সুনামগঞ্জে মহাসড়ক দাপাচ্ছে অবৈধ পরিবহন, বাড়ছে মৃত্যু
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১২ আগস্ট ২০২৫, ৩:৫০:৩১ অপরাহ্ন
শহীদনূর আহমেদ, সুনামগঞ্জ থেকে: সুনামগঞ্জের সড়ক-মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে উচ্চ আদালত কর্তৃক অবৈধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও নিষিদ্ধ সিএনজি চালিত অটোরিকশা। বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে এসব যানবাহন। ঝুঁকিপূর্ণ এসব যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ নেই, বরং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সংখ্যা। সড়কের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অবৈধ এসব পরিবহন চলাচল করায় বেড়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
ফলে প্রতিনিয়ত জেলায় দীর্ঘ হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের মিছিল। কার আশকারায় সড়কে বাড়ছে অবৈধ পরিবহনের দৌরাত্ম্য এমন প্রশ্ন সাধারণের।
যাত্রীদের অভিযোগ, স্থানীয় বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের লোক দেখানো অভিযান ও নীরবতার কারণে এসব অবৈধ পরিবহন চলাচলে স্থায়ী সমাধান আসছে না। সুনামগঞ্জে মহাসড়কে সাম্প্রতিক অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনেই সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র বলছে, সুনামগঞ্জ জেলায় বিআরটিএ কর্তৃক অনুমোদিত সিএনজি রয়েছে ৪ হাজার ৬০০। বাস্তবে অনুমোদিত সিএনজি রয়েছে এই চেয়ে দ্বিগুণ বেশি। জেলার মহাসড়ক ও অভ্যন্তরীণ সড়কে প্রায় ১৫ হাজার সিএনজি চলাচল করছে বলে জানিয়েছে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো। জেলা শহরসহ উপজেলাগুলোতে ১০ হাজারের অধিক ব্যাটারি চালিত অবৈধ অটোরিকশা চলাচল করছে বলে জানা যায়।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ৪৭(২) ধারা অনুযায়ী মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ। এই ধারায় ‘সড়ক বা মহাসড়কে চলাচলের অনুপযোগী’ যানবাহনের সংজ্ঞায় নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক, মোটরচালিত রিকশা বা ভ্যান এবং সরকার বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সময়ে সময়ে নিষিদ্ধ বা বিধিনিষেধ আরোপ করা অনুরূপ যানবাহনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ সুনামগঞ্জের জেলা শহর ও উপজেলা শহরে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে এসব অবৈধ যানবাহন।
এসব অবৈধ যানবাহনের চালকদের অধিকাংশই অদক্ষ, লাইসেন্সবিহীন এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা তাদের মধ্যে প্রকট। দ্রুতগতিসম্পন্ন বাস, ট্রাক ও অন্যান্য ভারি যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার কারণে এবং মহাসড়কে হঠাৎ ইউটার্ন নেওয়া, উল্টোপথে প্রবেশ, ওভারটেকিংয়ের চেষ্টা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলোর চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংশ্লিষ্টতা উদ্বেগজনকহারে বেশি, যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সিএনজি চালিত অটোরিকশার যাত্রীরা আহত হচ্ছেন অথবা প্রাণ হারাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে মহাসড়কে অবৈধ অটোরিকশা চলাচল বন্ধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ, হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৫২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে শতাধিক মানুষ আহত হন। যাদের অধিকাংশই সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও, তা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অভিযান শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়। যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই অভিযানগুলো কেবল সাময়িক পদক্ষেপ মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে অভিযানের খবর আগে থেকেই চালকদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তারা অভিযান চলাকালীন সময়ে মহাসড়ক এড়িয়ে চলেন এবং অভিযান শেষে আবার পুরোদমে চলাচল শুরু হয়।
সূত্র বলছে, প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক ও চালকদের যোগসাজশ রয়েছে। তাদের মধ্যে উৎকোচ লেনদেন হওয়ায় অবৈধ অটোরিকশা চলাচল বন্ধ হচ্ছে না। মোটা অংকের মাসোয়ারার বদৌলতে মহাসড়কে দাপাচ্ছে অবৈধ যানবাহন। এতে সরকারের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক কঠোর নীতিমালা ও আইনগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে, বাস্তব রূপ পাচ্ছে না।
নিরাপদ সড়ক চাই সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সহ সভাপতি ওবায়দুল হক মিলন বলেন, সুনামগঞ্জের সড়ক পথ সিএনজি ও অবৈধ অটোরিকশার দখলে। নিষিদ্ধ পরিবহন কিভাবে সড়কে চলাচল করে তা আমাদের বুঝে আসছে না। প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসব অবৈধ যান। এর নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। ফিটনেসবিহীন পরিবহন, লাইসেন্সবিহীন চালক ও ট্রাফিক আইন না মানায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। আমরা আশা করি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সড়কপথ নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত করবেন।
জয়কলস হাইওয়ে পুলিশ সুমন কুমার চৌধুরী বলেন, মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধে আমরা হার্ডলাইনে রয়েছি। অবৈধ সিএনজির বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। প্রতিদিনই মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।




