উপ সম্পাদকীয়

জাগো নারী বহ্নিশিখা

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১০-২০২০ ইং ০৫:৫৭:০৫ | সংবাদটি ৮৩ বার পঠিত

জীবনে পড়াশুনা কিছুই করা হলো না। জানা হলো না বিশ্বের কোন কিছুই। সহজ অর্থে মূর্খই থেকে গেলাম। তবে মাঝে মাঝে মূর্খেরও কিছু জানার সাধ জাগে। সাধ্য নাই। সাধ্য নাই বিশ্বের মহাপুরুষ, মহাজ্ঞানী লেখক-সাহিত্যিক-বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক-ধর্মগুরু-রাজনীতিবিদ-সাংবাদিকের রেখে যাওয়া লাইব্রেরীতে মহাকালের স্মৃতি-নিদর্শনে অবগাহনে তাই হয়তো অনেকের মন্তব্য-উক্তি লিখে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করি। তেমনি একটি উক্তি ডেল কার্নেগীর। তিনি বলেন, ‘একটি সুখের সংসারকে ধ্বংস করার জন্য শয়তান যতগুলো অস্ত্র আবিষ্কার করেছে তার মধ্যে মারাত্মক অস্ত্র স্ত্রীর ঘ্যানর ঘ্যানর।’ যতটুকু মনে পড়ে আরো একজন মহাপুরুষ স্থানীয় ব্যক্তি এ প্রসঙ্গে আর একটু আগ বাড়িয়ে বলেছেন-‘পুরুষ নষ্টে যায় নারে জাত, নারী নষ্টে জাত কপোকাত।’ একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে উক্তি দু’টিই প্রায় সমার্থক। কিন্তু আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি উক্তি এ বিষয়ে একেবারেই ভিন্ন মাত্রার। বলতে গেলে বলা যায় পুরোপুরি উল্টো। এবং সেটি হলো ‘এ বিশ্বে যা কিছু মহান চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
(ক) ‘ঘ্যানর’ ‘ঘ্যানর’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো-ক্রমাগত নাকী কান্না অনুনয়, একটানা বিরক্তিকর শব্দ। বিজ্ঞ ডেল কার্নেগী সাহেব এক্ষেত্রে অবশ্যই জগতের নারীদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেননি তাঁর মন্তব্যের মধ্য দিয়ে। তথাকথিত শয়তানের আবিষ্কার ‘ঘ্যানর’ ‘ঘ্যানর’ শব্দটি যে শুধু নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা কিন্তু নয়। ইতিহাস সে সাক্ষী দেয় না। বাস্তব সত্য হলো যেকোন সুখের সংসার গড়ে ওঠে স্বামী-স্ত্রী দু’জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অংশ গ্রহণে। শয়তানের আবিষ্কার যদি স্ত্রীর ঘ্যানর ঘ্যানর হয় অনেক সুখের সংসার কিন্তু ধ্বংস হয় স্বামীর অকারণ কর্তৃত্ববাদী, প্রভুত্ববাদী, অত্যাচার-নির্যাতন আর আদিমতায় ভরা চিন্তা-চেতনার মানসিকতার কারণে। ডেল কার্নেগী সাহেবের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো সেটা আমরা জানি না কিন্তু সে যা-ই হোক কারো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সর্বজনীন হতে পারে না। কার্নেগী সাহেবের নিজের দেশের সমাজের চিত্র এটা হতে পারে কিন্তু এই ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের সমাজেই এমনটি সত্য নয়। সুখের সংসার ধ্বংস করার ক্ষমতা স্ত্রী তথা নারীদের নেই। কারণ নারীরা এখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বামী তথা পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল। স্ত্রীরা এখানে স্বামীদের কাছে অনুনয় বিনয়ই করতে পারে। এর বেশি কিছু নয়। কারণ আজও স্ত্রীরা স্বামীদের কাছে করুণার পাত্রই। তাই ঘ্যানর ঘ্যানর শব্দটি এখানে প্রযোজ্য কিনা সেটা বোধ হয় ভেবে দেখা বিবেচ্য বিষয়।
(খ) এদিকে ‘পুরুষ নষ্টে যায় নারে জাত, নারী নষ্টে জাত কপোকাত’ বাণীটির গভীরতা বোঝার হয়তো জ্ঞান আমার নেই কিন্তু যে মহৎ উদ্দেশ্যেই বাণীটি প্রচার করা হোক না কেন, এতে বোধ হয় নারী জাতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটু ঘাটতি প্রকাশ পেয়েছে। বাণী প্রদানকারী বিজ্ঞজন ‘নষ্ট’ বলতে আসলে তিনি কি বুঝাতে চাইছেন তিনিই জানেন। তবে আমাদের মতো অতি সাধারণ গণ হালকাভাবে এটাই বুঝি যে, নারীগণ নিজে নিজে নষ্ট হতে পারেন না পুরুষদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া। একটি পরিবার, একটি সমাজ বা জাতের সকল পুরুষ যদি নষ্ট হয়ে যায় তবে সে পরিবার-সমাজ-জাত-জাতি কখনো বিশুদ্ধ থাকতে পারে না। পুরুষ নষ্টেও জাত কপোকাত হতে বাধ্য। ধ্বংসের সব দায় নারী জাতির ওপর বর্তালে তা কখনো সুবিচার নয়। সিংহভাগ দায় পুরুষেরই। বাস্তবতা তাই। এ বাস্তবতা অস্বীকারের কোন অবকাশ নেই।
অস্বীকার করলে তা হবে সত্যের অপলাপ মাত্র। এর প্রমাণ শুধু একদিনের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার শিরোনামই যথেষ্ট। যেমন-২০.০৯.২০২০ তারিখের ‘যুগান্তর’ এর শিরোনাম-‘এমসি কলেজে ধর্ষণ, ছয় আসামীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ।’ দৈনিক সমকাল সচিত্র প্রতিবেদন সহ শিরোনাম লিখে-‘এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ৬ আসামির নমুনা সংগ্রহ, বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু’, গির্জায় কিশোরী ধর্ষণ, ফাদারের শাস্তির দাবিতে মানব বন্ধন’ (দৈনিক আমাদের সময়) ‘সাভারে ঘরে ঢুকে ‘গৃহবধূকে দল বেধে ধর্ষণ, গ্রেফতার ৩ (দেশ রূপান্তর), দৈনিক আমাদের সময় এর কয়েকটি শিরোনাম হলো-‘৬ আসামির ডিএনএ সংগ্রহ ঘটনাস্থলে তদন্ত কমিটি, ‘স্কুল ছাত্রী নীলা হত্যা প্রধান আসামি মিজানুরের দোষ স্বীকার ‘নয় মাসে ধর্ষণের শিকার ৯৭৫ নারী, গণধর্ষণ ২০৮, ‘সেপ্টেম্বরে নির্যাতনের শিকার ৩৪০ নারী ও কন্যা শিশু’ ‘গৃহকর্মী ধর্ষণের মামলায় ছাত্রলীগ নেতা রিমান্ডে’, ‘যুক্তরাজ্যে ধর্ষণের মামলা নিষ্পত্তি হয় গড়ে ৮ মাসে’ ‘প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার তরুণী’, ‘ধর্ষিতার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, উত্তর প্রদেশে হেনস্তার শিকার রাহুল-প্রিয়ংকা’। এদিকে ২৩.০৯.২০২০ সচিত্র একটি শিরোনাম লিখে-‘স্কুল ছাত্রী নীলা হত্যা, বখাটে মিজানের বাবা-মা গ্রেফতার (গ্রেফতার মিজানের বাবা-মা ছবির নীচে)’।
ধর্ষণ সম্পৃক্ত খবরের শিরোনামের একদিনের তালিকাই যদি এমন লম্বা হয় তাহলে সারা বছরের হিসেব করলে বাংলাদেশের চিত্রটি কেমন হবে এবং বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের ভাবমূর্তি কেমন হবে তা কি আমরা ভেবে দেখেছি! প্রবাসী এক ভদ্রলোক মোবাইলে বল্লেন, বাংলাদেশে একি হচ্ছে? এই ধর্ষণ নিয়ে কিছু লিখেন না! কি আর লিখবো? লজ্জা-ঘৃণায় মুখ কি দিয়ে ঢাকবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। একাত্তরে পাকি সৈন্যরা স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিতে দ্বিধা করেনি, দ্বিধা করেনি মায়ের কাছ থেকে মেয়েকে নিতে; ঐ পশুদের শায়েস্তা করতেই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। আমরা স্বাধীনতা পেলাম। বিদেশী (পাকিস্তানি) পশুর দল বাংলা ছাড়লো। কিন্তু আজ আমরা একি দেখছি? পাকি নরপশুর প্রেতাত্মা আজ বাংলাদেশের সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে এমসি কলেজ নিয়ে সিলেটবাসী গর্ব করে সেই এমসি কলেজের হোস্টেলের কক্ষে পশুর দল যে তান্ডব চালালো তারা পাকিদেরকে কি হার মানালো না? এখানে বিদ্যার চর্চা হয়। এ কোন বিদ্যা শিখলো এমসি কলেজের ছাত্র নামধারী পশুর দল? আমরা দেখলাম স্কুল ছাত্রী নীলার ধর্ষক-খুনী বখাটে মিজানের বাবা-মাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের ছবি ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। জনমনে তো এমন প্রশ্ন জাগতেই পারে-এমসি কলেজের কুখ্যাত ধর্ষকদের বাবা-মাদের গ্রেফতার কেন নয়? তাদের ছবি পত্রিকায় কেন ছাপা হয়নি?
এসব বর্বরতার কথা কি আর লিখে শেষ করা যায়? সিলেট এমসি কলেজ তো বাংলাদেশের সমাজেরই অংশ! ধর্ষণের কালো ছায়া সারা দেশকেই আজ গ্রাস করছে। এই কালো ছায়া থেকে আলোর পথে তো আসতে হবে। আর সে পথে আসতে হলে তো ধর্ষণ মামলা সমূহের তদন্ত ও বিচার বিলম্বের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। সেটা কি আছে? এর বিচার তো করতে হবে। ধর্ষণ বা ধর্ষণ মামলায় নাকি হাইকোর্টের ৭ নির্দেশনা রয়েছে; সেটা নাকি কাগজে-কলমেই রয়েছে। তাহলে উপায়? উপায় তো বের করতে হবে। এমনটিও শুনেছি যে, ধর্ষণ মামলার তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে করতে হবে এবং বিচার করতে হবে ১৮০ দিনের মধ্যে। সেটা কি হয়? সে বিচার কে করবে? আর সে বিচার যদি না হয় তাহলে নরপশু ধর্ষকের দল তো দল বেধে অসহায় গৃহবধূদের ঘরে ঢুকবেই! একটি পত্রিকায় পৃথম পৃষ্ঠায় (আমাদের সময় ০৭.১০.২০২০) তিন রাজনীতিবিদের মন্তব্য দেখলাম। ধর্ষকদের সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘বর্বরতার চরম সীমায় পৌঁছেছে তারা, আইন অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।’ পাশাপাশি দেশের নারী নেত্রীরা তো প্রশ্ন তুলছেন আইন প্রণেতারা চুপ কেন?’ জি.এম কাদের বলেছেন-মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে আইন করুন।’ দেশের একজন অতিসাধারণ মানুষ হিসেবে আমি বলি-এই পশুদের জন্য মৃত্যুদন্ড নয়, আমৃত্যু কারাবাসা। আর এদের জন্য সাধারণ কারাগার নয়। ধর্ষকদের জন্য আলাদা কারাগার নির্মাণ করুন। কারাগারের ফটকে ধর্ষকদের নাম, পিতা-মাতার নাম ঠিকানা ঝুলিয়ে দিন। পত্রিকায় ওদের তালিকা প্রকাশ করুন। ওদের পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করুন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘দলমত নির্বিশেষ রুখে দাঁড়াতে হবে।’ আমার মনে হয়, এই রুখে দাঁড়ানোর অর্থই হলো-ধর্ষকদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন। এক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি উক্তির প্রতি দলমত নির্বিশেষে শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি এবং সেটি হলে জনগণকে ছাড়া, জনগণকে সংঘবদ্ধ না করে, জনগণকে আন্দোলনমুখী না করে এবং পরিষ্কার আদর্শ সামনে না রেখে কোনো রকম গণআন্দোলন হতে পারেনা।’ এই ধর্ষক বিরোধী গণআন্দোলনেও আদর্শের বড়োই প্রয়োজন।
বড় বড় তত্ত্ব কথায় না গিয়ে একথা স্বীকার করতেই হবে যে ধর্ষণের মূল টার্গেট কিন্তু নারী। আর এটাও ঠিক যে যার যার অধিকার আদায় করেই নিতে হয়। স্বেচ্ছায় কেউ অধিকার দেয় না। দিতেও চায় না। নারীদের সম্মান রক্ষার অধিকার, মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার আদায় করতে নারী সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। সংগ্রাম করতে হবে। করতে হবে বিদ্রোহ। ধর্ষণ নামক বর্বরতার শিকার কোন নারী হলে সমগ্র নারী সমাজকে লাঠি হাতে ধর্ষকের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। ভাবতে অবাক লাগে, দুঃখ লাগে ধর্ষকদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম-মিছিলে নারীদের অংশগ্রহণ নিতান্তই কম। এতে ধর্ষকেরা ধর্ষণে উৎসাহিত হয়। ভয় পায় না। ধর্ষকরা পুরুষ। তাই পুরুষদের মিছিলকে তারা খুব একটা ভয় পায় না। মনে মনে হাসে। বিদ্রোহী কবির বাণী ‘এ বিশ্বে যা কিছু মহান চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ এর প্রতি নারী সমাজকেও বিশ্বাস করতে হবে। কবি বলেছেন-‘জাগো নারী বহ্নি শিখা’। কবির কথায় সাড়া দিয়ে নারীরা জেগে উঠলেই ধর্ষকরা পুড়ে ছারখার হবে। অন্য কিছুতে নয়। নারীরা নারীকে শুধু নারী ভাবলে মুক্তি নেই। নিজেকে মানুষও ভাবতে হবে। এতে পুরুষদেরও হুস হবে। নারীরা জাগলে ধর্ষকরা পালাবেই পালাবে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT