ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ

বিপ্লব নন্দী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৩-২০২০ ইং ০০:৫৬:০৯ | সংবাদটি ১১৩৮ বার পঠিত

সময়ের দাবি মেটাতে হাতেগুনা যে ক’জন সাহিত্যিক বিশ্বসাহিত্যাঙ্গনে এন্ট্রি নিয়েছেন সোমেন চন্দ নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর এন্ট্রি এবং এক্সিট উভয়টি গ্রিক ট্র্যাজেডি’র অনুরূপ। একদিক থেকে একে এন্ট্রি বলা যায় কারণ গ্রিক ট্র্যাজেডি নাটকে প্রটাগনিস্টদের এন্ট্রি নেয়ার আগে যেরকম ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয় তার ক্ষেত্রেও প্রকৃতিগতভাবে সেরকমই হয়েছে। দু’দুটি সাম্রাজ্য বিস্তারী মানববিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়কালে বিশ্বব্যাপী এক বিক্ষুব্ধ সময়ে এ পৃথিবীতে তার আগমন। মাত্র বাইশটি বছরের এক অতি সংক্ষিপ্ত আয়ু নিয়ে তিনি ভূপৃষ্ঠে বিরাজিত ছিলেন। ২৬টি গল্প, ১টি অসম্পূর্ণ উপন্যাস, ২টি নাটক, এবং ৩টি কবিতা সর্বসাকুল্যে এই হলো তার সাহিত্যকর্ম।
তিরিশের মহামন্দার ঠিক এক দশক আগে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে সোমবার নরসিংদী জেলার ঘোড়াশালের নিকটবর্তী বালিয়া গ্রামে তার জন্ম। বাংলাদেশের প্রথম সাহিত্যিক-শহীদ সোমেন্দ্রনাথ চন্দ যিনি সোমেন চন্দ নামেই সমধিক পরিচিত।
সোমেন চন্দকে বুঝতে হলে বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি একটু আলোচনা করা এখানে প্রাসঙ্গিক। বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়াতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদে রূপ লাভ করে। সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেনিন বলেন-সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে মুমূর্ষু পুঁজিবাদ, ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ, পরজীবী পুঁজিবাদ। সাম্রাজ্যবাদ পররাজ্য গ্রাস করা কিংবা উপনিবেশ দখল করা ব্যতীত টিকে থাকতে পারে না। উপনিবেশ দখল-পুনর্দখল প্রশ্নে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে পৃথিবী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চাক্ষুস করে। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই ইউরোপে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যা বিস্তার লাভ করেছিল ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে বিজয়ী সাম্রাজ্যবাদী জোট পরাজিত সাম্রাজ্যবাদী জোটের বাজার দখল ও ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।
তবে অন্ধকারে আশার আলোর মতন এই সংকট আবার একই সঙ্গে শ্রমিক বিপ্ল¬বের সূচনাও ঘটিয়ে দেয়।সাম্রাজ্যবাদী অন্তর্বিরোধের ফলে বিশ্বযুদ্ধের অনিবার্যতার পাশাপাশি শ্রমিক বিপ্ল¬বের অনিবার্যতা নিয়ে বক্তব্যের বিষয়টিও সামনে চলে আসে। সেই অনিবার্যতার পথ ধরেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন রাশিয়ায় বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক বিপ্ল¬ব সংঘটিত হয়। বিনির্মিত হল নতুন এক সমাজের।জন্ম হল নতুন এক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের, যার পরিচালক তথা হর্তা-কর্তা-বিধাতা হলো শ্রমিক শ্রেণি। এতদিন পর্যন্ত সমাজে যারা ছিল অবহেলিত, নিগৃহীত, অবজ্ঞার পাত্র, ‘নিচুতলার মানুষ’। কিন্তু তাদের পরিচালনাধীন রাষ্ট্রটি সারা পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। কী শিক্ষা, কী সাহিত্য, কী সংস্কৃতি, কী উৎপাদন, কী চিকিৎসা, কী কর্মসংস্থান অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়-সমাজ-ব্যক্তিজীবনের সকলক্ষেত্রে তারা সুষম উন্নতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিল যা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বচক্ষে পরিদর্শন করে অভিভূত হয়েছিলেন। ‘রাশিয়ার চিঠি’তে তিনি যাকে তীর্থ দর্শন করার অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করেছেন।
এতকাল ধরে বিশ্ববাসী পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা পরিচালিত শোষণ-বঞ্চনার যে রাষ্ট্রকাঠামোর অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সোভিয়েত রাশিয়ায় শ্রমিকদের প্রতিষ্ঠিত কল্যাণকামী-সমতাভিত্তিক-শোষণ-নির্যাতনহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার লব্ধপ্রতিষ্ঠ সুনাম ও উন্নয়নের ফল্গুধারা প্রত্যক্ষ করল। এই নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানবতার জয়গান দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল। এর ছোঁয়ায় সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের মতো ভারতবর্ষের মুক্তিকামী মানুষও তীব্রভাবে আলোড়িত হয়। ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতের রাজনীতিও উত্তাল হয়ে উঠলো। এই উত্তাল সময়ে পরাধীন ভারতে আমাদের মাঝে এন্ট্রি নিলেন সোমেন চন্দ। ব্যক্তির আদর্শিক চিন্তাক্ষেত্র যদি স্পষ্ট না থাকে তবে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক। সোমেনের অন্তত এরকম কোনো চান্সই ছিল না। আজন্ম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই চালিয়ে যাওয়া মাতৃহারা বালক সোমেন চন্দ শুরুতেই জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মনে প্রাণে একজন সাম্যবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা লালন করা মানুষ।
পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা সোমেন সদরঘাট সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী পগোজ স্কুল থেকে ১৯৩৬ সালে উচ্চতর দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করেন।এরপর তিনি মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হন কিন্তু ডাক্তারি পড়া আর হয়নি। সোমেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এখানেই সমাপ্তি ঘটে। কারণ এরই মধ্যে তিনি আরো বৃহত্তর জীবনের পাঠের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে জনৈক সমালোচকের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য
“ডাক্তারি পড়ার চেয়ে (সোমেনের) অধিক আগ্রহ মানুষের জীবনকে জানার, ইতিহাসের ঠিকানাকে উপলব্ধি করার।... ইতিহাসের জটিল যুগসন্ধিক্ষণে সেই বাইশ বছরের যুবক সোমেন আশ্চর্য স্বচ্ছ দৃষ্টি দিয়ে বিভ্রান্তির সমস্ত কুয়াশা ভেদ করে আগামীর দিকে তাকিয়েছেন। ইতিহাসের সড়ক স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হয় না। তাকে তৈরি করতে হয়। ইতিহাসের সেই সড়ক তৈরিতে সোমেন নিজের হাত লাগিয়েছেন এবং মানুষের জন্য সুন্দরতর সমাজ গড়ার কামনায় সেই ইতিহাসের সড়কে নিজের জীবন দান করেছেন।”
পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৭ সালে তার বয়স যখন মাত্র ১৭ বছর তখন তার জীবনে এক নতুন মোড় আসে। সোভিয়েত রাশিয়ার শ্রমিক বিপ্লবসহ স্থানীয় ও বিশ্বরাজনীতির অপরাপর ঘটনাবলী তাকেও ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তিনি ব্যাপক পড়াশুনা শুরু করেন এবং রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠেন। একইসাথে টুকটাক লেখালেখিও চলতে থাকে। সোমেনের পিতা নরেন্দ্রকুমার চন্দও রাজনীতি সচেতন ছিলেন। তিনিও যৌবনে স্বদেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে সচেতনভাবে স্বদেশি আন্দোলনের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন। পুত্র সোমেনও একই মন্ত্রে দীক্ষা নিলেন।
সোমেন চন্দের সাহিত্যিক জীবনকে দু’টি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বে (১৯৩৭-১৯৩৯ খ্রিঃ পর্যন্ত) তিনি গ্রামীণ মানুষের জীবন ছবি আঁকতে ব্যস্ত। লিখছেন রোমান্টিক প্রেমের গল্প। বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এসময় তাঁর আদর্শ। আর দ্বিতীয় পর্বে (১৯৩৯-১৯৪২ খ্রিঃ পর্যন্ত) তিনি আঁকছেন খেটে খাওয়া দিনমজুর, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষের চিত্রপট। এসময় তাঁর আদর্শ ও অনুপ্রেরণা হচ্ছেন যথাক্রমে- ম্যাক্সিম গোর্কি, র্যা লফ ফক্স, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, প্রমুখ।
‘সোমেনের সাহিত্যিক জীবনের এই পর্বান্তর সূচিত হয় একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার অনুপ্রেরণায়। ১৯৩৫ সালে হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানিসহ পুঁজিবাদী দেশসমূহে যখন ফ্যাসিবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে তখন পৃথিবীর অগ্রগণ্য শিল্পী-সাহিত্যিকগণ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সমবেত হয়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ডাক দেন। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে লন্ডনে ব্রিটিশ-ভারতীয় প্রগতিশীল লেখকদের উদ্যোগে গঠিত হয় প্রগতি সাহিত্য সংঘ। ঐ বছরের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ। এরই প্রেরণায় ১৯৩৯ সালে ঢাকার মানবতাবাদী প্রগতিশীল লেখকদের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ এর আহবায়ক পর্ষদ।এতে প্রধান উদ্যোগী ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ সোমেন চন্দ। অন্যান্যের মধ্যে আরো ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, অচ্যুত গোস্বামী, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, সত্যেন সেন, অমৃতকুমার দত্ত, সরলানন্দ সেন, জ্যোতির্ময় সেন, সতীশ পাকড়াশী, প্রমুখ শিল্পী, সাহিত্যিক, চিন্তক, ও রাজনীতিকবৃন্দ। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৪০ সালে আনুষ্ঠানিক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ গঠিত হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কাজী আব্দুল ওদুদ। রণেশ দাশগুপ্তকে সম্পাদক এবং সোমেন চন্দকে সহ সম্পাদক করে সম্মেলনে ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ এর কমিটি গঠিত হয়।’
‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ গঠিত হলে সোমেন চন্দের কাজের পরিধি বেড়ে যায়। প্রগতি পাঠাগার পরিচালনা, ঢাকা রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নে কাজ করা, প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের দায়িত্ব পালন করা, রাত জেগে গল্প লেখা সবকিছু মিলে সোমেন তখন অতিবাহিত করেন অতি কর্মব্যস্ত জীবন। সাংগঠনিক কাজের সাথে তত্ত্বগত ভিত নির্মাণের জন্য এ সময় তিনি ব্যাপক পড়ালেখাও শুরু করেন।
ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরোদমে চলছে। এই লড়াইয়ের উপজাত হিসেবে নানান কিসিমের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠল। যেমনঃ ঐশ্বর্য-ভোগ-বিলাস বনাম শোষণ-নির্যাতন-বঞ্চনার দ্বন্দ্ব, মজুর আর মালিকের দ্বন্দ্ব, ভাববাদ আর বাস্তুবাদের দ্বন্দ্ব, ধনী-গরিবের দ্বন্দ্ব, শাসক-শোষিতের দ্বন্দ্ব, শ্রম আর ভোগের দ্বন্দ্ব, পুঁজিতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের দ্ব্ন্দ্ব।এইসকল দ্বন্দ্ব তার মনে গভীর দাগ কাটে। কার্ল মার্ক্স যখন উচ্চারণ করেন সমাজই ধনী-গরিব সৃষ্টি করে, ঈশ্বর নয়; তখন তিনি সেটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। আর লেনিন যখন বলেন সংগঠন ছাড়া গরিব মানুষের আর কোনো অস্ত্র নেই তখন সেটা উপলব্ধি করে হৃদয়ে ধারন করেন। অতঃপর সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে মিশে তাদের সমস্যাগুলো চাক্ষুস পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা ও তাদেরকে সংগঠিত করার মানসে ঢাকা রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন। রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন পরিচালনা, বিভিন্ন শাখা-সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, গোপন সভা, শ্রমিক শ্রেণিকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করে তোলা প্রভৃতি কাজ সোমেন দক্ষতার সঙ্গে পালন করতেন। অবশ্য ‘কমিউনিস্ট পাঠচক্র’ নামে গোপন ক্লাসের মাধ্যমে এরই মাঝে তিনি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের দীক্ষা পেয়ে গিয়েছিলেন। আর এক্ষেত্রে তার দীক্ষাগুরু ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিপ্ল¬বী সতীশ পাকড়াশী।ঘটনাচক্রে দু’জনই নরসিংদী জেলার সন্তান। ঐ পাঠচক্রের প্রকাশ্য শাখার নাম ছিল ‘প্রগতি পাঠাগার’। সোমেনের আগ্রহ এবং কর্মদক্ষতার পরিচয় পেয়ে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ তার উপর এ পাঠাগার পরিচালনার ভার দেন। পাঠাগার পরিচালনার সাফল্য, তাত্ত্বিক জ্ঞান, শ্রমিক-কৃষকের জন্য সহমর্মিতা, গণসাহিত্য রচনায় আগ্রহ ইত্যাকার বৈশিষ্ট্যের জন্য ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ তাকে পার্টি সংগঠনে নিয়ে আসার কথা চিন্তা করেন। ১৯৪১ সালের মাঝামাঝি সময়ে সোমেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। এদিকে রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করে সোমেন চন্দ অতি অল্প সময়ে বিপুল জনপ্রিয়তা ও সাফল্য অর্জন করেন। ঐ সময়েই অর্থাৎ ১৯৪১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নেরও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ফ্যাসিস্ট আক্রমণের হাত থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর দেশে দেশে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। ১৯৪১ সালের জুন মাসে কলকাতায় গঠিত হয় ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। পরের বছর সোমেনের উজ্জ্বল ভূমিকাতে ঢাকায় ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’ গঠিত হয়। এ সমিতির উদ্যোগে ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সদরঘাটের নিকটবর্তী ব্যাপটিস্ট মিশন হলে সপ্তাহব্যাপী যে চিত্র প্রদর্শনী হয় তা আয়োজনেও সোমেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঐ বছরের মার্চ মাসের ৮ তারিখে ঢাকার সূত্রাপুরে আয়োজিত ফ্যাসিবাদবিরোধী এক সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে সোমেন একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মিছিলটি পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের হৃষিকেশ দাস লেনের কাছে পৌঁছামাত্রই উগ্র জাতীয়তাবাদীরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে অত্যন্ত নৃসংশভাবে খুন করে। ভারতবর্ষের প্রথম সাহিত্যিক সোমেন চন্দ যিনি শহীদ হলেন। সোমেন চন্দ যেন তার পূর্বসূরী রালফ ফক্স, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, জন কর্নফোর্ডদের মতই ট্র্যাজিক ভাগ্য বরণ করে নিলেন।
প্রতিক্রিয়াশীল গণশত্রুরা সবসময় ভেবে থাকে গণআন্দোলনের অগ্রসর ও প্রতিশ্রুতিশীল কর্মীকে হত্যা করলে গণদাবী দমিয়ে দিতে কিংবা নস্যাৎ করে দিতে পারবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এরকম হত্যাকা- কখনও কোন আন্দোলনকে তো দমাতে পারেইনি বরং এইরকম অগ্রসর কর্মীর রক্তবীজ যে মাটিতে ঝরে সেখান থেকে হাজারো-লাখো অগ্রসর কর্মী জন্ম লাভ করে। গণশত্রুরা তাই সোমেন চন্দকে খুন করলেও খুন করতে পারেনি তার আদর্শকে, তার প্রগতিশীল চেতনাকে, তার সাম্যবাদী-মানবতাবাদী-মার্ক্সবাদী দর্শনকে, সর্বোপরি তার আজন্ম লালিত স্বপ্নকে। তার লেখক সত্তা, তার রাজনৈতিক সত্তা, কিংবা তার দার্শনিক সত্তার কোনটিই পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হওয়ার আগেই তার এই অকাল মৃত্যু বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি তথা বাঙালি জাতিসত্তার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি যা কোনকিছু দিয়েই পোষাবার নয়। জন্মশতবার্ষিকীতে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT