উপ সম্পাদকীয়

আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া সংকট প্রসঙ্গ

রায়হান আহমেদ তপাদার প্রকাশিত হয়েছে: ২১-১০-২০২০ ইং ০৬:০৬:৫৩ | সংবাদটি ৯৭ বার পঠিত

২০১৬ সালের পরে এই প্রথম আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার মধ্যে বড় ধরনের লড়াই শুরু হল। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর থেকেই এই অঞ্চলে দুই দেশের বিরোধ চলছে। ১৯৯০ এর দশকে আর্মেনিয়ান নৃগোষ্ঠী আজারবাইজানের কাছ থেকে কারাবাখ দখল করে। এ নিয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে সেসময়ই। শুরু হয় যুদ্ধ, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০ হাজার মানুষ। ১৯৯৪ সালে দুই পক্ষের মধ্য যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সরাসরি সংঘাতের ইতি ঘটে। ২০১০ সালে ফ্রান্স, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রর মধ্যস্থতায় শান্তি চুক্তির উদ্যোগ ভেস্তে যায়। নিজেদের অঞ্চল পুনরায় দখলে বেশ কয়েকবারই হুমকি দিয়েছে আজারবাইজান। নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও নাগর্নো-কারাবাখ অনেকটাই আর্মেনিয়ার সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। অঞ্চলটিকে সামরিকভাবে রক্ষার কথা প্রকাশ্যেই বলে আসছে আর্মেনিয়াও। পূর্ব ইউরোপে দক্ষিণ ককেশাসের বিরোধপূর্ণ এলাকা নাগোর্নো-কারাবাখকে কেন্দ্র করে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে কয়েকদিন ধরে তীব্র লড়াই চলছে। এই অঞ্চল নিয়ে দুটো দেশের মধ্যে এর আগেও থেকে থেকে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সামরিক সংঘাতও হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সবই ছিল সীমিত পরিসরে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের এই দুটো দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে শুরু হওয়া এবারের যুদ্ধ আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় ভিন্ন। বর্তমান সংঘর্ষের মাত্রা, ধরণ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রতিক্রিয়া- এসব কিছুই ওই অঞ্চলের সাম্প্রতিক কালের সব উত্তেজনাকে ছাড়িয়ে গেছে।
সম্প্রতি আর্মেনিয়া সরকার নাটকীয়ভাবে দেশটিতে সামরিক আইন জারি করেছে। একই সঙ্গে তারা তাদের সেনাবাহিনীকে সুসংহত করার কাজ করছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিজ নিজ নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। আর্মেনিয়ার সরকার বলেছে নাগোরনো-কারাবাখ নামের যে এলাকাটিকে তারা নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে থাকে, সেই এলাকায় প্রতিবেশী দেশ আজারবাইজান সামরিক অভিযান চালিয়েছে। অবশ্য আজারবাইজান বলেছে, আর্মেনীয় সেনাদের গোলা হামলার পাল্টা জবাব দিতেই তারা নাগোরনো-কারাবাখ এলাকায় হামলা চালিয়েছে।
নাগোরনো-কারাবাখ এলাকাটি মুসলিমপ্রধান দেশ আজারবাইনের ভূখণ্ড বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু ওই এলাকার বেশির ভাগ বাসিন্দা যেহেতু আর্মেনীয় খ্রিষ্টান, সেহেতু তারা আজারবাইজানের শাসনাধীন থাকতে চায় না। প্রায় এক শতাব্দী ধরে নাগোরনো-কারাবাখের আর্মেনীয় খ্রিষ্টানরা আজারবাইজানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসছে। ১৯৯১ সালে ভূখণ্ডটি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল এবং তখন থেকে তারা আর্মেনীয় সরকারের মদদ নিয়ে স্বশাসন বজায় রেখে আসছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পেলেও রিপাবলিক অব আর্তাসক নামের একটি সরকার ভূখণ্ডটি শাসন করে থাকে।আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের দ্বন্দ্ব অবসানে যে শান্তিপ্রক্রিয়া চলে আসছে, তা গত দুই বছরে দৃশ্যত বেশ খানিক এগিয়েছিল। তার মধ্যেই ইউরোপের অন্যতম ‘হিমঘরে থাকা সংঘাতের’ আবার উদ্গিরণ ঘটেছে।
গত সপ্তাহ থেকেই নাগোরনো-কারাবাখের সেনারা আর্মেনিয়ার সেনাদের সঙ্গে এক হয়ে আজারবাইজানি স্থল ও বিমানবাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত সেখানে কমপক্ষে এক শ লোক নিহত ও কয়েক শ লোক আহত হয়েছে। আজারবাইজান নাগোরনো-কারাবাখের বড় একটি এলাকা দখল করে নিয়েছে বলে দাবি করলেও আর্মেনিয়া তা অস্বীকার করেছে। সব মিলিয়ে সেখানে এখন সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে। নাগোরনো-কারাবাখের পুরো অঞ্চলই আজারবাইজানের সীমানার ভেতরে পড়েছে। পার্বত্য এই এলাকার চার দিকই স্থলসীমানা দ্বারা বেষ্টিত। সোভিয়েত ইউনিয়ন সৃষ্টির আগে থেকেই এটি স্বাধীন হবে, নাকি আজারবাইজানের সঙ্গে অখণ্ড এলাকা হিসেবে থাকবে, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান উভয় দেশই যখন সোভিয়েত রাষ্ট্র হিসেবে ছিল, তখন এ-সংক্রান্ত সব ধরনের উত্তেজনা দমন করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু শীতল যুদ্ধ এবং এ অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ অবসানে চেপে রাখা উত্তেজনার উদ্গিরণ হয়। আর্মেনীয় ও আজারবাইজানি বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এ সময় আর্মেনীয় বাহিনী নাগোরনো-কারাবাখসহ আজারবাইজানের আরও কয়েকটি এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ১৯৯৪ সালে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সেই যুদ্ধের অবসান হয়। নাগোরনো-কারাবাখ এলাকাটি মুসলিমপ্রধান দেশ আজারবাইনের ভূখণ্ড বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু ওই এলাকার বেশির ভাগ বাসিন্দা যেহেতু আর্মেনীয় খ্রিষ্টান, সেহেতু তারা আজারবাইজানের শাসনাধীন থাকতে চায় না।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে নাগোরনো-কারাবাখের আর্মেনীয় খ্রিষ্টানরা আজারবাইজানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসছে। ১৯৯১ সালে ভূখণ্ডটি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল এবং তখন থেকে তারা আর্মেনীয় সরকারের মদদ নিয়ে স্বশাসন বজায় রেখে আসছে
রিকনসিলিয়েশন রিসোর্সেস নামের একটি শান্তি প্রতিষ্ঠাবিষয়ক গ্রুপের ককেশাস প্রোগ্রাম ডিরেক্টর লরেন্স ব্রোয়ার্স বলেছেন, এ দুই দেশের মধ্যবর্তী সীমান্তকে বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকভাবে সজ্জিত সীমান্ত হিসেবে ধরা হয়। তিনি বলেছেন, উভয় দেশের সীমানায় পরিখা খনন করে সেখানে সার্বক্ষণিক সেনা মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। পরিখাগুলো এত কাছাকাছি যে এক পরিখায় বসে কোনো সেনা অন্য পরিখার সেনাদের সঙ্গে কথোপকথন করতে পারেন।
আজারবাইজান মুসলিমপ্রধান এবং আর্মেনিয়া খ্রিষ্টান প্রধান দেশ হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বের পেছনে ধর্মীয় কারণ বেশি কাজ করে বলে মনে করা হয়। তবে অনেকে এটিকে অতিরঞ্জিত মত বলেও মনে করে। কারণ, আজারবাইজান বহু আগে থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে জোরালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখে চলেছে। এখন প্রশ্ন হলো এ উত্তেজনা এখন কেন চাঙা হলো? কেনই-বা আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার যুদ্ধ বেঁধে গেল? আসলে ২০১৮ সালে একটি আন্দোলনের পর আর্মেনীয় নতুন প্রজন্মের মধ্যে আশা জেগেছিল অচিরেই নাগোরনো-কারাবাখের বিষয়ে সুরাহা হবে। কিন্তু এ আশাবাদের মধ্যেই আজারবাইজানের নেতারা অভিযোগ করেন আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এদিকে আজারবাইজান অভিযোগ করেছে, আর্মেনিয়া নতুন করে আজারবাইজানের ভূমি দখলের পাঁয়তারা করছে। আজারবাইজানকে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে তুরস্ক। রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবে আর্মেনিয়ার পাশে থাকলেও আজারবাইজানের অভিজাত গোষ্ঠীর সঙ্গে রাশিয়ার সদ্ভাব রয়েছে। আর্মেনিয়ার অভিযোগ আজারবাইজানের তেল ও গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ নিতে তুরস্ক তাদের মদদ দিচ্ছে। তুরস্ক সিরিয়ার বিদ্রোহীদেরও ভাড়া করে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করাচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেছে। এর আগে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের বাহিনীর মধ্যে যতবারই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, কয়েকদিন পরেই সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। কিন্তু লন্ডনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাটাম হাউজে দক্ষিণ ককেশাস বিশেষজ্ঞ ও গবেষক লরেন্স ব্রোয়ার্স বলছেন, বর্তমান যুদ্ধের যে তীব্রতা সেটা দেখে ধারণা করা যায় যে এবার হয়তো সেরকম সম্ভব হবে না। যে অঞ্চলের জন্য লড়াই চলছে সেই নাগোর্নো-কারাবাখের জন-অধ্যুষিত এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা চালানো হয়েছে। ১৯৯০ এর দশকের পর সেখানে এই প্রথম এধরনের হামলার ঘটনা ঘটলো। গবেষক লরেন্স ব্রোয়ার্স বলছেন, "অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে উভয়পক্ষ দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করছে। আর্মেনিয়ার সঙ্গে নতুন করে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে আজারবাইজান। এছাড়াও এবার তুরস্কের পক্ষ থেকে আজারবাইজানকে যেভাবে সমর্থন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে সেরকমও আগে দেখা যায়নি।
পরিশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলে তাহলে তাতে বাইরের আরো অনেক শক্তি জড়িয়ে পড়বে যার ফলে আরো বৃহত্তর পরিসরে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। চ্যাটাম হাউজের গবেষক লরেন্স ব্রোয়ার্স বলছেন, আজারবাইজান হয়তো খুব দ্রুত কিছু এলাকা পুনর্দখল করে নিয়ে সামরিক সাফল্য অর্জন করতে পারে। অথবা আর্মেনিয়ার বাহিনী আজারবাইজানের এই চেষ্টা নস্যাৎ করে দিতে পারে। যুদ্ধবিরতিও হতে পারে। তবে এসবের যা কিছুই হোক না কেন বর্তমান এই সংঘাতের কারণে যে অভ্যন্তরীণ স্থিতি বিনষ্ট হবে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT