ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০২০ ইং ০০:২৬:৫৪ | সংবাদটি ৭২৮ বার পঠিত


মূল : মুফতি মুহাম্মদ শফী
অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
সূরা : বাক্বারাহ [পূর্ব প্রকাশের পর]
প্রথমত : যদিও আসল কেবলা বায়তুল্লাহ তথা কা’বা; কিন্তু কা'বার দিকে মুখ করা সেখান পর্যন্তই সম্ভব, যেখান থেকে তা দৃষ্টিগোচর হয়। যারা সেখান থেকে দূরে এবং কা'বা তাদের দৃষ্টির আগোচরে থাকে, তাদের উপরও হুবহু কা’বার দিকে মুখ করার কড়াকড়ি আরোপ করা হলে, তা পালন করা খুবই কঠিন হতো। বিশেষ যন্ত্রপাতি ও অঙ্কের মাধ্যমেও নির্ভুল দিক নির্ণয় করা দূরবর্তী অঞ্চলসমূহে অনিশ্চিত হয়ে পড়তো। অথচ শরীয়ত সহজ-সরল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে বায়তুল্লাহ অথবা কা’বা শব্দের পরিবর্তে মসজিদুল-হারাম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বায়তুল্লাহ অপেক্ষা মসজিদুল হারাম অনেক বেশী স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এ বিস্তৃত স্থানের দিকে মুখ করা দূর-দূরান্তের মানুষের জন্যেও সহজ।
সংক্ষিপ্ত শব্দ ‘ইলা’ এর পরিবর্তে ‘সাতর’ শব্দটি ব্যবহার করায় কেবলার দিকে মুখ করার ব্যাপারটি আরও সহজ হয়ে গেছে। ‘সাতর’ দু’অর্থে ব্যবহৃত হয়-বস্তুর অর্ধাংশ ও বস্তুর দিক। আলোচ্য আয়াতে এর অর্থ হচ্ছে বস্তুর দিক। এতে বুঝা যায় যে, দূরবর্তী দেশসমূহে বা অঞ্চলে বিশেষভাবে মসজিদে হারামের দিকে মুখ করাও জরুরী নয়; বরং মসজিদে হারাম যেদিকে অবস্থিত সে দিকের প্রতি মুখ করাই যথেষ্ট। (বাহরে-মুহীত)।
আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, খানায়ে-কা’বা কিয়ামত পর্যন্ত আপনার কেবলা থাকবে। এতে ইহুদী-নাসারাদের সে মতবাদের খণ্ডন করাই ছিল উদ্দেশ্য যে, মুসলমানদের কেবলার কোন স্থিতি নেই; ইতিপূর্বে তাদের কেবলা ছিল খানায়ে-কা’বা, পরিবর্তিত হয়ে বায়তুল মোকাদ্দাস হল, আবার তাও বদলে গিয়ে পুনরায় খানায়ে কা’বা হলো। আবারও হয়তো বায়তুল মোকাদ্দাসকেই কেবলা বানিয়ে নেবে। (বাহরে-মুহীত)।
এখানে অসম্ভবকে সম্ভব ধরে নিয়ে হুযুর (সা.)- কে সম্বোধন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টির দ্বারা উম্মতে মুহাম্মদীকে অবহিত করাই উদ্দেশ্য যে, উল্লেখিত নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ এতই কঠিন ব্যাপার যে, স্বয়ং রসূলে করীম (সা.)-ও যদি এমনটি করেন, (অবশ্য তা অসম্ভব), তবে তিনিও সীমা লঙ্খনকারী বলে সাব্যস্ত হবেন।
১৪৬নং আয়াতে রসূলে করীম (সা.)-কে রসূল হিসাবে চেনার উদাহরণ সন্তানদের চেনার সাথে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এরা যেমন কোনরকম সন্দেহ-সংশয়হীনভাবে নিজেদের সন্তানদেরকে জানে, তেমনিভাবে তওরাত ও ইঞ্জীলে বর্ণিত রসূলে করীম (সা.)-এর সুসংবাদ, প্রকৃষ্ট লক্ষণ ও নিদর্শনাবলীর মাধ্যমে তাকেও সন্দেহাতীতভাবেই চেনে। কিন্তু তাদের যে অস্বীকৃতি তা একান্তভাবেই হঠকারিতা ও বিদ্বেষপ্রসূত।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, পরিপূর্ণভাবে চেনার উদাহরণ পিতা-মাতাকে চেনার সাথে না দিয়ে সন্তান-সন্ততিকে চেনার সাথে দেয়া হয়েছে। অথচ মানুষ স্বভাবতঃ পিতা-মাতাকেও অত্যন্ত ভাল করেই জানে। এহেন উদাহরণ দেয়ার কারণ হল এই যে, পিতা-মাতার নিকট সন্তানাদির পরিচয় সন্তানের নিকট পিতা-মাতার পরিচয় অপেক্ষা বহুগুণ বেশী হয়ে থাকে। কারণ, পিতা-মাতা জন্মলগ্ন থেকে সন্তান-সন্ততিকে স্বহস্তে লালন-পালন করে। তাদের শরীরের এমন কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই, যা পিতা-মাতার দৃষ্টির অন্তরালে থাকতে পারে। পক্ষান্তরে পিতা-মাতার গোপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সন্তানরা কখনও দেখে না।
(১৪৭) বাস্তব সত্য সেটাই যা তোমার পালনকর্তা বলেন। কাজেই তুমি সন্দিহান হয়ো না। (১৪৮) আর সবার জন্যই রয়েছে কেবলা একেক দিকে, যে দিকে সে মুখ করে (এবাদত করবে)। কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও। যেখানেই তোমরা থাকবে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে সমবেত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। (১৪৯) আর যে স্থান থেকে তুমি বের হও, নিজের মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও নিঃসন্দেহে এটাই হলো তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বাস্তব সত্য। বস্তুতঃ তোমার পালনকর্তা তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত নন। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT