সিলেটে সিজিএস আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা
ভয়মুক্ত ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র শুধু কথায় থাকবে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১০:০৫ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার: ভয়মুক্ত ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র শুধু কথায় থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন সিলেটের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোট ব্যাংক নয়, তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সোমবার সকালে সিলেটে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “প্রতিটি কণ্ঠের মূল্য: সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ ও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে এমনটি বলেন বক্তারা।
সিলেট নগরীর একটি হোটেলের হলরুমে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকে নাগরিক সমাজ, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও মতামতের গুরুত্ব, বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় নিয়ে আসা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয় ও নির্ভীক ভূমিকা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো আলোকপাত করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে গণতন্ত্রের একটি মূল মানদণ্ড হিসেবে দেখতে হবে, কোনো পার্শ্ব ইস্যু হিসেবে নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৬ শতাংশ হলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচিতে তাদের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পায় না। নির্বাচনের সময় অনেক দল তাদেরকে ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করলেও নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ কম দেখা যায়। এই সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি কাঠামোগতও বলে তিনি মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, সিলেট মহানগর-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর, পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট মহানগর-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট মলয় পুরকায়স্থ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সিলেট জেলা-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ইকবাল সিদ্দিকী, খাসিয়া সোশ্যাল কাউন্সিল-এর সেক্রেটারি অনিলজয় ডিকার, খাসিয়া নারী প্রতিনিধি হিলদা মুকিম সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি সমর বিজয় সী শেখর, আইনজীবী রনেন সরকার রনি, পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদের সভাপতি গৌরাঙ্গ পাত্র, এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লক্ষ্মীকান্ত সিংহ, চা শ্রমিক নেতা হরি সবর, চা শ্রমিক নেত্রী শেলী দাস, সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন, সিলেট-এর সমন্বয়ক আব্দুল করিম কিম, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রণবকান্তি দেব, ওঁরাও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মিলন ওঁরাও, সচেতন নাগরিক কমিটি, সিলেট-এর সভাপতি এড. সৈয়দা শিরিন হক, প্রেসবেট্রিয়ান চার্চ-সিলেটের চেয়ারম্যান ডিকন নিঝুম সাংমা, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট-এর সদস্য সচিব রাজিব কুমার দে, হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থা, সিলেট-এর সভাপতি মিস সুকতা, হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থা, সিলেট-এর কোষাধ্যক্ষ মুক্তি, বাংলাদেশ দলিত পরিষদ, সিলেট বিভাগের সভাপতি মিলন রবিদাস, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ (সিলেট অঞ্চল)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উৎপল বড়ুয়া, বৌদ্ধ সমিতি, সিলেট-এর সভাপতি চন্দ্র শেখর বড়ুয়া, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শামসুল বাসিত শেরো, উদ্যোক্তা পীযূষ কান্তি পুরকায়স্থ প্রমুখ।
এতে হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ সিলেটের সভাপতি এড. মৃত্যুঞ্জয় ধর বলেন, আমরা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মহাসমাবেশে ৮ দফা দাবি উপস্থাপন করেছিলাম, কিন্তু আজও তা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা আশা করেছিলাম হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খ্রিস্টান সবাই একসাথে কাজ করব। কিন্তু সেই আশা আজও পূরণ হয়নি। বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই আমরা সংখ্যালঘুরা ভয় ও আতঙ্কে থাকি। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
সচেতন নাগরিক কমিটি সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরিন হক বলেন, নারী কমিশন গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনো কার্যকর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। এর পাশাপাশি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি গুরুতর প্রকাশ। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো অত্যন্ত সীমিত, এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত। এই অনুপস্থিতি শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, এটি সংবিধান ও গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও বড় চ্যালেঞ্জ।
অনুষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, “আইনশৃঙ্খলা ঠিক না থাকলে কোনোভাবেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। রাজনীতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে না। যতদিন আমরা না বুঝব, ততদিন অনাচার ও সমস্যা চলতেই থাকবে।”
হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ সিলেট মহানগরের সভাপতি বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, “আমি হিন্দু হওয়ার কারণে কি এই দেশের রাষ্ট্রপতি হতে পারব না? অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অন্য নাগরিকরা যা পান, আমরা তা পাই না।”




