শেষে শিশুর জন্মনিবন্ধন পেতে লেগে যাচ্ছে দিনের পর দিন। এ নিয়ে অনেকটা দিশেহারা অভিভাবকরা।
জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আব্দুল কাইয়ুম জানান, গত ডিসেম্বর মাস থেকে নতুন সার্ভারের পরিবর্তনজনিত কারণে জন্মনিবন্ধন অনেকটা বন্ধ ছিলো। চলতি বছরের শুরুতে নিবন্ধন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। নতুন পাসওয়ার্ড না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত তার ইউনিয়নে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তিনি নিবন্ধন সেবা প্রত্যাশীদের ভিড় সামলাতে গিয়ে অনেক সময় দায়িত্বপ্রাপ্তরা দুর্ব্যবহারেরও শিকার হচ্ছেন বলে জানান। বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ানবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুল আলম জানান, স্কুলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির ২০২০ সালের বকেয়া টাকা প্রদানের জন্য নতুন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একটা সময় টিকার কার্ড দিয়ে ভর্তি হওয়া যেতো। ফলে গ্রামের অনেক অসচেতন বাবা-মা সন্তানের জন্মনিবন্ধন করতে বিলম্ব করেন। বর্তমানে জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। জন্মনিবন্ধন সরবরাহ করতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি প্রাপ্তি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ দিলোয়ার হোসেন জানান, বর্তমান জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া সরকার নতুন সিস্টেমে রূপান্তর করেছে। এতে নতুন নতুন তথ্য চাওয়া হয়েছে। সন্তানের জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি নাম্বার কিংবা বাবা-মা’র জন্মনিবন্ধন করতে তাদেরও বাবা-মার জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি নাম্বার চাওয়া হচ্ছে নতুন সিস্টেমে। তিনি বলেন, সন্তানের জন্মনিবন্ধন করতে আসা সাধারণ নাগরিক অনেকটা বুঝতে চান না। এ নিয়ে নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে সেবাপ্রদানকারীরা। তিনি সাধারণ লোকজনকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণের অনুরোধ জানান।
খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা নাজিউর রহমান খান নাদিম জানান, রূপান্তরিত সার্ভারে তিনি প্রবেশ করতে পেরেছেন, তবে নিবন্ধন করতে গেলে সার্ভার অনেক সময় ডাউন হয়ে যায়। এতে কাঙ্খিত সেবা প্রদানে বিঘ্ন ঘটছে। বিষয়গুলো সেবা প্রত্যাশীদের বুঝাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কানাইঘাটের বড়চতুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হোসেন চতুলী জানান, তার ইউনিয়নের বাসিন্দারা জন্মনিবন্ধন সেবা থেকে অনেকটা বঞ্চিত। এতে সাধারণ নাগরিকের তোপের মুখে পড়তে হয় তাদের।
একই উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহমুদুর রহমান জানান, রূপান্তরিত সিস্টেম সম্পর্কে তাদের কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি, আবার স্কুলে ভর্তিসহ নানা প্রয়োজনে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক হওয়ায় এর চাপ বেড়েছে। তবে সেবা দেয়া যাচ্ছে না।
সরেজমিনে সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নে দেখা হয় সালেহপুর গ্রামের আব্দুল খালিকের সাথে। তিনি জানান, তার মেয়ের জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে নামের বানান ভুল হয়ে যায়। এতে ভর্তি করতে রাজি হয়নি হাইস্কুল কর্তৃপক্ষ। পরে ইউপি চেয়ারম্যানকে দিয়ে প্রধান শিক্ষককে ফোন করিয়ে পরবর্তীতে সংশোধন করে দেয়ার শর্তে তার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করার ব্যবস্থা করা হয়।
দক্ষিণ সুরমার মোল্লারগাঁও ইউনিয়ন সুকলামপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আলী জানান, আগে শুধু অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দিয়ে সন্তানের জন্মনিবন্ধন করা যেতো। এখন আমাদের জন্মনিবন্ধনও চাওয়ায় বিপাকে পড়তে হয়েছে। আগের নিয়মে সহজভাবে জন্মনিবন্ধনের দাবি জানান তিনি।
সিলেট জেলা মনিটরিং অফিসার (উপবৃত্তি) সোহেল মোল্লা জানান, উপবৃত্তির জন্য শিক্ষার্থীদের জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক। ফলে অনলাইনে নিবন্ধন করতে গেলে জন্মনিবন্ধন না থাকলে আবেদন গ্রহণ করে না। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের জন্মনিবন্ধন যাতে দ্রুত করা যায়, তার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শাখার চিঠি দেয়া হয়েছে। সব উপজেলায়ই এমন সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সিলেটের উপপরিচালক মীর মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শাখার নতুন সার্ভার সিস্টেমে রূপান্তর করা হয়েছে। কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, তবে ধীরে ধীরে সমস্যা কেটে যাবে। তিনি বলেন, এটা শুধু একাই সিলেট অঞ্চলের নয়, পুরো দেশে। সারা দেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সিলেটেও স্বাভাবিক হবে।