উপ সম্পাদকীয়

করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

মুস্তাফিজ সৈয়দ প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৭-২০২০ ইং ০৩:১১:১৪ | সংবাদটি ২৯৮ বার পঠিত

মানুষ প্রত্যাশা করে সুন্দর, সুস্থ জীবন যাপনের এবং মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের ২৬ অনুচ্ছেদে এবং আমাদের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আর্থিক ক্ষতিসাধন হলে সময়ের ছুটে চলা ও পরিশ্রমে অর্থ সম্পর্কিত ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়। শারীরিকভাবে অসুস্থতা চিকিৎসায়,সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং সুঅভ্যাসের মাধ্যমে শরীর স্বাস্থ্যের উন্নতি করা যায় কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়ে থাকে তা পুষিয়ে নেয়া অনেকাংশে কঠিন এবং দীর্ঘ সময়ব্যাপি প্রক্রিয়া।
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের থাবা। সারা বিশ্বজুড়ে অগণিত প্রাণ যাত্রা করেছে মহাজাগতিক ভ্রমনে। কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবীতে চলছে মহাকালের মহাসংকট। সবকিছুই এখন ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন। শারীরিক,মানসিক,আর্থিক তথা জীবন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অতি নিকট ভবিষ্যতে আমাদের জন্য অপেক্ষামান নতুন এক পৃথিবী। আমরা এখন যে সময়ের ভেতর বসবাস করছি তা অত্যন্ত কঠিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। কোভিড-১৯ প্রভাবে মহাকালের মহাসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষার্থী-শিক্ষক, স্কুল স্টাফসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে গত ১৮ মার্চ, ২০২০ থেকে সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রমসহ যাবতীয় কাজ বন্ধ করা হয়েছে।সার্বিক পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়ায় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ এখনো বন্ধই আছে। এ সময়ে করোনা মহামারী ক্রমশহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালা কবে নাগাদ খুলে দেয়া হবে তা নিয়ে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। দেশীয় প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরুত্ব বজায় রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব নয়। তাই এখন ভরসা দূর শিক্ষণ বা অনলাইন পাঠদান। শিক্ষা তিন প্রকার-১। প্রথাগত শিক্ষা ২। প্রথাবহির্ভূত শিক্ষা ৩। প্রথাবর্জিত শিক্ষা আবার প্রথাবহির্ভূত শিক্ষা দুই প্রকার- দূর শিক্ষা ও মুক্ত শিক্ষা। দূর শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ----- অর্থাৎ দূর শিক্ষা হল দূর শিক্ষণ এবং শিখন। সারাদেশের মতো বিভাগীয় শহর সিলেট জুড়ে অনলাইনে পাঠদান করছেন এ অঞ্চলের শিক্ষকরা বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে। অনলাইন পাঠদানে কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীরা লাভবান হচ্ছে কেননা একটু হলেও পড়াশোনার সুযোগ মিলছে। বাংলাদেশের শহরের বস্তি ও গ্রাম এলাকার ৫ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর গবেষণায় ওঠে এসেছে আগে যেখানে গ্রামের শিক্ষার্থীরা দিনে স্কুল, কোচিং ও বাড়িতে নিজেদের পড়ালেখা মিলে ১০ ঘণ্টা ব্যয় করত এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ২ ঘণ্টায় অর্থাৎ ৮০ শতাংশ সময় কমেছে পড়াশোনার।
গবেষণায় দেখা যায় মাত্র ১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী টেলিভিশনে ‘ঘরে বসে শিখি’ ও ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ এই দুটি অনুষ্ঠান দেখছে এবং ১ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের এই সময় পড়াশোনার সময় কমার বিপরীতে বেড়েছে শিশু শ্রমের হার। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের আগে যেখানে ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ২ ঘণ্টার বেশি আয়মূলক কাজে জড়িত ছিল এখন তার হার দাঁড়িয়েছে ১৬ শতাংশে। অনলাইন পাঠদান অবশ্যই প্রশংসার প্রাপ্তির দাবিদার তবে করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও চাহিদা খুঁজে সেই আলোকে কাজ করলে দূরশিক্ষণ ফলপ্রসূ হবে। শিক্ষার্থীদের বহু প্রতীক্ষিত প্রত্যাশা হলো ইন্টারনেট ডাটা প্যাক শিক্ষার্থীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করার সুযোগ রাখা এবং ক্রয়কৃত ডাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করার সুযোগ। সবাই জানেন ইন্টারনেট প্যাকেজ মূল্য সহজলভ্য নয় এবং নির্দিষ্ট এর মেয়াদসীমা দেয়া থাকে। অনেক অভিভাবক হয়তো কষ্ট করে হলেও ডাটা প্যাক কিনে দিচ্ছেন যেন তার সন্তান পড়ালেখার এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। বর্তমান এরূপ পরিস্থিতিতে গ্রামীণ ফোন, বাংলালিংক, রবিসহ সকল অপারেটর যদি নামমূল্যে ও অনির্দিষ্ট মেয়াদসীমার জন্য ইন্টারনেট প্যাকেজ ক্রয় করার সুযোগ দিতো তাহলে শিক্ষার্থীরা লাভবান হতো। এই কাজটি যদি মোবাইল কোম্পানি করতো তাহলে সর্ব সাধারণের প্রশংসা,পুষ্পমাল্য পেতো। শিক্ষার্থীরা টাকা দিয়ে ইন্টারনেট কিনে ঠিকমতো পড়তে পারছে না কেননা অনেক অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সমস্যা যার ফলে ঠিকমতো অনলাইনে ক্লাস করতে পারে না। এছাড়াও আছে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার প্রবণতা। নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার মান উন্নয়ন, স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট প্যাক ক্রয় করার সুযোগ ও তা অনির্দিষ্ট মেয়াদে ব্যবহার,নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ,শিখন প্রক্রিয়ার নতুনত্ব এসবই শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা।
উল্লেখ্য ‘সমসাময়িক শিক্ষা ও আমাদের ভাবনা’ গ্রুপ আয়োজিত লাইভ প্রোগ্রামে ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধ মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হলে একসেস টু ইনফরমেশনের প্রোগ্রাম এসিট্যান্ট কর্মকর্তা অভিজিৎ সাহা বলেছেন ‘নিজের টাকায় ক্রয়কৃত ইন্টারনেট প্যাক অনির্দিষ্ট মেয়াদের দাবিটি যৌক্তিক এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়টি নিয়ে ভাবা হচ্ছে।’
আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের সামাজিক বাস্তবতা অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর সাথে মেলালে চলবে না, আমাদের পার্থক্যটা আকাশ পাতাল। আমাদের দেশে অনলাইন ক্লাস পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। মুখে ফোরজি নেটওয়ার্কের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে টুজির থেকে একটু বেশি গতি সম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা। অপরদিকে অপারেটর কোম্পানিগুলোর উচ্চ রেট আবার ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধ মেয়াদ, নেই নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ। যার ফলে সবকিছু থমকে যাওয়া অবস্থায় চাহিদা শতভাগ পূরণ করা সত্যিই একটি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাই এখন সময়ের দাবী, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চাই সবার সদিচ্ছা ও যথাযথ প্রয়োগ। সারাবিশ্বে করোনা ভাইরাস আলোচনার টেবিলে কেন্দ্রবিন্দু। এসময় শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু করতে হবে নিজেকে ভালো রাখার জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য। শিক্ষার্থীরাই তো দেশ ও দশের সম্পদ। আমাদের দেশ ও দশের উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবেই এখনি সময় খোঁজ নেয়া শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার। সেই প্রত্যাশার আলোকেই পরিকল্পনা গ্রহণ ও এর বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবে আমাদের বাংলাদেশ।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT