উপ সম্পাদকীয়

কথ্য ও জাতীয় ভাষা প্রসঙ্গ

রূপালী চক্রবর্তী রুপু প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১০-২০২০ ইং ০৬:০০:০৭ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

সাধারণত মুখ নিঃসৃত কথা-ই ভাষা। প্রথমে আমরা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি, ইঙ্গিত ও কথা থেকে কথা বলার অনুকরণ শিখি। তাহলে মায়ের মুখ নিঃসৃত কথাই কথ্যভাষা। আর এই কথ্য ভাষা বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে ভিন্নরকম উপায়ে উচ্চারিত বিধায় এ ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষা বলা যায়। ভাষা কথ্য ও লেখ্য দুই উপায়ে প্রচলিত। বইপত্র ও অফিসিয়াল ভাষা শুদ্ধ ও জাতীয় ভাষা হিসেবে পরিগণিত দেশের সর্বত্র।
আমরা বাঙালি জাতি। বাঙালি জাতি হিসেবে বাংলায় কথা বলা এবং লিখিতভাবে শিক্ষালাভ করার অধিকার রয়েছে আমাদের। আমরা আমাদের মনের ভাব যেভাবে বাংলায় অবলীলায় প্রকাশ করতে পারব তা অন্য কোনভাষায় তেমনটি সম্ভবপর নয়। শৈশবে শিশুরা প্রথমে তার মায়ের কাছ থেকে কথা বলতে শিখে, একেক অঞ্চলের মায়ের ভাষা হয়ে থাকে একেক রকম। কিন্তু আমাদের জাতীয় ভাষা হচ্ছে বাংলা। আর সেই ভাষার মাধ্যমেই আমাদেরকে উচ্চতর শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে হবে।
আমাদের মায়ের ভাষায়ই বেশির ভাগ সময় আমরা কথা বলে থাকি। আর শুদ্ধ রূপে লিখার জন্য ও অফিস আদালতে এমনকি স্কুল কলেজে বলার জন্যও দেশমাতৃকার জাতীয় ভাষা ব্যবহার করি। ভূমিষ্ঠজাত হওয়ার পর পরই মায়ের ¯েœহ ও অবয়ব দেখি। শ্রুতমুখে প্রথমে ‘মা’ শব্দটির সাথে পরিচিত হই। মায়ের মুখের শুদ্ধ ভাষাই মাতৃভাষা।
ব্যাকরণগত দিক দিয়ে যে শাস্ত্র পাঠ করিয়ে মুখ নিঃসৃত ভাষা শুদ্ধরূপে পড়িতে, বলিতে ও শিখিতে পারা যায় তাই ভাষা। কথ্য ভাষার চেয়ে লেখ্য ও জাতীয় ভাষার গুরুত্ব সুশীল সমাজে ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেশি। বাংলা ভাষার উচ্চারিত ধ্বনি শিখার জন্য ৫০টি কী বা হরফ রয়েছে।
আমরা হয়তো নিজেদের মায়ের ভাষায় কথা বলে আনন্দ পাই যা অন্য কোন ভাষাতে পাই না। কিন্তু তাই বলে- মায়েদের আঞ্চলিক ভাষায় উচ্চতর শিক্ষা নেওয়া যায় না। শিক্ষা নিতে হয় জাতীয় ভাষা বাংলায় যা গোটা দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য ও অফিস আদালতে ব্যবহৃত। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজী ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন কি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইংরেজী ভাষার প্রভাব বেশি।
তবে উচিত সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা এবং শুদ্ধ বাংলার প্রসার ঘটানো কারণ বাংলা যে আমাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষা বাংলাকে নিয়ে ১৯৫২ সালে আন্দোলন সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়েছিল সালাম, বরকত রফিক, জব্বার সহ আরো অনেককেই। এরই মধ্যে শহীদ ও হতাহত সহ রক্ত দিতে হয়েছিল ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
বাঙালি জাতির অধিকার ও দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই ভাষা আন্দোলন করতে হয়েছিল পাকিস্তানীদের সাথে। মায়ের ভাষা মাতৃভাষা বাংলা জীবনচলার ক্ষেত্রে পাথেয় সরূপ। যখন উচ্চ শিক্ষা ও শ্রম বিনিময় করার জন্য বিদেশে যায় আমাদের দেশের লোক তখন বাধ্য হয়েই বিদেশী ভাষা ও প্রয়োজনীয় কাজ শিখে যায়। কিন্তু তাই বলে কি বিদেশী ভাষায় নিজেদের পরিচালিত করতে হবে, মোটেই না কারণ কৃষ্টি ঐতিহ্য ও রক্তে মিশে আছে নিজেদের মায়ের ভাষা, মাতৃভাষা বাংলাভাষা। মাতৃভাষা হচ্ছে সহজাত ভাষা। এ ভাষায় শিক্ষা লাভ করে সহজেই জ্ঞান অর্জন যেভাবে সম্ভব তা অন্য কোন ভাষায় সম্ভবপর হয়ে ওঠবে না। অন্যদিকে বিদেশী ভাষার কথা বলা এবং শিক্ষা লাভ করা কষ্টসাধ্য।
তাই বলা হয় যে মাতৃভাষা ছাড়া কোন জাতি কখনই উন্নতি লাভ করতে পারে না। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করা হলে তা সহজেই আয়ত্ত করা যাবে যা অন্য কোন ভাষায় ততটা সহজ নয়। মাতৃক্রোড়ে থেকে যে ভাষায় সর্বপ্রথম শিশু কথা বলতে শিখে, সে ভাষার বর্ণের সাথে সবার আগে পরিচিত হওয়া উচিত। সে ভাষার মাধ্যমেই উচ্চতর শিক্ষায় অগ্রসর হতে হবে। মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম ভাষা। বাংলা ভাষার জন্ম বঙ্গকামরূপী ভাষা থেকে। বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজারের উপরে ভাষা প্রচলিত, প্রায় ২৪ কোটি লোকের মুখের ভাষা বাংলা। যে ভাষায় মোরা কথা বলি। লিখন লিখি ও আপনজনের সাথে দেশে-বিদেশে কথা বলি তার নাম বাংলা ভাষা, মাতৃভাষা, জাতীয় ভাষা ও সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ভাষা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়- ইউরোপীয় বিদ্যা ইংরেজী ভাষার জাহাজে করে এদেশের শহরে বন্দরে আসতে পারে, কিন্তু পল্লীর আনাচে কানাচে তাকে পৌঁছে দিতে হলে দেশী ভাষার ডিঙ্গী নৌকা প্রয়োজন। এজন্যই বলা হয় মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ ও চিন্তার উৎকর্ষতা আদান-প্রদান করতে কতগুলো সহজ সুবিধা রয়েছে। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষা গুরুত্ব পাবে এটাই স্বাভাবিক।
মাতৃভাষার মাধ্যমে গাঁথুনিটা খুব মজবুত করে দিতে পারলে যে কোন ভাষায় শিক্ষার্থীরা অতি সহজে পারদর্শিতা অর্জন করতে পারে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই মাতৃভাষা বাংলা, রাষ্ট্র ভাষা ও জাতীয় ভাষার মর্যাদা লাভ করে। তারপর থেকেই শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলা ভাষা ক্রমেই বিস্তার লাভ করে চলেছে। শিল্প-বাণিজ্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির মূলে রয়েছে মাতৃভাষা। মাতৃভাষা মানবজীবনের অমৃত রসায়ন।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT