ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী

সৈয়দ আলতাফ হোসেন খলকু প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৩-২০২০ ইং ০০:১০:৪৯ | সংবাদটি ১০১৬ বার পঠিত

উসমানীয় খেলাফতের পতনের পরবর্তি ছোট একটি ঘটনা দিয়ে এই লেখাটি শুরু করলাম। ইসলামী দুনিয়ার সুরক্ষাকল্পে কালজয়ী বীরপুরুষ সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কথা পৃথিবীর কে না জানে। যিনি ইতিহাসে দীর্ঘ ১৪ বৎসর ক্রসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে তাদের শক্তি ও শৌর্য-বীর্য চুর্ণ-বিচুর্ণ করে বায়তুল মুকাদ্দাস জবর দখল থেকে উদ্ধার করেন। সেই বীর এখন ঘুমিয়ে আছেন সিরিয়ার দামেস্কে উমাইয়া জামে মসজিদের পার্শ্বে এক অনাড়ম্ভর সমাধি শয্যায়।
প্রথম মহাযুদ্ধে উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর ফরাসী জেনারেল গৌরু সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবীর কবরে এসে দাম্ভিকতার সহিত আঘাত করে বলেছিল, সালাহউদ্দিন আর কত ঘুমাবে! দেখ আমরা এসে পড়েছি। সিরিয়া বিজয় করে ফেলেছি। এটা ছিল তাদের কয়েক শতাব্দী পূর্বেকার ক্রসেডারদের চরম পরাজয়ের আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ। কারণ, হাজার বছর পরেও সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বীরত্ব ও জিহাদের কথা মনে পড়লে পশ্চিমা খ্রীস্টান ক্রসেডাররা ভয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলত। কিন্তু সেদিন ফরাসী জেনারেল গৌরুর এই চরম ধৃষ্টতা ও বে-আদবীর প্রতিউত্তর দেয়ার মত কোন শক্তি সিরিয়ার মুসলমানদের মধ্যে ছিল না। ঘটনাটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হল ১৯১৬ সালে মক্কার শাসক শরীফ হোসেন সহ আরবের আরও কিছু আঞ্চলিক নেতারা যদি উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে ইংরেজ ও ফরাসীদেরকে যুদ্ধে সাহায্য না করত তবে হয়তো ফরাসী জেনারেল গৌরু কর্তৃক সুলতান সালাহউদ্দিনের কবরে এসে আঘাত করার মত ঘটনার অবতারণা হতো না। সেই যে বৃটিশ ও ফরাসীরা এসে মধ্যপ্রাচ্য দখলে নিয়েছে-আজ শত বৎসর পরেও তার রেশ শেষ হয়নি। বরং নতুন করে আরব দুনিয়ায় ভিত্তি গাড়তে শুরু করেছে সাম্রাজ্যবাদীদের এই আগ্রাসন। বর্তমান ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অচলাবস্থার দিকে তাকালেই তা বুঝা যায়।
তুর্কী উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর মধ্যপ্রাচ্যকে ছিন্ন ভিন্ন করে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে এক গোপন চুক্তি করেছিল তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি বৃটেন ও ফ্রান্স। যে চুক্তি ইতিহাসে সাইকস পিকট চুক্তি নামে পরিচিত। আর এই চুক্তিতে রাশিয়ারও সম্মতি ছিল। চুক্তির আওতায় তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীন আরব প্রদেশগুলো ভবিষ্যত বৃটিশ ও ফরাসী নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বিভক্ত হয়। বৃটেনকে দেয়া হয় জর্ডান, দক্ষিণ ইরাক, হাইফা ও এক্রের বন্দরসহ আরও কিছু এলাকা। অন্যদিকে ফ্রান্সকে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক, উত্তর ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননের বরাদ্দ দেয়া হয়। আর রাশিয়ার পাওয়ার কথা ছিল তুরস্কের ইস্তাম্বুল, মেনিয়া ও আনাতোলিয়া অঞ্চল। সেই চুক্তি অনুযায়ী তুর্কি সাম্রাজ্যে পরবর্তি মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা অদল-বদলের কাজও শুরু হয়। কিন্তু তুরস্ক সে সময় দখলদারদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলার কারণে তার সীমানা রক্ষা করতে পেরেছিল। ১৯১৭ সালের অক্টোবরের রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিক বিপ্লবীরা এই গোপন চুক্তিটি প্রকাশ করে দেয়, এতে বৃটিশ ও ফরাসীরা বিব্রত হয়ে পড়ে। আর যে আরবরা তুরস্কের বিরুদ্ধে বৃটিশদের সহযোগীতা করেছিল, তারা ইউরোপীয়দের এই গোপন আতাতের খবরে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, আর তুর্কিরা হয় আনন্দিত। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য এখনও ইতিহাসবিদ ও সমর কৌশলীরা সাইকস পিকট চুক্তিকে দায়ী করেন।
ইংরেজদের সহায়তা দানের বদলা হিসাবে ভূমধ্য সাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তি সবকটি দেশ নিয়ে স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি তারা আরবদের দিয়েছিল, যুদ্ধের পর তারা তা সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। শুধু তাই নয়- ফ্রান্সের সাথেও যে গোপন চুক্তি করেছিল তাও এক বছর পরই ভঙ্গ করে। আর বৃটিশরা আরবদের দেয়া প্রতিশ্রুতিই যে ভঙ্গ করেছিল শুধু তাই নয়, বরং ফিলিস্তিনকে তার আওতা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। আরবরা তুরস্কের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সহযোগীতা করার বদলা এভাবেই পেল। যে ভুলের কারণে পরবর্তি পুরো শতাব্দীব্যাপী এই ভুলের মাসুল তাদের গুনতে হচ্ছে বা ভবিষ্যত দিনগুলোতে আরও গুণতে হবে।
উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর আরব দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বিপদজনক যে বিষয়টির সৃষ্টি বা অভ্যুদ্বয় হয় তা হল ফিলিস্তিন বৃটিশ ম্যাণ্ডেটের আওতায় চলে যাওয়া। আর তাতে করে ইতিহাসের এই নির্মম প্রতারণার কারণে ইয়াহুদীরা তাদের হাজার বছরের নোংরা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মোক্ষম সুযোগ লাভ করে। আর এই সুযোগে ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়াসহ পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে ইয়াহুদীরা গোপনে পাড়ি জমাতে থাকে ফিলিস্তিনে। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর বৃটিশ উপনিবেশ কর্তৃক ফিলিস্তিনে একটি ইয়াহুদী রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা ঘোষিত হয়, যা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ হিসাবে পরিচিত। এই অসম চুক্তির পর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিনে এসে বসতি গড়ে তোলার কারণে ১৯১৮ সালে ফিলিস্তিনে যেখানে ইয়াহুদীদের সংখ্যা ছিল শতকরা ৮ জন। ১৯৪৮ সালে তা এসে দাড়ায় শতকরা ৩৩ জনে। অন্য এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯২২ সালে ফিলিস্তিনে প্রতি ৬ জনে ৫ জন ছিল আরব মুসলমান, আর মাত্র ১ জন ছিল ইয়াহুদী। এমনি ভাবে বৃটিশ সহযোগীতায় ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিনে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছিল। ফিলিস্তিনে এসব কিছু করতে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থায়ী বাসিন্দা ফিলিস্তিনিদের মতামতের কোন গুরুত্বই দেয়া হয়নি। ১৯৪৭ সালে খোদ জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে ভাগ করল। দুর্বল মুসলিম বিশ্বের প্রতিবাদ কোন কাজে আসল না। এর পরের ইতিহাস ফিলিস্তিনে রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়ার ইতিহাস। ১৯৪৮ সালের ৮ই এপ্রিল ইসরাঈলী সেনা ও ইয়াহুদী সন্ত্রাসীরা যে হত্যা ও সন্ত্রাসের তাণ্ডব শুরু করে, তা গোটা ফিলিস্তিনকেই রক্তে প্লাবিত করে দেয়। ১৯৪৮ সালের ১৫ই মে এই আগ্রাসী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে শুরু হল যুদ্ধ। মিশরসহ প্রতিবেশী সকল আরব দেশ যুদ্ধে যোগ দিল, কিন্তু ফলাফল গেল ইসরাঈলের পক্ষে। ফিলিস্তিনের ৭৮ শতাংশ ভূমি ইসরাঈল দখল করে নিল এবং রুশ ইয়াহুদী ডেভিড বেনগুরিয়ান ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল। আমেরিকা ইসরাঈলকে স্বীকৃতি দেয়ার কয়েক মিনিট পরই রাশিয়া ইসরাঈল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিল। যাই হোক, ফিলিস্তিনকে নিয়ে ইসরাঈলের সাথে আরব দেশগুলোর ৩টি যুদ্ধ এবং সুয়েজ খাল জাতীয়করণ নিয়ে মিশরের সাথে ইসরাঈলের আরও ১টি যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আরবরা কোনটিতেই জয়ী হতে পারেনি। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাঈলের সাথে মিশরের পরাজয়টা ছিল অত্যন্ত করুণ ও বেদনাদায়ক। মাত্র কয়েক ঘন্টার যুদ্ধে মিশর তার ৬০০ যুদ্ধ বিমানের মধ্যে ১৫৬টি হারায় এবং ১৪০০ ট্যাংক এর মধ্যে ৭০০টি ট্যাংক হারানো সহ ১৫০০০ সৈন্য হারায় এবং ৪৮ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের অস্ত্রশস্ত্রের সাথে তার বিশাল সিনাই ভূখন্ড থেকে তারা বিতাড়িত হয়। কিন্তু কেন ঘটল এ বিরাট বিপর্যয়? ১৯৭৩ সালে মিশর আবারও ইসরাঈলের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইসরাঈল কর্তৃক তার অধিকৃত ভূমি উদ্ধার করতে।। কিন্তু এই যুদ্ধে প্রথম দিকে এগিয়ে গেলেও তার মিত্র রাশিয়া অস্ত্র দেয়া বন্ধ করে দিলে শেষ পর্যন্ত মিশরকে যুদ্ধ বিরতি মেনে নিতে হয়। যুদ্ধ করে বা বাধ্য করে দখলকৃত এলাকা উদ্ধার সম্ভব হবে না ভেবে শেষ পর্যন্ত আমেরিকার মধ্যস্থতায় ক্যাম্প ডেভিট চুক্তির শর্তানুযায়ী মিশর কর্তৃক ইসরাঈলকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে অধিকৃত গোলান উপত্যকা ফিরে পায় এবং ইসরাঈল তার প্রতিষ্ঠা লাভের সুদূর ৪০ বৎসর পর তার বহু আকাংখিত কোন আরব দেশের স্বীকৃতি লাভে সফল হয়। আর ইসরাঈলকে স্বীকৃতি দেয়ার কারণে মিশরকে আরবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
অন্যদিকে ১৯২২ সালে বৃটেন ও ফ্রান্স তাদের পূর্ব পরিকল্পিত মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর সীমানা অদল-বদল শুরু করে। কুর্দী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসেল, সুন্নী অধ্যুষিত বাগদাদ ও শিয়া অধ্যুষিত বামা নিয়ে গঠিত হয় ইরাক। ১৯২২ সালে বাগদাদের বৃটিশ হাইকমিশনার পার্সী কক্স মরুভূমির তাবুতে বসে ইরাক, সউদি আরব ও কুয়েতের সীমারেখা আনুষ্ঠানিক ভাবে টেনে দেন। এই হাই কমিশনারের বৃটিশ অ্যাটাশে লেঃ হ্যারম্যান তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, সীমা চিহ্নিত করণের সময় পার্সী কক্স কোন এক বিষয়ে ইবনে সউদকে তার তাবুতে ডেকে এনে খুবই তিরষ্কার করেন। তখন ইবনে সউদ পার্সী কক্সকে বলেছিলেন, আপনার কথায় অর্ধেক নয়, বরং গোটা রাজ্যই ছেড়ে দিতে পারি। পরে সেই সউদই আরবের শাসনকর্তা হন। ইতিহাসে তা উইকের সম্মেলন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সউদি আরব ও কুয়েত সীমারেখা টেনে দেয়ার বিষয়টি হজম করলেও ইরাক একে অবিচার হিসাবেই গণ্য করতে থাকে। উপসাগরে যাওয়ার অপরিহার্য পথ থেকে তার বঞ্চিত হওয়া বিগত ইরাক ইরান যুদ্ধ সহ কুয়েতে ইরাকী বাহিনীর অভিযানের একমাত্র কারণই ছিল এই বঞ্চনা। ফ্রান্স ও বৃটেন এমনিভাবে ইচ্ছেমত বিভিন্ন দেশের সীমা নির্ধারণ করে এবং তাদের প্রতি অনুগত পরিবারকে ক্ষমতাসীন করে। ১৯৬১ সালে কুয়েতের স্বাধীনতা ঘোষণার পর ইরাক চেষ্টা করে কুয়েত দখলের, কিন্তু বৃটিশ সৈন্য আবার কুয়েতে চলে এলে তা ব্যর্থ হয়। ১৯৬১ সালে ইরাকে আরব বার্থ গোসালিষ্ট পার্টি ক্ষমতাসীন হয়ে কুয়েতকে স্বীকৃতি দেয়-এতেও কোন চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি। ১৯৭৩ সালেও ইরাক আবার কুয়েত সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করেছিল। পরে আরবলীগের মধ্যস্থতায় তারা সরে আসে। অবশেষে ১৯৯০ সালের ২রা আগস্ট এক ঝটিকা অভিযানে ইরাক কুয়েত দখল করে নিয়ে তাকে উনিশতম প্রদেশ ঘোষণা করে। এর জন্য স্বয়ং কুয়েত ও সউদি আরবই দায়ী। কেন দায়ী তার উত্তর সামনে আসছে। আর এর পরের ঘটনা হল সাদ্দামের শোচনীয় পরাজয় ও মৃত্যু।
পরবর্তিতে উপনিবেশ হারিয়ে ইসরাঈলের জন্মদাতা বৃটেন আর্থিক ও সামরিক দিক দিয়ে দূর্বল হয়ে পড়লে আমেরিকা এসে ওই স্থান দখল করে সব রকম সাহায্য-সহযোগীতার মাধ্যমে ইসরাঈলকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবল সামরিক শক্তিধর একটি দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভাবতে অবাক লাগে! মাত্র কয়েক দশক পূর্বে যারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গোপনে এসে উদ্বাস্তু হিসেবে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করেছে, তারা এখন সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ। অন্যদিকে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার দাবীদার দেশ মিশর ও ইরাকসহ সিরিয়া, জর্ডান, সউদি আরব, ইসরাঈলের সাথে সমর শক্তিসহ অন্যান্য বিষয়ে তুলনার ক্ষেত্রে হাজার গুণ পিছিয়ে আছে। তার কারণ হল বিগত কয়েক দশক ধরে সুস্থ চিন্তা-চেতনা বিরোধী, ভোগ-বিলাসী, চরিত্রহীন গোটা কয়েক অপদার্থ রাজা-বাদশাহ নামক একনায়ক দৈত্য এই সব দেশের ঘাড়ে চেপে বসায়ই এমনটি হয়েছে।
অন্যদিকে বিপ্লবের মাধ্যমে রেজা শাহের পতনের পর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে একটি শক্তিশালী আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্য এটি একটি বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অন্যায় স্বার্থ ও আধিপত্য বিস্তারে ইরান শক্তিশালী অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মাত্র কয়েক মাস পরই ১৯৮০ সালে ইরাকের একনায়ক সাদ্দাম হোসেন যখন অন্যায়ভাবে অতর্কিতে ইরান আক্রমণ করে বসে তখন সউদী আরবসহ আরবের অন্যান্য দেশ ন্যায়-নীতি বিসর্জন দিয়ে অনানুষ্ঠানিক ভাবে ইরাককে সমর্থন করে গোপনে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য দেয়া শুরু করে। জাহেলিয়াত যুগের মত তারা দুটি মুসলিম দেশের যুদ্ধকে আরব-অনারব অর্থাৎ, আরব পার্সী যুদ্ধ হিসাবে গণ্য করতে থাকল। কুয়েত গোপনে স্থলপথে লরিতে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে ইরাকের জন্য যুদ্ধ বিমান পাঠাত। তৎকালীন বাংলাদেশের শহীদ রাষ্ট্রপতি একক ভাবে যুদ্ধ থামাবার চেষ্টা করে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এসে হঠাৎ চট্টগ্রামে ব্যর্থ সেনা অত্যুত্থানে নিহত হলে তা আর সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ৮ বৎসর যুদ্ধ চলার পর শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের চেষ্টায় যুদ্ধ বন্ধ হয়। সউদী আরব ও কুয়েত ইরাককে গোপনে আর্থিক ও সামরিক সাহায্য দিয়ে যে মারাত্মক ভুল করেছিল শেষে এটাই তাদের জন্য গলার ফাস হিসাবে আর্বিভূত হয়েছিল। ইরাক ইরান যুদ্ধ বন্ধের পর সাদ্দামের হাতে জমা থাকল এক বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের ভান্ডার, ফলে সাদ্দামের মাথা ঠিক থাকল না, ১৯৯০ সালের ২রা আগস্ট এক ঝটিকা অভিযানে কুয়েত দখল করে তা ইরাকের উনিশতম প্রদেশ ঘোষণা করল। বলা যেতে পারে, ইরানের বিরুদ্ধে ইরাককে কান্ড-জ্ঞানহীন ভাবে সাহায্য করার বদলা হিসাবে কুয়েত ও সউদীকে দেয়া এটা সাদ্দামের উপহার। কুয়েত দখলের পর ষড়যন্ত্রকারী সাম্রাজ্যবাদীদের গোপন তৎপরতায় ও চালে সাদ্দাম সউদী আরবকে হুমকি-ধমকি দেয়ার কারণে সউদী আরবের শাসকগোষ্ঠী ভয়ে দিশাহারা হয়ে আমেরিকান সেনাদের আরবের মাটিতে ডেকে আনল। বলা বাহুল্য যে, উসামা-বিন-লাদেন তার বিরোধীতা করে দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, ইরাককে আমরাই মোকাবেলা করতে সক্ষম, এজন্য আমেরিকার সাহায্যের কোন প্রয়োজন নাই। আর তা থেকেই লাদেনের সাথে রাজ প্রশাসনের বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার ফলশ্রুতিতে লাদেন দেশ থেকে বহিষ্কৃত হন। যাই হোক, পরবর্তী ইতিহাস সকলের জানা। অতঃপর সাদ্দামের পতন ঘটল এবং সউদীতে এই সামরিক সহযোগীতা দেয়ার খরচ বাবদও সউদি আরবের কাছে আমেরিকার পূর্বের কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলারের ঋণ উসূল করার ব্যবস্থা হয়ে গেল। পরবর্তীতে এক দশক পরে আমেরিকা সাদ্দামের হাতে মানবতা বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে- এই মিথ্যা অভিযোগ তুলে ইরাক আক্রমণ করে দখল করে নেয় এবং সাদ্দামকে অবশেষে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যা করে।
পৃথিবীর সকল মুসলিম দেশগুলো নিশ্চুপ ভাবে সব দেখলো। কিন্তু কোন প্রতিবাদও করল না। এমনকি ইরাক দখল করার পর যখন দেখা গেল যে, ইরাকের হাতে মানবতা বিধ্বংসী কোন অস্ত্র নেই। বুশের অভিযোগ সমস্ত পৃথিবীর সামনে মিথ্যা প্রমাণিত হল, তখনও কিন্তু মুসলিম বিশ্বসহ সভ্য দুনিয়া এই মিথ্যাচারের জন্য বুশের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারলনা। অথচ এই মিথ্যা অভিযোগের কারণে সৃষ্ট যুদ্ধে ইরাকের লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নারী পুরুষ ও শিশু হত্যা করা হল। ফলশ্রুতিতে এক গন্ডমুর্খ সমাজতান্ত্রিক এক নায়কের করুণ পরিণতি ঘটল। সউদি ও কুয়েতের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হল। ইরাক নামক দেশ ধ্বংস হল, আর লাভবান হল শুধু সাম্রাজ্যবাদীরা।
১৯৮১ সালে ইসরাঈল এফ-১৬ জঙ্গি বিমানের সাহায্যে এক ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে ইরাকের পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এই অপারেশনটিকে মনে হয়েছে যেন ইসরাঈলের এক নিরুদ্বেগ বিমান মহড়া। এই অপমানজনক আঘাতটি ইরাকের পক্ষে নিরবে হজম করে নেয়া ছাড়া কোন প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় নি।
পবিত্র হারামাইন শরীফ ও মসজিদে নববীর খাদেম হওয়ার দাবীদার সউদি রাজ প্রশাসনের ভূমিকা আজ সারা মুসলিম বিশ্বে চরমভাবে সমালোচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। তারা তাদের দেশের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সকল বিষয়গুলোকে বৃহত্তর জনস্বার্থে বা ইসলামের স্বার্থে মূল্যায়ন না করে তাদের রাজতন্ত্রের সুরক্ষা বা স্বার্থের মাপকাঠিতে বিচার করে বা মূল্যায়ন করে থাকে।
মিশরের রাজনীতিতে বিগত ৬০ বছর পরে ২০১২ সালে মুহাম্মদ মুরসির নেতৃত্বে একটি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়। মুরসি সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসেন। তার মাত্র এক বৎসর পরে ২০১৩ সালে সেনা প্রধান আবদুল ফাত্তাহ্ সি.সি, মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুৎ করে অন্যায় ভাবে মিশরের ক্ষমতায় চেপে বসে। গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক দেশ সহ পৃথিবীর আপামর জনগণ জানে যে, প্রেসিডেন্ট মুরসিকে অন্যায়ভাবে ক্ষমতাচ্যুৎ করা হয়েছে। কিন্তু স

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT