উপ সম্পাদকীয়

করোনা সংকটে শিক্ষার্থীদের করণীয়-বর্জনীয়

মো. মাঈন উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১০-২০২০ ইং ১২:১২:৪৬ | সংবাদটি ৯৩ বার পঠিত

করোনাভাইরাস আজকের বিশ্বে একটি মহামারির নাম, আতঙ্কের নাম, স্থবিরতার নাম। করোনাভাইরাসের প্রভাবে আজ কাঁপছে সারাবিশ্ব, স্থবির হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব, মুখ থুবড়ে পড়েছে বিদ্যার আধার; বিদ্যাপীঠ। কোটি কোটি শিক্ষার্থী, যারা বিদ্যা আহরণের জন্য রাত পোহালেই ছুটে যেত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ তারা চারদেয়ালে আটকা। এ যেন বিদ্যা নামক আলোকবর্তিকা চারদেয়ালের কুঠুরিতে চাপা পড়েছে। বিদ্যার যে লেলিহান শিখা সভ্য সমাজ বিনির্মাণে আলো ছড়ায়, সে শিখা আজ বায়ুশূন্য, মুমূর্ষু।
আমরা সবাই জানি, করোনাভাইরাসের সূচনা হয়েছে এশিয়ার দেশ চীন থেকে। শুরুতে অনেকেই বলেছিলেন, করোনাভাইরাস চীনের সৃষ্টি; কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে এ ভাইরাসটি। অবশ্য চীন বরাবরই বলে এসেছে, কৃত্রিম নয়, বরং প্রাকৃতিকভাবেই এ ভাইরাসের সৃষ্টি, যা কিছু দেশ ও বিজ্ঞানী মানতে নারাজ। প্রকৃতপক্ষে চীন এ ভাইরাস সৃষ্টি করেছে এমন কোনো প্রমাণ বিশ্বের কোনো দেশ বা বিজ্ঞানী আজ অবধি দিতে পারেনি। তাই ধরেই নেওয়া যায়, চীনের কোনো ল্যাবের নয় বরং কোনো প্রাণী বা জন্তু থেকেই প্রাকৃতিকভাবে করোনাভাইরাসটির উৎপত্তি।
করোনাভাইরাস প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়েছে, এর সপক্ষে কিছু যুক্তিও দেওয়া যায়। যুগে যুগে এই বিশ্বের বুকে অনেক মহামারিই প্রাকৃতিকভাবে উৎপত্তি লাভ করেছে। যেমন সার্স, ইভোলা, প্লেগ বা এরকম আরও অনেক রোগ। আবার বলা যায়, সৃষ্টিকর্তা মানুষের ঈমান ও আমল পরীক্ষার জন্য ধরিত্রীর বুকে নানান রকমের বালা-মুসিবত প্রেরণ করে থাকেন। এগুলো বিভিন্ন নবী-রাসুলের জীবনী-ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়।
করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েনি এমন দেশ বিশ্বে খুবই কম। হয়তো দু-একটি দেশ বাদে বিশ্বের সব দেশ আজ এ ভাইরাস জ্বরে ভুগছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অন্যভাবে বললে বলা যায়, শিক্ষার্থীদের ওপর। আমাদের বাংলাদেশেও করোনার প্রভাব প্রকট। ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যমতে, করোনা আক্রান্তের শীর্ষ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ১৫তম। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে করোনা আক্রান্তের হার দ্রুত কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হয়তোবা জনসংখ্যার আধিক্য এর অন্যতম কারণ। গত বছরের শেষ নাগাদ চীনের উহান নামক প্রদেশ থেকে করোনাভাইরাসের সূচনা হলেও এ বছরের মার্চের শুরুর দিকে আমাদের দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হতে শুরু করে এবং ১৭ মার্চ বা এর কিছু আগে-পরে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই মার্চ থেকে শুরু করে এখনও আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাস যায় যায়। অক্টোবরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে বলা যায়, শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে এবং আরও হবে। দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক দারুণভাবে হতাশ। দেশের সরকারও চায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে খোলার জন্য; কিন্তু তারাও নিরুপায়। কারণ, করোনাভাইরাসের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
তবে যে যাই বলুক, আমি বলব, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় বাসায় বসে থাকতে থাকতে একেবারেই বোরিং হয়ে পড়েছে। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে বাসায় পাঠ্যপুস্তক পড়তে মন চায় না, এটা চরম সত্য কথা। শিক্ষকরা প্রিয় প্রতিষ্ঠানে না যেতে পেরে কিংবা প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের সান্নিধ্য না পেয়ে হতাশ। আর অভিভাবকরা তাদের প্রিয় সন্তানকে নিয়ে আছেন মহা চিন্তায়। যারা ছোট তাদের ঘরে আটকে রাখা কঠিন কাজ। আর যারা বড় তাদের নৈতিক স্খলনের ভয়। এজন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা অভিভাবক প্রত্যেকেই তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে আছে কখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার সরকারি নির্দেশনা পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশানুরূপ না কমায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজও খোলার সম্ভাবনা নেই। এবছর বা করোনার টিকা না আসা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে কি-না এ ব্যাপারে আমরা গভীর অন্ধকারে আছি। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা যাতে মানসিক কোনো সমস্যায় না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যাদের বাইরে গিয়ে খেলাধুলা বা শারীরিক ব্যয়াম করার যথেষ্ট সুযোগ নেই, তারা বাসায় শরীরিক ব্যয়াম করতে পারে। আর যাদের বাইরে গিয়ে খেলাধুলা বা শারীরিক ব্যায়ামের সুযোগ আছে, তারা সে সুযোগটা কাজে লাগাতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, খেলাধুলা বা শারীরিক ব্যায়ামের নামে বাইরে গিয়ে যেন আমরা নিজের ও পরিবারের জন্য কোনো বিপদ ডেকে না আনি।
আমরা জানি, অনেক স্কুলেই অনলাইন ক্লাস চলছে, যাদের জন্য এই ক্লাসগুলো প্রযোজ্য, তারা এই ক্লাসগুলো ফলো করে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারে। আর যাদের অনলাইন ক্লাস নেই, তারা বাসায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অবশ্য সারাক্ষণ পাঠ্যপুস্তকের পড়া পড়তে ভালো লাগে না বা পড়তে ইচ্ছে করে না বা একঘেয়েমি লাগে। সেক্ষেত্রে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল বই, যেগুলো শিক্ষার্থীদের মানসিক উৎকর্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিনোদন দেয় এমন বই পাঠ করা জরুরি। তাহলে হয়তো দেখা যাবে দীর্ঘক্ষণ পড়ার একঘেয়েমি ভাবটা থাকবে না। একটি কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার বলেই আমি মনে করি, তাহলো এখন শিক্ষার্থীদের অনেক সময় হাতে আছে, যেহেতু প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তাই এ সময়টাতে পাঠ্যবইয়ের পাশে বিভিন্ন ধরনের বই পড়া অবশ্যই উচিত। কারণ একজন মানুষ আরেকজন মানুষের ক্ষতি করতে পারে, এমনকি একজন ভালো বন্ধুও আরেকজন বন্ধুর ক্ষতির কারণ হতে পারে; কিন্তু একটি ভালো বই কখনও কারও ক্ষতির কারণ হতে পারে না।
আমরা যদি আশি বা নব্বই দশকের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখব, তখনকার সময়ে ঘরে ঘরে বিনোদনের এত মাধ্যম ছিল না, এখন যতটা আছে। তখন সুশীল সমাজের বিনোদনের মাধ্যমই ছিল সৃজনশীল বই। এই সৃজনশীল বই পড়ে প্রাপ্ত জ্ঞানের দ্বারা মানুষ চিত্তকে বিকশিত করতে পারত। সুতরাং করোনাকালীন মানসিকভাবে পর্যুদস্ত শিক্ষার্থীরা আকাশ সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে সৃজনশীল বই পড়ে, করোনার সময়টাকে কাজে লাগাতে পারে। প্রমথ চৌধুরী কী বলেছেন জানেন? তিনি বলেছেন, ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।’ তবে মজার ব্যাপার কী জানেন? এখন বই কিনতেও হয় না। চাইলেন বিভিন্ন স্বাদের বই ইন্টারনেট ব্যবহার করেই সংগ্রহ করা যায় এবং পড়া যায়।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT