বিকট শব্দে আতঙ্কিত নগরবাসী । শাহী ঈদগাহে আটক ৫টির বিরুদ্ধে মোটর আইনে মামলা
নগরীতে মোটরসাইকেলে শোডাউনের নামে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে কারা?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৬:০২ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাংয়ের বিকট শব্দে বাইক শোডাউন। দিনেদুপুরে যেকোনো সময় হঠাৎ করেই উচ্চ শব্দে ৪০/৫০টি মোটরসাইকেল শোডাউন দিয়ে নগরীতে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে তারা। বিভিন্ন জায়গায় জড়ো হয়ে বিভিন্ন সময়ে করছে ছিনতাই সহ নানা অপরাধ। যার কারণে আতঙ্কে রয়েছেন নগরীর বাসিন্দারা।
গত শুক্রবার ছুটির দিনে জুমার নামাজের পর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকার ৩৫/৪০ টি মোটরসাইকেল ও সামনে কয়েকটি প্রাইভেট কার নিয়ে এসে উচ্চস্বরে হর্ণ বাজিয়ে এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি করে শতাধিক যুবক। যার কারণে মানুষজনের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েন উঁচাসড়ক, উত্তর কাজিটুলা ও শাহী ঈদগাহ এলাকার বাসিন্দারা। এমনকি শাহী ঈদগাহ এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাদেরকে বারণ করলে তারা তাদের ওপরও চড়াও হয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রায় সময় এরকম বিকট শব্দে ওই এলাকার মানুষজন আতঙ্কে থাকেন বলে তারা জানিয়েছেন।
শুক্রবারের ঘটনার বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)-এর ক্রাইম সেকশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ৩৫/৪০ টি মোটরসাইকেল দিয়ে ৫০/৬০ জনের মতো যুবক উচ্চশব্দে হর্ণ বাজিয়ে ও বিকট শব্দ করে শোডাউন করছিল। শাহী ঈদগাহ পয়েন্টে কয়েকজন পুলিশ সদস্য চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন তল্লাশি করছিলেন। প্রথমে পুলিশ কম দেখে তারা পুলিশের সাথে বেপরোয়া আচরণ করে। খবর পেয়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য শাহী ঈদগাহ পয়েন্টে উপস্থিত হয়। এ সময় পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ৮টি মোটর সাইকেল জব্দ করে।
সিলেট মেট্রোপলিশন পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী জানান, শাহী ঈদগাহে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির খবর পেয়ে পুলিশ সেখান তল্লাশি চালিয়ে ৮টি মোটর সাইকেল আটক করে। কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশের অবস্থান খুবই স্পষ্ট বলে দাবি করেন তিনি। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ৮টির মধ্যে কাগজপত্র ঠিক থাকায় তিনটি মোটরসাইকেল ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এসএমপি’র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো: মঞ্জুরুল আলম জানান, শাহী ঈদগাহে আটক ৫টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মোটর আইনে মামলা হয়েছে। উচ্চ শব্দে মোটর সাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে সবখানেই এখন রাজত্ব করছে ‘কিশোর গ্যাং’। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি, ধারালো অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, অপহরণ এমনকি খুনের মতো ঘটনাও এখন নিত্যদিনের খবর। ‘হিরোইজম’ বা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের নেশায় জড়িয়ে পড়া এই কিশোররা ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন। প্রশাসন থেকে শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়াতে ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ছত্রছায়ায় দিনদিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। যার কারণে যেকোনো সময়ে খুন করতেও দ্বিধা করছেন না তারা। বিভিন্ন শোডাউনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতার কথা জানান দিচ্ছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট নগরীর শাহী ঈদগাহ, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, রিকাবীবাজার, টিলাগড়, পাঠানটুলা, মদিনা মার্কেট এবং দক্ষিণ সুরমার বিভিন্ন এলাকায় এদের সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে বিভিন্ন মেস এলাকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে এরা ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অবস্থান নেয়। অভিযোগ রয়েছে, বড় ভাইদের হয়ে কাজ করতে গিয়ে কিশোররা অপরাধের জগতে হাতেখড়ি দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ ইন্ধনেই এরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া টিকটক বা লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে ‘ডন’ সাজার নেশা তাদেরকে অন্ধ করে দিচ্ছে। অভিভাবকদের উদাসীনতা এবং সন্তান কোথায় সময় কাটাচ্ছে সেদিকে খেয়াল না রাখা কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
গত কয়েক মাসে সিলেটে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটে গেছে। তুচ্ছ বাকবিতণ্ডা থেকে শুরু করে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে নগরীতে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত ও হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া ইভটিজিং এবং স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রীদের হয়রানি করা এখন এই গ্রুপগুলোর নিয়মিত কাজে পরিণত হয়েছে। এছাড়া কয়েকদিন আগে নগরীতে দুইজনকে অপহরণ করে ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও অভিযুক্তরা কিশোর। যারা রিমান্ড শেষে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
নগরীর বাসিন্দারা জানান, আগে সন্ধ্যার পর অলিগলি নিরাপদ মনে হতো। এখন মোড়ে মোড়ে বাইক নিয়ে কিশোরদের মহড়া আর অদ্ভুত সব চুলের স্টাইলে তাদের আচরণ দেখলে সাধারণ মানুষ পথ চলতে ভয় পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর অপরাধ কমাতে অভিভাবকদের পাশাপাশি নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। অভিভাবকদের নিজেদের সন্তানদের এসব কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। তারা বলেন, অনেকে ক্ষমতাসীন দলের ব্যানারে শোডাউন করে। এদের ব্যাপারে তাদের অভিভাবক সংগঠনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ সদস্য বলেন, শোডাউন করারও তো নিয়ম আছে। এভাবে বিকট শব্দে মানুষকে কষ্ট দিয়ে শোডাউন করা কারোর জনই মঙ্গলজনক নয়।




