উপ সম্পাদকীয়

ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ

লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৭-২০২০ ইং ০২:০০:৫০ | সংবাদটি ৩৪৪ বার পঠিত

পবিত্র ঈদুল আযহার আর মাত্র কয়েক দিন বাকী। এদিকে একদিকে কোভিড-১৯ মহামারি অপরদিকে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ চলছে। তাই বন্যা মোকাবেলা করে এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়িয়ে ঈদ পালন করতে হবে। কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন আশংঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। মৃত্যুও থেমে নেই। সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায়ও মানুষ লকডাউন, সামাজিক ও শারীরিক দূরত্বের নিয়মগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে শিথীলতা দেখাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতেই ঈদুল আযহা পালন করতে হবে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন, ‘লিকুল্লি কাওমিন ঈদুন, হাজা ঈদুনা।’ প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব উৎসব রয়েছে। আমাদের জন্যও তেমনি রয়েছে দুটো উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। খুশি ও কল্যাণের সওগাত নিয়ে প্রতি বছরই কুরবানির ঈদ আসে। কুরবানি আরবি শব্দ। ‘কুরবুণ’ মানে নিকটবর্তী হওয়া, নৈকট্য লাভ করা। কুরবানি দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা হয় বলে এর নামকরণ করা হয়েছে কুরবানি। কুরবানি নতুন কোনো বিষয় নয়; বরং কুরবানির ইতিহাস অতি প্রাচীন। প্রত্যেক নবীর উম্মতের জন্য কুরবানির বিধিবদ্ধ নিয়মটি ছিল। ইরশাদ হচ্ছে ‘‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি’’ (সুরা হজ: আয়াত-৩৪)
তবে অন্যান্য জাতির কুরবানির নিয়ম ছিল আলাদা। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম আ:-এর সেই মহান ঘটনা স্মরণ করে আল্লাহর নির্দেশে সমগ্র বিশ্বের মুসলমানেরা পশু কুরবানির নামে আসলে কুরবানি দেবে নফসের সব অশুভ প্রবৃত্তিকে কুরবানি দেবে সব অসততা, অন্যায় ও পাপাচারকে। হযরত ইব্রাহীম (আ:) কর্তৃক তাঁর প্রাণের পুত্র ইসমাঈল (আ:) কে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি দানের মাধ্যমেই ইসলামে কুরবানি নিয়ম চালু হয়। ইরশাদ হচ্ছে-‘‘আমি তাঁকে মুক্ত করলাম এক মহান কুরবানির বিনিময়ে। আমি ইহা পরবর্তীদের কারণে রেখেছি’’ (সুরা সাফফাত: আয়াত ১০৭-১০৮) হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর পুত্র কুরবানির মধ্যে রয়েছে ত্যাগের সুমহান শিক্ষা। আল্লাহকে কিভাবে সন্তুষ্ট করতে হবে তার অনুপম দৃষ্টান্ত আমরা পাই ইব্রাহীম (আ:) এর কুরবানির ঘটনা থেকে।
ইব্রাহীম (আ:) এর কুরবানিকে আমাদের উপর অবধারিত করে আল্লাহপাক আমাদেরকে এই শিক্ষা দান করলেন-কেউ যদি আমার নৈকট্য লাভ করতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই ইব্রাহীমের মত ত্যাগী হতে হবে, তাকে ইব্রাহীমের মত নিবেদিত হতে হবে, ইব্রাহীমের মত তাকে একনিষ্ট হতে হবে।
আমরা আল্লাহর ইবাদত করি কিন্তু বিশুদ্ধ নিয়তে ইবাদত করিনা বলে আমাদের ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। অনরূপ কুরবানির মত শুরুত্বপূর্ণ ইবাদত কবুল হয় না নিয়তের অভাবে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ কুরবানি করে লোক দেখানোর জন্য আর এ উদ্দেশ্যেই কে কত বড় কুরবানির পশু কিনতে পারেন তার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেন। বহু টাকা দিয়ে কুরবানির পশু কিনেই ক্ষান্ত হয় না; বরং ঢাক-ঢোল পিটিয়ে থাকেন তিনি যে বহু টাকা দিয়ে কুরবানীর পশু কিনেছেন তা প্রচারের জন্য। এতে করে হাট-বাজারে, সমাজে একটি আলোচনার বিষয় হয়ে যায়-অমুক ব্যক্তি বহু টাকা দিয়ে কুরবানির পশু ক্রয় করেছেন। এরূপ ব্যক্তি কুরবানি দিয়ে লোক সমাজে সামান্য প্রশংসিত হন বটে কিন্তু আল্লাহর নিকট কোনো প্রতিদান পাননা। কারণ তিনি আল্লাহর সন্তুুষ্টির জন্য কুরবানি করেন না। কুরবানি করতে হবে, নিজের অর্থ-সম্পদ বিলিয়ে দিতে হবে, মানবজীবনের সকল কাজ করতে হবে একমাত্র আল্লাহকে সন্তুুষ্ট করার জন্যই।
ইরশাদ হচ্ছে-‘‘বল, আমার সালাত, আমার ইবাদত (হজ ও কুরবানি), আমার জীবন, আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর সন্তুুষ্টির জন্যই’’ (সুরা আনআম: আয়াত-১৬২)। লোক দেখানোর জন্য, সমাজে প্রচার করার জন্য কুরবানি করলে আল্লাহর দরবারে তা কখনও কবুল হয় না। কুরবানির পশুর গোশত নিজে খেতে পারবে। এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু নিজে কুরবানির গোশত খাওয়ার নামে যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। কুরবানিদাতা ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কুরবানির পশু কিনলে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ফ্রিজ কিনে থাকেন কুরবানির গোশত সংরক্ষণের জন্য। এতে করে কুরবানিদাতা কুরবানির গোশত খেয়ে থাকেন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। কিন্তু গরিব-দুঃখীরা ঈদের মত খুশির দিনেও দুটুকরা গোশত পাবার জন্য ধনী লোকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়ায়। তারা দুটুকরা গোশত পায় না। এটা আবার কেমন কথা? গরীব-দুঃখীরা গোশত পাবার জন্য দুয়ারে দুয়ারে ঘুরবে আর কুরবানি দাতা ফ্রিজের মধ্যে মাসের পর মাস কুরবানির গোশত রাখবে কোন বিবেকে? এটা মোটেই কাম্য নয়। কুরবানির পশুর গোশত গরিব-দুঃখীর মধ্যে বিতরণ করতে হবে এটা মহান আল্লাহর নির্দেশ।
ইরশাদ হচ্ছে-‘‘তোমরা উহা হতে আহার কর এবং দুস্থ ও অভাবগ্রস্তকে আহার করাও’’ (সূরা হজ: আয়াত-২৮)। যারা অধিক তাক্বওয়ার অধিকারী বা যারা কেবল আল্লাহর সন্তুুষ্টির জন্য কুরবানি করেন তাঁদের কুরবানি ই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য। ইরশাদ হচ্ছে-আল্লাহর নিকট পৌছায়না উহাদের গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া’’ (সূরা হজ: আয়াত-৩৭)।
লেখক : শিক্ষক-কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT